বড় বড় চোখ করে দিন বললেন–ওরে বাবা! এ যে দেখছি রামায়ণের মুনিঋষিদের দেবতার কাছে বর চাওয়ার ব্যাপার। তা তোর তপস্যার জোর আছে, তুই বর চাইতে পারিস। কথা দিলাম, যা চাইবি দেব।
খুকু বললে—আপনার লেখা কবিতার বই নীরব বীণা একখানা চাই।
নিমেষের মধ্যে দিনদা যেন চুপসে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কমল বউঠানকে বললেন একখানা বই বাক্স থেকে নিয়ে আসতে। বই এল। বইয়ের প্রথম পাতায় লিখে দিলেন কল্যাণীয়া খুকুকে দিনদার স্নেহাশীর্বাদ।
বই পেয়ে খুকুর আর আনন্দ ধরে না। আরেকবার দিনদা আর বউঠানকে প্রণাম করে সে বিদায় নিল। দিনদ। সেই যে গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন আর কোনও কথা বললেন না।
বড়ই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। যে মানুষ এতক্ষণ হাসি-ঠাট্টায় গানে-গল্পে চায়ের আসর মাতিয়ে রেখেছিলেন হঠাৎ কেন নীরব হয়ে গেলেন, এ-রহস্য কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। নিশিকান্তর দিকে চাইতেই সে ইশারা করল উঠে পড়তে; আমরা দুজন উঠে পড়তেই দিনদা শুধু একটি কথাই বললেন–আবার আসিস।
রাস্তায় বেরিয়ে নিশিকান্তকে জিজ্ঞাসা করলাম—ব্যাপরটা কি বল তো?
নিশিকান্ত বললে-খুকু দিনদার একটা দুর্বল জায়গায় ঘা দিয়েছে। পরিহাসরসিক সদাহাস্যময় দিনদার ভিতরে একটি কবি-মন লুকিয়ে আছে। আগে কবিতা লিখতেন, এখনও লেখেন কিন্তু কখনও তা ভুলেও প্রকাশ করেন না। এই নীরব বীণা কবিতার বইটি দিনদা তার যৌবনকালে অতি সঙ্কোচের সঙ্গেই ছাপিয়েছিলেন। সেই সময় সাহিত্য মাসিক পত্রিকার সম্পাদক সুরেশ সমাজপতি এই বই সম্পর্কে তার পত্রিকায় টিপ্পনী কেটে লিখেছিলেন; দাদামহাশয় ও নাতি উভয়ে মিলিয়া যেভাবে সরবে নীরব বীণা বাজাইতেছেন তাহাতে মনে হইতেছে গড়ের বাদ্যের আর প্রয়োজন হইবে না। এই মন্তব্যই কাল হল। দিনদা এসব ব্যাপারে স্বভাবতই লাজুক। তার উপর সমাজপতির রবীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে মন্তব্য করায় সেই যে আঘাত পেলেন তার ফলে দোকান থেকে সব বই চেয়ে এনে পুড়িয়ে ফেলতে যাচ্ছিলেন। কমল বউঠান তা করতে না দিয়ে বাক্স বন্দী করে রেখেছেন। এ-বই কাউকেই উনি কখনও দেখান নি এবং দেন নি। খুকু অনেক দিন ধরেই বইটি আদায়ের মতলবে ছিল। শেষে জন্মদিনের নাম করে আদায় করল।
নিশিকান্তর শেষ মন্তব্যটুকু আমার কাছে আপত্তিজনক মনে হতেই বললাম—জন্মদিনের নাম করে আদায় করল-এ-কথা তুমি কেন বলছ।
প্রমাণ চাস? সাতদিনের মধ্যে তোকে প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখিয়ে দেব। এ-কথা বলেই নিশিকান্ত হনহন করে হাঁটা দিল।
দিন সাতেক বাদে এক ছুটির দিনে ভোরে সূর্যোদয়ের আগেই নিশিকান্ত আমার বাড়ি এসেই বললে-চ, এক্ষুনি বেরোতে হবে।
সাত সকালে দু মাইল হেঁটে আবার রস খেতে যেতে হবে ভেবেই তো চক্ষুস্থির। আমি ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে বললাম—রস কিন্তু আমি খেতে যাব না।
নিশিকান্ত বললে-না রে না, রস খেতে নয়। তুই চল না আমার সঙ্গে।
নতুন কিছু একটা মতলব নিয়ে নিশিকান্ত এই ভোরে বেরিয়েছে সেটা অনুমান করতে দেরি হল না। নিশিকান্তর সব কাজেই আমার কৌতূহল অপরিসীম। ওর সঙ্গে আর কোথাও যাব না এ-প্রতিজ্ঞা বহুবার করেও তা ভাঙ্গতে হয়েছে, শুধু এই কৌতূহলের জন্যে। সেদিনও বিনা বাক্যব্যয়ে ওর সঙ্গী হলাম।
নিশিকান্তর সঙ্গে সোজা এসে হাজির হলাম দিনদার বাড়ি। যথারীতি অশথ গাছের তলায় দিনদা তখন চায়ের আসর সাজিয়ে একাই বসে আছেন।
আমাদের দেখতে পেয়েই হাঁক দিলেন-আরও দুটো কাপ পাঠিয়ে দাও, মানিকজোড় এসেছে।
নিশিকান্ত আমাকে পিছনে ফেলে হনহনিয়ে হেঁটে গিয়ে দিনদাকে এক প্রণাম ঠুকেই বললে—আজ আমার জন্মদিন।
আমি তো অবাক। আমি যেমন আমার জন্মদিন কবে তা আজও জানি, নিশিকান্তও তার নিজের জন্মদিনের খবর কোনকালেই রাখে না বলেই আমার ধারণা। সরল মানুষ দিনদা, তা-ই বিশ্বাস করে বসলেন। ব্যস্তসমত হয়ে বললেন–অই তো, তোর জন্মদিন। কী দিই তোকে বল তো। তোর তো আবার পছন্দ মত জিনিস হওয়া চাই–
নিশিকান্তর জন্মদিনে কি উপহার দেবেন এই সব নিয়ে যখন দিনা মাথা ঘামাচ্ছেন ঠিক সেই সময় বাড়ির চাকর কাঠের বাক্সর খাঁচা থেকে এক ঝাক হাঁস ছেড়ে দিয়েছে। বান্ন থেকে ছাড়া পেয়েই হাঁসগুলি মহালয়কে ছুটে চলে এসেছে আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেইখানে। দিনদার সমস্যায় সমাধান হয়ে গেল। নিশিকান্তকে বললেন–তুই তো আবার মাংস খেতে খুব ভালবাসিস। ঝাক থেকে একটা হাঁস নিয়ে যা, তোর জন্মদিনের উপহার।
দিনদার মুখ থেকে কথা বেরোতে না বেরোতেই চক্ষের নিমিষে নিশিকান্ত গায়ের আলোয়ানটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঝাঁকের মধ্যে সবচেয়ে পুরুষ্ট, সাদা ধবধবে হাঁসটার উপর। ইস্ট বেঙ্গলের গোল রক্ষক কে দত্ত যেন বডি-খে। করে রসিদের পায়ের উপর থেকে বলটা ছিনিয়ে নিল।
হাঁসটাকে আলোয়ানে মুড়ে বগলদাবা করে গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে নিশিকান্ত বললে—আজ তা হলে চলি দিনা। চা আজ আর খাব না, আরেকদিন আসব।
দিনদা নিশিকান্তর রকমসকম দেখে কেমন যেন গভীর হয়ে গেলেন। ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বললেন–সাদা হাঁসটাই নিলি। ওটা আমার বড় প্রিয় হল। ছিল রে-কি যেন ভাবতে ভাবতে দিনদা আবার বলে উঠলেন—তা তোর যখন ওইটাই পছন্দ তুই নিয়েছিস, বেশ করেছিস।
দিনদার বাড়ির চৌহদ্দি পার হতেই আমি উন্মাভরা কণ্ঠে বললাম—এটা কি উচিত হল? স্রেফ ভাঁওতা দিয়ে একটা হাঁস নিয়ে এলে?
নিশিকান্ত আমার কথার কিছুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে বলল-প্রমাণ দেব বলছিলাম, তাই দিলাম। তাছাড়া এখন আমার মাথায় ঘুরছে কোথায় স্টোভ, কোথায় তেল-নুন-ঘি-আলু-মশলা, কোথায় ডেকচি। তোর নীতিবাক্য শোনবার সময় নেই আমার।
