পত্রিকা সম্পাদনার কাজে আপনার কোন যোগ্যতাই নেই। হাতীবাগানের বাজারে আলুওয়ালা হওয়াই ছিল আপনার উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র।
এ-মন্তব্য করেছিলেন রানাঘাটের এক প্রখ্যাত কবি, খর কবিতা পত্রিকায় প্রকাশে কিঞ্চিৎ বিলম্ব ঘটেছিল। আসরের তরুণ কৰিবন্ধুকে এ ঘটনা বলতেই তিনি বললেন–
আপনাদের পত্রিকার আপিস তো বর্মণ স্ট্রীটে। আপনাকে বর্মণ বাজারের আলুওয়ালা হবার উপদেশ না দিয়ে হাতিবাগান বাজারের কথা কেন বললেন?
আসরের সেই কীণকায় সব্যসাচী সাহিত্যিক টেবিলে আঙুল দিয়ে তবলার টোকা মারতে মারতে ঘাড় দুলিয়ে বললেন–হুঁ হুঁ, কথাটা বলেছে ঠিকই। হাতিবাগান নামের সঙ্গে সেই বাজারের আলুওয়ালাদের দেহগত সাদৃশ্য নিশ্চয় আছে, তা না হলে এত বাজার থাকতে হাতিবাগান কেন।
আসরের এই ক্ষীণকায় বন্ধুটি সুযোগ পেলেই আমার মূল দেহে চিমটি না কেটে পারেন না। তিনি আবার বললেন—এই চিঠির পর নিশ্চয় সেই কবির কবিতা আপনাদের পত্রিকায় আর প্রকাশিত হয় নি।
আমি বললাম-তা কেন হবে। ওই চিঠিতেই তিনি কবিতাটি ফেরত পাঠাতে বলেছিলেন; কোন মন্তব্য প্রকাশ না করে কবিতাটি তার কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিই। ছয় মাস পর তিনি তার ভুল বুঝতে পেরে সে-কথা অসংকোচে স্বীকার করে কবিতাটি আবার আমার কাছে পাঠিয়ে দেন, যথাসময়ে তা প্রকাশিতও হয়। শুধু তাই নয়, অদ্যাবধি তার কবিতা সাধারণ সংখ্যা ও পূজাসংখ্যায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে।
মনে মনে জানি এর জন্যে লেখককে অপরাধী করা অন্যায়, অপরাধ সম্পাদকেরই। সম্পাদনা-কাজে একটা নির্মমতার দিক আছে। সময় সময় তা এমন প্রকট হয়ে ওঠে যে লেখকের সেন্টিমেন্ট-এর মূল্য তাদের কাছে তখন এক কানাকড়িও থাকে না। কবিতা রচনার পরই কবি ব্যস্ত হয়ে পড়েন তা প্রকাশের জন্য। তিনি চান তার কবিতা কাব্যরসিকদের কাছে অবিলম্বে পেীছে যাক। এই অবিলম্বের কাজে বিলম্ব ঘটলেই লেখক অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন, তার ফলেই এ-ধরনের পত্রাঘাত।
চিন্তাজাল ছিন্ন করে গাল্পিক বন্ধু বললেন—আপনার কাছে নতুন লেখকদের যে সব চিঠি আসে তার প্রধান বক্তব্য বিষয়টি কী?
বক্তব্য সকলেরই প্রায় এক-লেখা কবে প্রকাশিত হবে, আর যদি লেখা নিতান্তই অমনোনীত হয়, তার কারণ জানিয়ে উত্তর দেবার অনুরোধ।
বন্ধুবর বললেন–আপনি কি সবাইকে উত্তরে জানিয়ে দেন কেন লেখা মনোনীত হল না?
বলেন কি মশাই! সে কখনও জানাতে আছে? প্রত্যেক লেখকেরই, সে অখ্যাতই হোক আর প্রখ্যাতই হোক, নিজের সাহিত্যসৃষ্টির প্রতি মমত্ব আপন সন্তানের মতই। সদ্যোজাত শিশু যদি কুও হয়, আপনি কখনও তার পিতার মুখের উপর তা বলতে পারেন?
কথাসাহিত্যিক বন্ধু বললেন—কথাটা অবশ্য ঠিক। আমারই কথা ধরুন না। আমি যখন প্রথম-প্রথম ভারতবর্ষ, প্রবাসী, বিচিত্রায় গল্প পাঠাতাম, তার কিছু ছাপা হত, কিছু হত না। ফেরত পাওয়া গল্পর জন্য সম্পাদকের জবাবদিহি কখনও তলব করি নি। তা ছাড়া আমার লেখার সবচেয়ে বড় সমালোচক আমার দু-একজন সাহিত্য-রসিক বন্ধু। যখনই কিছু লিখি, সেই লেখা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করি ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আমি বললাম—এইটিই তো হওয়া উচিত। নবীন লেখকরা এটুকু যদি বুঝতেন তা হলে সম্পাদকের কাজ কত সহজ হয়ে যেত, লেখকের কাছে অপ্রিয়ও হতে হত না। তা ছাড়া এ-কথাটা তাঁরা বোঝেন না যে, কেন লেখা অমনোনীত হল তার কারণ বলতে গেলে প্রত্যেক অমনোনীত লেখার জন্য সম্পদককে চিঠির বদলে প্রবন্ধ লিখতে হয়। তাতে নূতন লেখকদেরই ক্ষতি। কৈফিয়ত দিতে গেলে যে-সময় চলে যায় সে-সময়ে নতুন লেখকদের ফাইল-ভরতি রচনার অনেকখানিই পড়া হয়ে যেত।
বৈঠকের আরেক কোণ থেকে কে-একজন বলে উঠলেন-আপনারা কি সব লেখা সম্পূর্ণ পড়ে ফেরত দেন?
আমি বললাম—অধিকাংশ নবীন লেখকের একটা প্রচলিত ধারণা আছে লেখা না পড়েই আমরা ফেরত দিই। একটা মজার ঘটনা বলি। কিছুদিন আগে ফুলক্যাপ সাইজের দু-শ পাতার একটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি লেখকের কাছে ফেরত যাবার পরই তিনি মারাত্মক অভিযোগ করে চিঠি লিখে জানালেন যে, সম্পাদকরা লেখা না পড়েই ফেরত দেন একথা তিনি বহুজনের কাছেই শুনেছিলেন। কিন্তু আমাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও আস্থা ছিল বলে তাদের কথা অবিশ্বাস করেই তিনি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আমাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরত পেয়ে বন্ধুদের কথার সত্যতা সম্বন্ধে তাঁর আর সন্দেহের অবকাশ নেই। আমরা যে না পড়েই লেখাঁটি ফেরত দিয়েছি তার প্রমাণও তিনি হাতেনাতে পেয়েছেন। পাণ্ডুলিপির ১১৫ পৃষ্ঠা থেকে ১২৫ পৃষ্ঠার একটি ধার তিনি কলে সেলাই করে দিয়েছিলেন এবং তা অক্ষত অবস্থাতেই আছে। এখন আপনারাই বুঝুন, সম্পাদককে বোকা বানাবার কত রকম ফন্দি।
বৈঠকের অপর দিক থেকে প্রশ্নকর্তা আবার বললেন–বুঝেছি। এ অভিযোগ নিশ্চয় আর খণ্ডন করতে পারেন নি।
আমি বললাম-পন না করলে কি আর পার পাবার যো ছিল। সুরসিক পণ্ডিত ডক্টর স্যামুয়েল জনসনের বিখ্যাত উক্তিটা আপনাদের মনে আছে তো–It is unnecessary to eat the whole ox to find out whether the beef is tough; এই উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে সোজা বাংলায় তাকে লিখেছিলাম যে, হাঁড়ির একটা চাল টিপলেই বোঝ যায় সব ভাত গলাধঃকরণ সম্ভব কি না।
আড্ডার রসিকচূড়ামণি মুখ ফসকে কাচা বাংলায় বলে ফেললেন—অর্থাৎ লেজ উন্টে দেখে নেওয়া মাদি না মদ্দা।
