বৈঠকের তরুণ কবি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন–এটা কিন্তু ঠাটার বিষয় নয়। ভেবে দেখুন, নতুন লেখকরা কত যতে, কত আগ্রহ নিয়ে, কত আশা করে তাদের লেখা সম্পাদকের হাতে তুলে দিয়ে কী উৎকণ্ঠায় দিন কাটান। এ-যেন আদরের কন্যাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে বরের বাপের সামনে পাঠিয়ে দিয়ে দরজার আড্ডালে দাঁড়িয়ে-থাকা মায়ের উৎকণ্ঠার মত।
কবিবন্ধু কথাটা কাব্যিক উপমা দিয়েই বললেন, এবং তা অগ্রাহ্য করবার মতও নয়। কিন্তু এর আরেকটা দিক আছে ভেবে দেখবার। নতুন লেখকদের মনে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে সম্পাদকরা না পড়েই লেখা ফেরত দেন, অথবা নতুন লেখকদের লেখার প্রতি তাদের আগ্রহ নেই। এই ভ্রান্ত ধারণাটা আমার মনে হয়, কোন কালেই এদের মন থেকে দূর করা যাবে না। কিন্তু এই সব লেখকরা পত্রিকার লেখক-সুচী যত্ন সহকারে অনুধাবন করলে দেখতে পাবেন নতুন লেখকদের লেখা কী পরিমাণ আগ্রহ নিয়ে আমরা খুঁজে বেড়াই। যে-কোন পত্রিকার জীবনী শক্তিই হচ্ছে নতুন লেখকদের পাণ্ডুলিপি। তবে একথাও ঠিক, সম্পাদকরাও মানুষ। বিচারে ভুল-ভ্রান্তি তাদের ঘটতে পারে, ঘটেও থাকে। এক পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে কোন লেখা ফেরত গেলে মুষড়ে পড়বার কোন হেতু নেই। সেই লেখাই অন্য পত্রিকার সম্পাদক সমাদরের সঙ্গেই গ্রহণ করবেন। এরকম দৃষ্টান্ত রয়েছে একাধিক। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস চরিত্রহীন-এর পাণ্ডুলিপি প্রবাসী-সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ফেরত দিয়েছিলেন এবং পরে যমুনা পত্রিকার সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পাল তা সমাদরের সতেই পত্রস্থ করেন।
বৈঠকে আরেক প্রস্থ চা এসে গেল। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সবাই চাঙ্গা হয়ে উঠল। আমি আবার ফিরে গেলাম আমার প্রতীক্ষারত চিঠির মধ্যে। এক-একটি করে চিঠি খুলে চলেছি, বন্ধুরা ততক্ষণ গল্পগুজবে মত্ত। একটা চিঠির মধ্যে কৌতুককর এমন কিছু মন্তব্য ছিল যা পড়ে আমি হাসি সংবরণ করতে পারি নি। আমাকে হাসতে দেখে বৈঠকের সব্যসাচী সাহিত্যিক বলে উঠলেন—একাই উপভোগ করছেন, আমরাও কি ভাগ পেতে পারি না?
দপ্তরে প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য-সরস্বতীর নবীন ভক্তদের কাছ থেকে পরুতের কাছে যেসব চিঠিপত্র আসে তা ছাপানো হলে পসাহিত্য একটি রীতিমত উপভোগ্য সামগ্রী হতে পারে। কিন্তু সম্পাদককে বাধ্য হয়েই এই সব পত্রাবলীর রস একা-একাই উপভোগ করতে হয়। সবাইকে ভাগ দিয়ে উপভোগের মন্ত অন্তরায় হচ্ছে, চিঠি নিতান্তই ব্যক্তিগত। সম্পাদক তা প্রকাশ করতে পারেন না, তেমন কাজ সাংবাদিকের নীতিগত বিশ্বস্ততার বিরোধী।
তবু যে-চিঠিটি আমি একাই পড়ে উপভোগ করছিলাম, বৈঠকের বন্ধুদের উপরোধে তা না শুনিয়ে পারলাম না। এই নীতিবিরুদ্ধ কাজের জন্য পত্ৰলেখকের কাছে পূর্বাহেই মার্জনা ভিক্ষা চাই।
গার্ড ই. রেলওয়ে
রামপুরহাট
সবিনয় নিবেদন,
আপনার জবাবী পোস্টকার্ডের উত্তর পেয়ে যথেষ্ট আনন্দ পেয়েছি, বেদনাও পাই নি কম। আপনি তবু ভদ্রতা করে চিঠিটা ছিড়ে ফেলে দেন নি—এই মা আনন। নইলে আর আনন্দ পাওয়ার মত কিছুই ছিল না আপনার মর্মবাণীতে।
মহিমান্বিত বিশাল সাগরের মই আপনি উদার হৃদয় এই ভেবেই আমার আশাবাণী আপনার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলুম; কিন্তু আপনার উত্তর পাওয়ার পর এই সিদ্ধান্তেই শেষে পৌছুলাম যে, আপনি সাগর-শুকিয়ে-ওঠা দিগন্তপ্ৰসারী আলাময়ী মরুপ্রান্ত ছাড়া আর কিছু নন। সাগরের মহিমা হারিয়ে আপনি নীরস বালুচর হয়ে রুদ্রাক্ষমূতি ধরেছেন। নামের মহিমাই নেই আপনার মধ্যে। আপনার নাম মরুময় ঘোম হলে মন্দ হয় না, নয় কি?
রেলওয়েতে সামান্য গার্ডের চাকরি করি জেনে এই ধারণাই যদি করে থাকেন যে, বাণীর আসন পাতা নেই আমার মনে-প্রাণে তাহলে নিশ্চয় করে বুঝব, আপনি চরম ভুল করেছেন একটা। আমি বাণীর একনিষ্ঠ সাধক এই কথাটাই আজ গর্বভরে আপনাকে জানালাম। আমার মধ্যে যে আগামী সম্ভাবনা ও প্রতিভার অঙ্কুর প্রকাশ পেতে চাইছে আলো-ঝলমল পৃথিবীতে, আপনার মত সাহিত্যসেবী যদি তাকে এতটুকু সাহায্য করে ৰাইরের রৌদ্রকরোজ্জ্বল সাহিত্য-জগতের মুখ না দেখান-তাহলে সেই–শিশুচারা যে চিরকালের বুকে অজান্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। উপযুক্ত প্রার্থিতকে বিফলমনোরথ করার একটা সাবকনশাস বেদনাবোধ আছেই, পরে হয়তো একদিন অনুভব করবেন জীবনের গোধুলিবেলায়। আপনার প্রত্যাখ্যান মানেই, আমার প্রতিভার শিশুচারাকে হাতের চেটোয় নির্মমভাবে পিষে ফেলা ছাড়া আর কিছু নয়। শুধু আমার কেন, আমারই মত বহ আশাকামী সাহিত্যসেবীর প্রতিভাই অঙ্কুরে বিনাশ হয়ে গেছে আপনাদের মত প্রাণহীন বেদরদী সাহিত্যিকদের নির্মম উপেক্ষা আর তাচ্ছিল্যের চাপে। এতবড় জীবন-নাট্যের ট্র্যাজেডি আর কি আছে?
আপনি আমাকে সারমন দিয়েছেন দুটো। একটা হল—উপস্থিত পত্রিকার স্থানাভাব। দাতের মাজন, লোমনাশক সাবান আর কুঁচ তৈলের বিজ্ঞাপনে বোঝাই পাতাগুলো দেখলে স্বাভাবিকভাবে আপনার এ সারমন মাথা পেতে নিতে পারি না।
এ ছাড়াও দেখেছি, যেসব সাধারণ মামুলী গল্পকে আপনারা অতি সহজে পাসপোর্ট দিয়ে দেন মুন্ত্রণের জন্য, আমার রচনা সেগুলোর চেয়ে নিকৃষ্ট কোনও মতেই নয়। ধন্য আপনাদের গুণবিচার।
ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমি জেনে এসেছি যে সুপারিশ তদ্বির জয় মামার জোর না থাকলে চাকরি, ব্যবসা, সিনেমা ও থিয়েটার-জগতে স্থান পাওয়া যায় না। কিন্তু আপনার মিষ্টি সুরের প্রত্যাখ্যানপত্র পাওয়ার পরে এও জানলাম যে বিদ্যাদেবীর রাজ্যেও উমেদারির প্রয়োজন আছে।
