যতদূর মনে পড়ছে রাববি– পুরোহিত যে গৌরব-মহিমার কিছুটা বর্ণনা দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আর সবাই উপরের ধুয়াটি বলে। ফের রাববি আরও খানিকটা বর্ণনা দেন, ফের উপাসকমণ্ডলী ওই ধুয়ার পুনরাবৃত্তি করে। বিলাপের সঙ্গে সঙ্গে সকলের চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রুধারা বয়।
প্রতি শুক্রবারের বিকালে ইহুদিরা এই প্রাচীরের দিকে মুখ করে এই কিনোৎ বিলাপ করেন। অন্যান্য দিনও যে কোনও সময় দু-একজনকে কাঁদতে দেখা যায়। আমি যে মহিলাটিকে দেখিছিলুম ইনি তাদেরই একজন। আর ইহুদি পঞ্জিকা অনুসারে তাদের আব মাসের ৯ তারিখ মন্দির ধ্বংসের সাম্বাৎসরিক কিনোৎ।
প্রাচীন জেরুসলমের যে অংশে এই প্রাচীরটি পড়েছে সেটি মন্দির ধ্বংসের বহু পূর্ব থেকে গত জুন মাস পর্যন্ত ছিল, হয় রোমান, না হয় খ্রিস্টান নয়, আরবদের অধীনে। গত জুন মাসে আরব-ইজরাএল যুদ্ধের সময় আরব শাসনকর্তা ও প্রজাকুল নগর ত্যাগ করে জরডন নদীর পূর্ব পারে চলে যায়।
বিজয়ী ইহুদি প্রধান সেনাপতি দায়ান ও পুরোহিত বংশজাত (লেভি) প্রধানমন্ত্রী এশকল দুই/আড়াই হাজার বছরের পরাধীনতার পর বিলাপ প্রাচীর-এর সামনে এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গে হাজার হাজার ইহুদি। অতিশয় পরিতাপের বিষয়, যে মহোৎসব সমাধিত হল তার খবর এসেছে মাত্র কয়েক ছত্রে।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে : এশক-দায়ান এরা কি সেই প্রাচীন দিনের কিনোৎ-বিলাপ করেছিলেন? করার কী প্রয়োজন? সুলেমান হেরডের মন্দির যেখানে ছিল সেখানে নতুন মন্দির গড়ে তুলে সর্ব গৌরব-মহিমা ফিরিয়ে আনলেই হয় তা হলে অবশ্য শত শত শতাব্দীর প্রাচীন কিনোৎ পরবটি মারা যায়। আজ যদি ভারতে সর্পকুল লোপ পায় তবে কি মনসাপূজা বন্ধ হয়ে যাবে?
কিন্তু যে জায়গায় প্রাচীন মন্দির ছিল সেখানে তেরশো বছর ধরে যে মসজিদ।
হজরত মুহম্মদের পরলোকগমনের পর আরবদের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমরের সময় ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে বাইজেনটাইন খ্রিস্টানদের হারিয়ে স্বয়ং ওমর জেরুসৃলমে প্রবেশ করেই প্রশ্ন করলেন, নবী সুলেমানের মন্দির ছিল কোথায়? সেখানে তখন শহরের তাবৎ ময়লা-আবর্জনা ভর্তি ভগ্নস্তূপ। খলিফা স্বয়ং স্বহস্তে ময়লা আর পাথর সাফ করতে লাগলেন। দেখাদেখি তার সেনাপতিরা ও সৈন্যদল সে কাজে যোগ দিল। অত্যল্প সময়েই কর্ম সমাধান হলে পর ওমর সেখানে একটি মসজিদ গড়ার হুকুম দিলেন। কারণ মুসলমান শাস্ত্রানুযায়ী মক্কার কাবার পরই এ স্থানটি দ্বিতীয় পুণ্যভূমি। এরই নাম হরমশরিফ এবং এরই কাছে যেখানে মসজিদ উল আকসা(২) সেটিও অতিশয় পুণ্যভূমি কারণ হজরত মুহম্মদকে তাঁর জীবিতাবস্থায় বেহেশতে আল্লার কাছে যখন নিশাভাগে নিয়ে যাওয়া হয় (সশরীর না শুধু আত্মা এ নিয়ে মতভেদ আছে) তখন তাঁকে আরবদেশ থেকে প্রথম এই মসজিদ উল-আকসা ভূমিতে নিয়ে আসা হয়েছিল।
৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে ওমর যে সাদামাটা মসজিদ নির্মাণ করেন তার পরিবর্তে খলিফা আব্দুল মালিক আনুমানিক ৭০০ খ্রিস্টাব্দে যে মসজিদ সেখানে নির্মাণ করলেন সেটি সত্যই অতুলনীয়। বিশ্ববিখ্যাত স্থপতিদের মতে পৃথিবীর আটটি স্থাপত্যকলার নিদর্শন উল্লেখ করতে হলে এটিকে বাদ দেওয়া যায় না। তবে এটি ঠিক মসজিদ নয়, এটাকে পুণ্যসৌধ বলা চলে– আরবিতে এর নাম কুব্বত্ উস্-সরা (ডোম্ অব্ দ্য রক্)।
এ দুটি না ভেঙে সুলেমানের টেম্পল গড়া যায় না।
ইতোমধ্যে খবর এসেছে ইহুদিরা জেরুসলমে প্রবেশ করেই মসজিদ উল্-আকসার উপর ইহুদি পতাকা তুলে পূর্ণ এক দিবস সেটা সেখানে রাখে। অনেকেই এই ঝাণ্ডা ওড়ানোটাকে ইহুদির আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন স্বত্বাধিকার দাবি করার পূর্বাভাস মনে করে শঙ্কিত হয়েছেন। খ্রিস্টান উইলসন শঙ্কিত হননি, এবং খ্রিস্টান জনসন তো ইহুদির পিছনে রয়েছেনই। যা শত্রু পরে পরে। লেড়েতে-শাইলকে লড়াই।
কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে ইহুদিরা চালে করল একটা ভুল। দায়ান-এশক সম্প্রদায়ের জাতবৈরী আরেক ইহুদি সম্প্রদায়ের নাম স্যামারিটান। তাদেরও আড়াই হাজার বছরের পুরনো একটা ভাঙা মন্দির পড়ে আছে একটা টিলার উপর। ১৯৪৮ সালে প্যালেসটাইন বিভাগের সময় স্যামারিটানরা কিছুতেই দায়ান-হিস্যায় পড়তে চায়নি। তারা জরডনের আরব হিস্যাঁতে যেতে চেয়েছিল এবং যায়। জুন মাসে আরব সেখান থেকে পালালে পর এ মন্দিরেও দায়ানরা দাবির ঝাণ্ডা ওড়াতে গেলে হাতাহাতির উপক্রম হয়- যদ্যপি সেস্থলে মাত্র তিন-চারশো স্যামারিটান বাস করে (তাবত দুনিয়ায় এ সম্প্রদায়ের সাকুল্য সংখ্যাই মাত্র তিন থেকে পাঁচশো!) তবু তারা সাহস করে এ গুণ্ডামি রোকতে যায়।
তখন খ্রিস্টজগৎ– মাইনাস জনসন– শঙ্কিত হল।
জেরুসলমে যে রয়েছে প্রভু যিশুর সমাধিমন্দির এবং গণ্ডায় গণ্ডায় গির্জে। ক্যাথলিক, গ্রিক অর্থডক্স, আরমেনিয়ান, কপট, হাবশি, সিরিয়ান, লুথেরিয়ান আরও কত জাত-বেজাতের (মুসলমানদের তো মাত্র দুটো– হরম শরিফ আর আত্সা)। আজ ঝাণ্ডা ওড়ায়নি বটে কিন্তু মুসলমানের দুটো দখল করার পর ইহুদির হিম্মত বেড়ে যাওয়াতে যদি সে খ্রিস্টানগুলোও
পোপ শঙ্কিত হন সর্বপ্রথম। তার পর উইলসন। তিনি হুঙ্কারিলেন, বেরিয়ে যাও, প্রাচীন জেরুস্লম থেকে। দায়ান উত্তরিলেন, ইয়ারকি পায়া হৈ? যাব না।
