আপনার দ্বিতীয় সারমন কিন্তু সম্পূর্ণ বাস্তববিরোধী। অনির্দিষ্ট কালের এক সময়ে গঞ্জি একে দিয়েছেন আপনি আমার ভবিষ্যৎ বাসনার ওপর। এ যে অসম্ভব। আপনি লিখেছেন, যদি কখনও পত্রিকার পাতার সংখ্যা বাড়ানো যায়, তখন যোগাযোগ স্থাপন করবেন। ততদিন কি আমি
এই ধূলার ধরণীতে টিকে থাকব? ইতি–
ভবদীয়
সাধনকুমার দাস
চিঠি পড়া হতেই বৈঠকের এক বন্ধু বললেন–আজকালকার লেখকদের আপনারা কচি থোক। মনে করবেন না। যতই আপনারা স্থানাভাব আর পৃষ্ঠা বৃদ্ধির মামুলী যুক্তির মোয়া তাদের হাতে তুলে দেন না কেন, ভবী ভোলবার নয়।
গাল্পিক বন্ধু বললেন–এ তো তবু ভাল। জাপানে শুনেছি পত্রিকা সম্পাদকরা বৈষ্ণব বিনয়ের এক-একটি অবতার। ছাপার অযোগ্য লেখা লেখককে যে চিঠি দিয়ে ফেরত দেন তা হচ্ছে-আপনার লেখার মান এতই উচ্চস্তরের যে, এই লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হইলে পত্রিকার মানও উচ্চস্তরে উঠিয়া যাইবে। কিন্তু ইহার একটি বিপদ আছে। আপনার ন্যায় বিদগ্ধ মনস্বী লেখক আমাদের দেশে আর দ্বিতীয় একজনও নাই। সুতরাং আপনার রচনা প্রকাশিত হইলে পত্রিকার মান যে-স্তরে উঠিবে সে-স্তর রক্ষা করা আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য হইয়া পড়িবে। এই আশঙ্কা করিয়াই আপনার এই বহুমূল্যবান রচনা গভীর দুঃখের সহিত ফেরত পাঠাঁইলাম।
আমি বললাম—আমাদের দেশে তরুণ লেখকদের মনোনীত লেখা প্রত্যাখ্যান যত মোলায়েম ভাষাতেই করুন না কেন তারা বিক্ষুব্ধ হবেই। আগেই বলেছি, আপন সন্তানের মতই লেখার প্রতি লেখকদের অসীম মমতা, তাই এই বিক্ষোভ। এবং এই বিক্ষোভজনিত উষ্মভরা চিঠি সম্পাদকের দপ্তরে প্রতিদিন আসে এবং তা সম্পাদককে নতমস্তকে শিরোধার্য করে নিতে হয়। এটা তাদের নিত্য প্রাপ্য। কিন্তু শিক্ষিত প্রবীণ লেখকেরা যে কত বেশ ছেলেমানুষি করে থাকেন, তার একটা নমুনা আপনাদের দিই। এই কলকাতারই কোন একটি বিখ্যাত ইংরিজী দৈনিক পত্রিকার এক সহকারী সম্পাদক গল্প-উপন্যাস লিখে থাকেন। একবার পূজা সংখ্যার জন্য একটি গল্প তিনি পাঠান। পূজা সংখ্যা প্রকাশের পূর্বে লেখকদের নামের তালিকা প্রকাশিত হয়। তালিকা যে-দিন প্রকাশিত হয়েছে সেই দিনই দুপুরে আমার দপ্তরে ভদ্রলোকের আবির্ভাব। দেখতে নোগা এবং বেঁটে হলে কি হবে, কড়া-মেজাজী লোক। দরজার চৌকাঠ পার হয়েছেন কি হন নি-হাতের ইয়া-মোটা বেতের লাঠিটা ঠকা ঠকাস করে মেঝেতে ঠুকতে ঠুকতে আমার দিকে বাক্যবাণ ছুড়তে লাগলেন-তালিকায় আমার নাম নেই কেন?
ধরেই নিয়েছেন তালিকা থেকে ওর নাম কখনই বাদ যেতে পারে না।
আবার গর্জন-আমার লেখা আপনারা ছাপবেন কি ছাপবেন না, জানতে পারি কি?
রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতার একটা লাইন মনে পড়ে গেল। এত ক্ষুদ্র যন্ত্র হতে এত শব্দ হয়। সভয়ে বললাম-আজ্ঞে, জায়গা করতে পারি নি, তাছাড়া গল্পটা আকারেও
ওসব ঘেঁদো কথা শুনতে চাই না। লেখাটা ফেরত দিন। ওর চেহারার আস্ফালন লাঠির আস্ফালনকেও ছাড়িয়ে যায়। বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়।
তাড়াতাড়ি ফাইল থেকে লেখাটা বার করে এগিয়ে দিতেই ফস্ করে আমার হাত থেকে পাণ্ডুলিপিটা এক হ্যাচকায় কেড়ে নিয়ে বললেন–এই বলে গেলুম। একদিন লেখার জন্য আপনাকে আমার বাড়িতে দু-বেলা হাঁটাহাঁটি করতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে বললাম—আমিও প্রার্থনা করছি যেন সে-সৌভাগ্য আমার 071
ঝড়ের বেগে ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন, আমার কথাটা শুনতে পেলেন কি না জানি নে।
বৈঠকের সেই সব্যসাচী লেখক রস দিয়ে বললেন–যা দিনকাল পড়েছে তাতে লেখা ছাপানোর এই পদ্ধতিটাই দেখছি প্রশস্ত। এক হাতে লাঠি, অপর হাতে লেখা, কোনটা চাই।।
আর গাল্পিক-লেখক বললেন–ভদ্রলোকের ভবিষ্যদ্বাণীটা কি ফলেছে?
আমি বললাম-সেইটাই তো আমার আফসোস। আজ দশ বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি, তাঁর বাড়িতে দু-বেলা হাঁটাহাঁটির সুযোগ আজও আমি পেলাম না।
আসরের তরুণ কবি-বন্ধু বললেন–সাধনকুমার আর লাঠিধারী লেখকের নজির থেকে নিশ্চয় আমাদের এ-সিদ্ধান্ত করা ঠিক হবে না যে, এ-ক্ষেত্রে সব নতুন লেখকেরাই সম্পাদকের শক্ত হয়ে ওঠেন।
আমি টেবিলের সেই চিঠির বাণ্ডিল থেকে একটি পোস্টকার্ড বার করে দেখালাম। পত্ৰলেখককেও অক্ষমতা জানিয়ে রচনা ফেরত দেওয়া হয়েছিল। পত্ৰলেখক সম্পাদকের মনের কথাই এই চিঠিতে ব্যক্ত করেছেন।
লোকপুর
বীরভূম
মহাশয়,
আপনার বিনীত উত্তরে কৃতজ্ঞ হলাম। আমার রচনাটি প্রকাশে অক্ষমতার জন্য ক্ষমা চেয়ে কিন্তু দুঃখ দিয়েছেন। আপনাদের পত্রিকা বাংলার সম্পদ। আমারও অংশ তাতে নিশ্চয় আছে। সাধারণ বস্তুতে কোষ-কলেবর স্ফীত না করে বিশেষ সম্ভারে তাকে সমৃদ্ধ করে ভোলাই তো কোষাধ্যক্ষের প্রকৃত কর্তব্য। তাতে ব্যক্তিবিশেষের ক্ষোভ এলেও বৃহত্তর ব্যক্তি-সমাজ আনন্দই লাভ করবে।
স্থানকালে কথাটি উপদেশের মত শোনালেও বিশ্বাস করবেন আন্তরিক ভাবেই বলছি। আপনাদের পত্রিকার সমৃদ্ধি আন্তরিকভাবে কামনা করে এবং আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি।
ভবদীয়
দেবপ্রসাদ
সম্পাদকের দপ্তরে অধিকাংশ পত্ৰলেখক সপ্তমে সুর চড়িয়ে এই কৈফিয়ত তলব করেন যে, তাঁর মত একজন লেখকের লেখা যখন ছাপানো হয় নি তখন সম্পাদক মহাশয় যে নিতান্ত একজন অপদার্থ ব্যক্তি তা তিনি অনুগ্রহ করে সম্পাদককে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অপর একদল আছেন স্বাদের চিঠি সম্পাদকের স্তাবকতায় ভরা।
