এই সব চিঠির এ-হেন রাগানুরাগের উদ্দেশ্য কী, সম্পাদকের অবশ্য তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। মনের কথাটা সহজেই তাঁরা বুঝে নিতে পারেন–এবং সে-কথাটা হচ্ছে—পত্ৰলেখকরা সবাই চান তার লেখা ছাপানো হক এবং উপযুক্ত মর্যাদার সঙ্গেই ছাপানো হক।
প্রস্তাব অবশ্য মন্দ নয়, অযৌক্তিকও নয়। পত্রিকায় লেখা ছাপানোর প্রয়োজন আছে, সুতরাং সে প্রয়োজন সিদ্ধ করবার জন্য গরজ দেখানোও দোষের কিছু নয়। কিন্তু মুশকিল হল এই যে, সম্পাদক মহাশয়দের পক্ষে সব সময় এই গরজ অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব হয় না, ফলে প্রতিদিন গাদাগাদা লেখা ফেরত যায় এবং লেখকদের নিদারুণ মনঃক্ষোভের কারণ ঘটে।
বৈঠকের একজন প্রশ্ন করলেন—কেন এমনটা হয়, এর কি কোন প্রতিকার নেই?
সেইটাই বিবেচ্য। লেখা ছাপাবার প্রয়োজন আছে, এবং এও সত্য যে, সে-প্রয়োজন প্রতিপালন করা সম্পাদকের কর্তব্য। সম্পাদকরা যদি সে কর্তব্যে পরান্মুখ হন, তবে তাদের উপর অভিযোগ করার কারণ নিশ্চয় থাকে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে এই কর্তব্য প্রতিপালন করার, অভিযোগ তাদের উপর বাস্তবিক করা যায় কি না অনেকে তা বুঝে উঠতে পারেন না, ফলে সম্পাদকের উপর অবিচারের একটা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে বসেন।
লেখা ছাপানোর প্রয়োজন সত্যিই আছে, দশজনের চোখে সেগুলি পড়ে এবং তাতে কাজ হয়; কিন্তু এই কাজের দিকটা হাসিল করাই যদি সব লেখার উদ্দেশ্য হত, অন্তত শুধু সেইটুকুর উপর জোর দেওয়া হত, তবে সমস্যা বিশেষ কিছু ছিল না। পত্রিকায় লেখা ছাপানোর মূলে একটা উদ্দেশ্য থাকে সেটা আর কিছুই নয়, নিজের নামটা জাহির করা, যশ বা খ্যাতির আকর্ষণ। যশ বা খ্যাতির আকাক্ষা কারও থাকে থাকুক, সম্পাদকের তা খতিয়ে দেখার আবশ্যক ততটা থাকে না; তাঁদের দ্রষ্টব্য হল পাঠকদের মনের ক্ষুধা মিটছে কিনা। কোন লেখকের লেখা যদি পাঠকদের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে সে-লেখার সূত্রে লেখক যশ বা খ্যাতি পান ভালই। তাতে পত্রিকারও যশ বা খ্যাতি বাড়ে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্যকে বাদ দিয়ে নিছক অযোগ্যকে ভোল্লা দেওয়া সম্পাদকের কর্তব্য নয়, সে-লেখক যিনিই হন এবং যত বড় মেকদারের লোকই হন নাকেন। সাহিত্যের কমলবনে এই সব মেকদার হস্তীর উৎপাত মাঝে মাঝেই ঘটে থাকে। নিজের নাম বা যশকে বড় করে দেখিয়ে সম্পাদকদের চাটুকারিতা করা যেমনই অবান্তর বা অনাবশ্যক, তেমনই তাঁদের হুমকি দেখানও হাস্যকর। এক্ষেত্রে সম্পাদকরা নিন্দা-স্তুতিতে সমান নিরপেক্ষ থাকতে বাধ্য, বাধ্য কর্তব্য-প্রতিপালনেরই দায়িত্বে।
বৈঠকের পেট-বোগা সব্যসাচী সাহিত্যিক খোঁচা দিয়ে বললেন–সম্পাদকদের হয়ে ওকালতি করতে গিয়ে খুব যে লম্বা বক্তৃতা ঝাড়লেন। না হয় মানলুম পাঠকদের কথা ভেবেই আপনারা কর্তব্য পালন করে থাকেন। কিন্তু বিজ্ঞাপনগুলি কি পাঠকদের চক্ষুশূল নয়? আর লেখকরাই বা কেন মনে করবেন না যে, বিজ্ঞাপনগুলো হচ্ছে দেবী সরস্বতীর পূজামণ্ডপের চাদমালা আর লেখকদের রচনা হচ্ছে সেই চাঁদমালা বোলানোর সুতো। রামপুরহাটের সেই পত্ৰলেখকের অভিযোেগ কি নিতান্তই মিথ্যে?
একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন কেন, বিজ্ঞাপন হচ্ছে যে-কোন পত্রিকার মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডের জোর না থাকলে সব পত্রিকাকেই খুঁড়িয়ে চলতে হয়, অবশেষে অকালেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে। বিজ্ঞাপনই হচ্ছে প্রদীপের সলতে। যতই তেল ঢালুন বা পাতার পর পাতা সারগর্ভ রচনা দিয়ে ভরাট করুন, সলতে না থাকলে আলো জ্বলবে কেন? অনেকেই এটা বোঝেন না যে, শুধু সাহিত্যের মহান আদর্শ নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করতে গেলে না বাঁচে পত্রিকা, না টেকে আদর্শ। আদর্শ নিশ্চয় থাকবে কিন্তু সেই সঙ্গে চাই সমপরিমাণ ব্যবসা বুদ্ধি। যে-পত্রিকার পরিচালক এ-দুয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পেরেছেন তাদেরই পত্রিকা আজ মর্যাদা আর প্রতিষ্ঠা দুইই লাভ করেছে। তা ছাড়া কাগজের এই দুমূল্যের বাজারে গ্রাহকদের কাছ থেকে যে চাদা পাওয়া যায় তাতে কাগজের দামই ওঠে না। তার উপর আছে কম্পোজ, ছাপা, বঁধাই, কর্মীদের বেতন এবং সর্বোপরি লেখকদের সম্মান-মূল্য। বিজ্ঞাপন না হলে এ-খরচটাই বা আসবে কোথা থেকে? নিছক আদর্শের জন্য ঘরের-খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে একাধিক প্রথম শ্রেণীর সাহিত্য-পত্রিকা বাংলা দেশ থেকে চিরকালের জন্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে তার নজির খুজতে বেশীদুর যেতে হবে না। আমার মনে হয় বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শন পত্রিকা এই কারণেই বেশীদিন চালাতে পারেন নি। রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত সাধনা ও ভারতী পত্রিকার অচিরে বিলুপ্তি এই একই কারণে। আর রবীন্দ্রনাথের সর্বাত্মক পোষকতা সত্ত্বেও ডাকসাইটে সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীকে কী আক্ষেপের সঙ্গে সবুজপত্র বন্ধ করতে হয়েছিল সে তত হালফিলের ঘটনা, আপনাদের অজানা নয়। জমিদারির আয় যখন কমে গেল সবুজপত্রর পাতাও ক্রমে হলদে হয়ে একদিন ঝরে পড়ল। পরবর্তী যুগে যারাই সাহিত্য-পত্রিকা প্রকাশ করেছেন তারা পূর্বসূরীদের এই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রদীপের সলতের দিকে নজর রেখেছিলেন বলেই সে-পত্রিকা আজও সগৌরবে সুপ্রতিষ্ঠিত। অধিকাংশ পাঠক এই দিকটা বিবেচনা করেন না, তাই অকারণে পত্রিকার পরিচালক বা সম্পাকের উপর দোষারোপ করে থাকেন।
সাহিত্যে সব কারবারের কারবারী সব্যসাচী লেখক বললেন–
