নাথুকে দেখেই নিশিকান্ত ফিসফিস করে আমাকে বললে—খবরদার, ঘাবড়াস নে। কি বলে শোনা যাক।
নাথু আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললে—বউঠান আপনাদের দুজনকে ডাকছেন।
বউঠান ডাকছেন! শুনেই তো মাথায় বজ্রাঘাত। কী লজ্জার কথা। ভুট্টা চুরি করতে এসে ধরা পড়ে গেলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এই শেষ, নিশিকান্তর সঙ্গে আর কোন দিন কোথাও যাচ্ছিনা।
নিশিকান্ত কিন্তু নির্বিকার। নাথুকে বললে-চল যাচ্ছি।
নাথুকে সঙ্গে নিয়ে উত্তরায়ণের দিকে যেতে যেতে মোলায়েম স্বরে নিশিকান্ত বললে-হারে নাথু, বউঠান কি আমাদের ভুট্টা ক্ষেতে ঢুকতে দেখতে পেয়েছেন? না কি তোরা দেখতে পেয়ে বউঠানকে বলে দিয়েছিস?
নাথু বললে—আমি ঘরের ভিতর ঝাড়পোঁছ করছিলাম। বউঠান ডেকে বললেন–আপনাদের দুজনকে নিয়ে আসতে।
উত্তরায়ণের পশ্চিম দিকের বারান্দায় ঢুকে দেখি বউঠান গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূকে শান্তিনিকেতনের সকলেই বউঠান বলেই সম্বোধন করে থাকে। নিশিকান্ত সামনে, আমি পিছনে মাথা নীচু করে অপরাধীর মত বউঠানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বউঠান স্বভাব-স্নিগ্ধ কোমল কণ্ঠে বললেন—ভুট্টাগুলি আমার হাতে দাও।
নিশিকান্ত আলোয়ানের ভিতর থেকে দুটো ভুট্টা বের করে বউঠানের হ্রাতে দিল, ওর দেখাদেখি আমার দুটোও বার করে দিলাম। কোন কথা
বলে ভুট্টাগুলি হাতে করে ভিতরে চলে গেলেন, যাবার সময় শুধু বলে গেলেন—তোমরা বোস, আমি আসছি।
বসে আছি তো বসেই আছি। এক-একটা মুহূর্ত তখন আমার কাছে এক-এক ঘণ্টা। মনে তখন দুশ্চিন্তাও ঘনিয়ে এসেছে। বউঠান যদি রথীদাকে বলে দেন। যদি এই ব্যাপারটা গুরুদেবের কানে ওঠে! নিশিকান্তকে ভয়ে ভয়ে বললাম-চল পালাই।
নিশিকান্ত আবার ধমকে উঠল—চুপ করে বোস্। দেখাই যাক না শেষ পর্যন্ত কী হয়। তোর যদি এতই ভয়, তাহলে আমার সঙ্গে এলি কেন।
অগত্যা চুপ করেই বসে রইলাম। নিশিকান্ত উনেত্র হয়ে নিশ্চিন্ত, নীরবে চেয়ারে গা এলিয়ে বাঁ-পায়ের উপর ডান-পা তুলে নাচাচ্ছে। ভাবখানা যেন কবিতার একটা আইডিয়া সদ্য মাথায় গজিয়েছে, শুধু ছন্দে গেঁথে তোলাই বাকি।
এমন সময় প্রতিমা দেবী আবির্ভূত হলেন। দুই হাতে দুটি থালা। একটি থালায় গোটা আষ্টেক ডবল সাইজের পান্তুয়া, অপর থালায় সুন-ঘি মাখানো চারটি ভুট্টা। ভুট্টাগুলি আগুনের তাপে তখনও তেতে আছে।
সামনের টেবিলের উপর থালা দুটি রেখে বললেন–সব কিন্তু খেতে হবে। কিছু ফেলা চলবে না।
আমি ততক্ষণে লজ্জায় কাঠ হয়ে গেছি। নিশিকান্ত মুহূর্তমাত্র দ্বিধা না করে পান্তুয়াগুলি তুলে টপাটপ মুখে ফেলতে লাগল। অধোন্মীলিত চোখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভুলে পান্তুয়া চিবিয়ে চলেছে—শব্দ হচ্ছে চপ, চপ, চপ।
বউঠান আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন–কী, লজ্জা করছ কেন, খাওয়া শুরু কর। তা না করলে, তুমিই ঠকবে। নিশি তোমার জন্যে কিছুই বাকি রাখবে না। ওকে তো তুমি জানো।
ততক্ষণে নিশিকান্ত ভাবের ঘোরে নিজের ভাগের চারটা পান্তুয়া শেষ করে আমার ভাগের উপর হামলা চালিয়ে আর দুটো শেষ করেছে। আমি তখন নিরুপায় হয়ে থালাটা নিজের কোলের উপরেই টেনে নিলাম। নিশিকান্ত ভুট্টার থালায় হাত বাড়াল।
খাওয়া শেষ করে আমরা যখন যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছি, বউঠান বললেন–যেদিন তোমাদের ভুট্টা খাবার ইচ্ছে হবে সোজা আমার কাছে চলে এসো। আমিই খেত থেকে আনিয়ে তোমাদের খাওয়াব।
সেদিনের পর অবশ্য আমি আর কোনদিন বউঠানের কাছে ভুট্টা খেতে যাই নি। নিশিকান্ত গিয়েছিল কি না জানি না। গিয়ে থাকলেও সে কি আর আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে? আর আমিই কি ওর সঙ্গে আর কখনও যেতাম?
তবু আরেকবার ওর সঙ্গে যেতে হয়েছিল। এবার বউঠানের কাছে নয়, দিনদার কাছে। রবীন্দ্রনাথের সকল গানের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনের সকল আনন্দোৎসবের উৎস। তার কাছে ছেলে-বুড়ো সবারই ছিল অবারিত দ্বার। বিশেষ করে আশ্রমের বালক-বালিকাদের উনি খুব ভালবাসতেন। ছেলেদের বাড়িতে ডেকে এনে খাওয়ানো-দাওয়ানো, তাদের সঙ্গে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানারকম মজার গল্প করা এবং গানে অভিনয়ে সকলকে মাতিয়ে রাখা ছিল তার চরিত্রের একটি বিশেষ গুণ।
নিশিকান্তর সঙ্গে কথা হল—পরদিন খুব ভোরে উঠে দুজনে খেজুর গাছের রস খেতে যাব গোয়ালপাড়ার গ্রামে। শীতের রাত। ভোর সাড়ে চারটায় উঠে গোয়ালপাড়ায় যখন পেীছেছি তখন গাছ থেকে সবে হাঁড়ি পাড়া হচ্ছে। রস যেখানে জাল দেয় সেখানে আগুনের ধারে বসে নিশিকান্ত একাই এক হাঁড়ি রস খেয়ে দুবার ঢেকুর তুলল। আমি চেষ্টা করেও দু গেলাসের বেশী আর খেতে পারলাম না।
গোয়ালপাড়ার রাত ধরে আমরা যখন উত্তরায়ণের কাছাকাছি ফিরেছি তখন পুবদিকে রেল লাইনের ধারে তাল গাছের মাথায় সবে সূর্য যেখা দিয়েছে। রাস্তার ডানদিকে উত্তরায়ণ, বাঁদিকে দিনদার বাড়ি। নিশিকান্তর মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চাপল। বললে—চল, দিনদার বাড়ি যাই।
আমি বললাম-সে কী, এই ভোয়ে দিনদার বাড়ি? উনি হয়তো বুম থেকেই ওঠেন নি। এখন গিয়ে উৎপাত করাটা কি ঠিক হবে?
নিশিকান্ত বললে—তুই জানিস না। দিনদা এতক্ষণে চায়ের পাট নিয়ে সেছেন। কাক কোকিল ডাকবার আগেই উনি ঘুম থেকে ওঠেন। এখন গেলে বাসি মাংস খাওয়া যাবে।
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—বাসি মাংস? সে আবার কি?
