নিশিকান্ত বললে-রাত্তিরে ওঁর জন্যে কাবাবের মত পেঁয়াজ রসুন দিয়ে মাংস রান্না করে অল্প আঁচের উনুনে রেখে দেওয়া হয়। সকালে চায়ের সঙ্গে পাউরুটি দিয়ে খান। আর মজা হচ্ছে এই, এ-সময় যে যায় সেই ভাগ পায়।
আমি বললাম—এ সংবাদটি তুমি ছাড়া আর বোধ হয় কেউ জানে না।
নিশিকান্ত হেসে বললে—জানলে কি আর রক্ষে ছিল। এতক্ষণে দেখতে পেতিস প্রাতঃভ্রমণকারীরা দিনদার বাড়ির সামনে লাইন দিয়েছে।
কথা বলতে বলতে আমরা দিনদার বাড়ির পশ্চিম দিকের কাঁকর-ঢালা উঠোনটায় এসে পড়েছি। নিশিকান্ত যা বলেছিল ঠিক তাই। দিনদা অশখ গাছের নীচে একটি আরামকেদারায় বসে আছেন, কোলের উপর একটা বাঁধানো খাতা, হাতে পেন্সিল। গুনগুন করে সুর ভাজছেন আর খাতায় কি টুকছেন। আমাদের দুজনকে দেখেই সোৎসাহে বলে উঠলেন—এই যে মানিকজোড়, আয় আয়। তা এত সকালে কী মনে করে?
নিশিকান্ত বললে-গোয়ালপাড়ায় রস খেতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ই ভাবলাম একবার আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই।
তা বেশ করেছি। বলেই দিনদা হাঁক দিলেন-ওগো শুনছে, মানিকজোড় এসেছে। এবার আমাদের চা দাও।
আমাদের দুজনকে সর্বত্র একসঙ্গে দেখা যেত বলেই বোধ হয় দিন আমাদের সব সময় মানিকজোড় বলেই ডাকতেন।
নিশিকান্তর বাক্য দেখছি অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। দিনার স্ত্রী কমল বউঠান যেন সাং অন্নপূর্ণা চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে এলেন, সঙ্গে এল পুডিং তৈরীর প্যান-এ ঠাসা এক প্যান বাসি মাংস। নিশিকান্ত চোখে আমার দিকে তাকাল। ভাবখানা যেন-কেমন, যা বলেছি ঠিক কি না দ্যাখ।
আমাদের নির্লজ্জ খাই-খাই অভাবটা ঢাকা দেবার জন্যে বললাম-দিনদী, আপনি খাতায় কি লিখছিলেন?
দিনদা বললেন–আর বলিস কেন। রবিদার কাণ্ড। শেষ রাত্রে আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন একটা সদ্য রচিত গান তুলে নেবার জন্যে। গানটা কাল রাত্রে বিছানায় শুয়ে রচনা করেই সুর দিয়েছেন। সারারাত ঘুমোন নি পাছে ঘুম থেকে উঠে সুর ভুলে যান। ভোর চারটের সময় নীলমণি এসে হাজির, বললে বাবুমশায় এখুনি ডাকছেন। এই তো একটু আগে রবিবার কাছ থেকে ফিরলাম। সুরটা স্বরলিপি করে খাতায় টুকে রাখছি।
কথা বলতে বলতেই দিনদা রবীন্দ্রনাথের সদ্য রচিত গানটি গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন—
কাল রাতের বেলা গান এল মোর মনে,
তখন তুমি ছিলে না মোর সনে।
গান থামিয়ে দিনদা বললেন–তোরাই বল, গানটা যদি রাতের বেলায় এসেছিল তাহলে তখনই আমাকে ডেকে পাঠালেই তো হত। তা নয়, সারারাত না ঘুমিয়ে জেগে রইলেন কখন আমি যাব। রবিদাকে নিয়ে আর পারা গেল না।
রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথ দাদামশায় ও নাতি সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথের বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের দৌহিত্র হলেন দিনেন্দ্রনাথ, দীপুবাবুর পুত্র, যে-দীপুবাবুর গল্প আগেই আপনাদের নিয়েছি।
ইতিমধ্যে কমল বউঠান চা ও খাবার সবাইকে পরিবেশন করেছেন। নিশিকান্ত এক স্লাইস পাউরুটির উপর পুরু করে মাংস ঢেলে তার উপর আরেক পিস রুটি চাপিয়ে স্যাণ্ডউইচ বানিয়ে পরমানলে খেয়ে চলেছে। যেন ও অনেক দূরের মানুষ, আমাদের সঙ্গে যেন ওর কোন সম্পর্কই নেই। মুখের খাদ্যবস্তু এক টেকে উরাৎ করে নিশিকান্ত মুখ খুলল। বলল-আপনি গুরুদেবকে বলেন না কেন যে যত রাতই হোক আপনাকে ডেকে পাঠাতে?
দিনদা হাসতে হাসতে বললেন–সে কি আর বলি না। বহুবার বলেছি, আজও বলেছি। কিন্তু ওঁর ওই এক কথা। ধূ শখিয়ে আমাকে ডাকলে নাকি আমার কষ্ট হবে। অথচ নিজে জেগে থেকে কষ্ট করবেন সারারাত। একথা বলেই দিনদা আপন মনে আবার গানটি গেয়ে উঠলেন।
আমরা তন্ময় হয়ে শুনছি। এমন সময় দিনদার সর্বাধিক প্রিয় পাত্রী অমিতা সেন আমাদের চায়ের আসরে এসেই টিপ করে দিনদাকে প্রণাম করল।
শশব্যস্ত হয়ে দিনদা বলে উঠলেন—এই যে নাইটিঙ্গেল, সকাল বেলায় এসেই প্রণাম করলি? কি ব্যাপার, সুখবর কিছু একটা আছে নিশ্চয়ই।
অমিতা সেন, যাকে খুকু বলেই শান্তিনিকেতনের সবাই চিনত, তার ছিল ঈশ্বরদত্ত গাইবার ক্ষমতা। তার কণ্ঠস্বর ছিল যেমন সুরেলা ও মধুর তেমনি ছিল উদাত্ত। ছেলেবেলা থেকে অদ্যাবধি রবীন্দ্রনাথের গান বহু মেয়ের কণ্ঠেই শুনেছি কিন্তু খুকুর মত এমন সহজ সরল কণ্ঠের প্রাণঢালা গান আমি আর কোথাও শুনি নি। খুকু দেখতে ছিল কালো, কিন্তু যখন গান গাইত, অপরূপ হয়ে উঠত সে নিজে, অপরূপ করে তুলত চারিদিকের পরিবেশ। দিনদা তার এই প্রিয় শিষ্যাকে সব সময়ই আদর করে নাইটিঙ্গেল বলে ডাকতেন এবং এই ডাক যে কতখানি সত্যি তা খুকুর গাওয়া ফিরে ডাক দেখি-রে পরাণ খুলে ডাক রেকর্ডটি যারা শুনেছেন তারাই উপলব্ধি করতে পারবেন। খুকু অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে এবং ওর চলে যাবার সঙ্গে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল সেই কোকিল-কষ্ঠীর গান।
দিনদা ও কমলা বউঠানকে প্রণাম করেই খুকু বললে-আজ আমার জন্মদিন। ঘুম থেকে উঠে সবার আগে আপনার পায়ের ধুলো নিতে এসেছি।
খুশীতে উচ্ছসিত হয়ে দিনদা বললেন—খুব আনন্দের কথা। কিন্তু আগে জানাতে হয়। তোর জন্মদিনে একটা কিছু উপহার দিতে হবে তো। কী চা তুই আমার কাছে বল।
খুকু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—এই মাত্র যে-গানটা গাইছিলেন সেইটা শিখিয়ে দিন।
দিনদা বললেন–এ গান তো তোদর গাইবার জন্যই, এ তো শিখবিই। আমার কাছে আর কী তুই চাস বল।
খুকু একটু ভেবে আমতা-আমতা করে বলল-আপনি যদি কথা দেন যা চাইব দেবেন, তবেই চাইব।
