মোটা, দড়, ভারিক্তি প্রাচীর। প্রায় বিশ গজ উঁচু, অন্তত পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন গজ লম্বা। রোদে জলে পাথরের চাই তার মসৃণতা হারিয়ে খোওয়া-খাওয়া হয়ে গিয়েছে কিন্তু পাথরে পাথরে যে জোড়া লাগানো আছে সেটা আজও যেন প্রথমদিনের মতো মোক্ষম। রঙ প্রায় কালো।
কিন্তু আশ্চর্য, এ প্রাচীর যে এখানে কী করতে আছে সেটা কিছুতেই অনুমান করতে পারলুম না। অন্য প্রাচীরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে সে কোনও চত্বর বা বাড়ির বেষ্টনী নির্মাণ করেনি। শহরের মাঝখানে না হয়ে যদি ফাঁকা মাঠে এটা দেখতুম তবে হয়তো বলতুম, এটা চাঁদমারির (টারগেট শ্যুটিঙের) দেয়াল। এখানে এটার স্থাপত্যে যাকে বলে আরকিটেকচরল ফংশন কী?
একটি প্রৌঢ়া মহিলা– সর্বাঙ্গ লম্বা ভারী কালো জোব্বায় ঢাকা, মাথায় কপাল পর্যন্ত অবগুণ্ঠন, শুধু মুখের লালচে হলুদ রঙের আভা দূর থেকে দেখা যাচ্ছে এক হাত উপরে তুলে দেয়ালে রেখেছেন, দেয়ালে হেলান দিয়ে, মাথাটিও দেয়ালের উপর কাত করে রেখে যেন কোনও গতিকে দাঁড়িয়ে আছেন। খানিকটে এগিয়ে যেতে দেখি, তার দু চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে, আর ঠোঁট দুটি অল্প অল্প কাঁপছে যেন, কেমন মনে হল, মন্ত্রোচ্চারণ করছেন। কোনও প্রিয়জনের স্মরণে? কিন্তু কই, কাছে-পিঠে কোথাও তো কোনও গোরস্তান নেই। আমি আর এগোলুম না। রোদ চড়তে আরম্ভ করেছে। বাঁ-দিকে মোড় নিয়ে হেরড গেটের কাছে ভারতীয় ধর্মশালার দিকে রওনা হলুম।
একটা ছোট বাজারের ভিতর দিয়ে যেতে হয়।
প্রায়ান্ধকার রাস্তা হাত ছয় চওড়া। দু-দিকে দোকানের সারি আর রাস্তার উপরটাও ঢাকা বলে মনে হয় গোধূলির অন্ধকার যেন নেমে আসছে। তবু ফলের দোকানে কী রঙের বাহার! সবচেয়ে চোখে পড়ে আমাদের কমলানেবুর তিনগুণ সাইজের জাফা অরেজ। মধুর মতো মিষ্টি রসে টইটম্বুর। দুপুরে একটা খেলে সে বেলা আর যেন অন্নে রুচি হয় না। দুটো খেলে গা বিড়োয়।
একটা কিউরিওর দোকান। টুকিটাকি অলঙ্কার, তাবিজ, তসবি, রেকাবি, গেলাস, তীর, ধনু, আরও কত কী! কোনওটা নাকি পাঁচশো, কোনওটা নাকি পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। আমি অবশ্য জানতুম, এগুলোর ৯৯% কাইরোর কারখানায় তৈরি হয়। কোনও কোনওটাতে এস্তেক সরকারি ক্ষুদে সিলমারা আছে; সরকারি মিউজিয়াম গ্যারানটি দিচ্ছেন, এটা প্রাচীন দিনের কোনও পিরামিডে বা গোর খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছে। বলে আর কী হবে, মাল যেমন জাল, সিলও তেমনি।
সামনে দাঁড়িয়ে সেই জরমন টুরিস্ট ছোকরা। পরশুদিন আমি এদেশে এসেছি– ছোকরা বেশ কয়েক সপ্তাহ হল। আলাপ হয়েছে কাল সকালে, খ্রিস্টের সমাধিসৌধে অর্থাৎ হোলি সেপাল্কর-এ। অবাক হয়ে বললুম, এ কী ভায়া, এসব যে বিলকুল ডাড়– জাল মাল।
একগাল হেসে বলল, আমার নোটও জাল।
একসঙ্গে বাড়ির দিকে রওনা হলাম।
খানিকক্ষণ পরে আমি সেই দেয়ালের ধারের মহিলাটির কথা পাড়লুম।
বললে, সে তো ক্লাগে-মাত্তার।
জর্মন ভাষায় ক্লাগে অর্থ লেমেনটেশন অর্থাৎ বিলাপ : মাত্তার অর্থ প্রাচীর। বিলাপ করার প্রাচীর। আমি বললুম, খুলে বল।
পরম তাচ্ছিল্যভরে ঘোঁত করে উঠল, ইহুদিদের কী যেন একটা কী, আমার ও নিয়ে কোনও শিরঃপীড়া নেই। ওই যে, কে এক হিটলার, সে শিখেছে ইহুদিদের কাছ থেকে একটা মারাত্মক তত্ত্ব ইহুদিরাই এ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম বলে তারা বিশ্বেশ্বর য়াহভের নির্বাচিত সর্বোকৃষ্ট জাতি–অন্যেরা বলত, অমর ঈশ্বরের নির্বাচিত প্রিয় জাতি আমরা। ওনারা বিশ্বেশ্বরের! হিটলার ওদেরই কাছ থেকে এই অদ্ভুত, প্রলয়ঙ্করী, জাতে জাতে রক্তাক্ত সংগ্রামসৃষ্টিকারী বীজমন্ত্র শিখে নিয়ে বলল, বটে! এত বড় মিথ্যে কথা! সার সত্য কিন্তু, হে বিশ্বজন, জেনে নাও :– আমরা, আর্যরা, এবং তাদের ভিতরও নীল চোখ, সোনালি চুলওলা নরড়িকরা ত্রিলোকের সর্বোকৃষ্ট জাত। এবং এইখানেই হিটলার থামল না; বলল, এবং ইহুদিরা এ জগতে কাফরি নিগরোর মতো উন্টর মেনশ (মানব পর্যায়ের নিম্নস্তরের সৃষ্টি)-ও নয়। তারা ভারমিন, নরকের কিট! যথেষ্ট হয়েছে, আমি ওসব কোঁদলে নেই।
নিরপেক্ষ ইতিহাস বলেন, হেরড দ্য গ্রেট খ্রিস্টজন্মের মাত্র কয়েক বছর পূর্বে জেরুসলমে যে বিরাট বিচিত্র য়াহভের মন্দির নির্মাণ আরম্ভ করেন সেটা আকারে-প্রকারে সর্বভাবে হাজার বছর পূর্বেকার সুলেমানের টেম্পলের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর ছিল।(১) রোমানরা এ মন্দির ৭০ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে।
পরিপূর্ণ সম্পূর্ণ বিনষ্ট করেনি। বিরাট মন্দির-চতুরের চতুর্দিকে যে প্রাচীর একে পরিবেষ্টন করে ছিল তার একটি ক্ষুদ্র অংশ কী কারণে জানি না, আজ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে– এরই বর্ণনা দিয়ে এ লেখা আরম্ভ করেছি।
কবে এ প্রথা, অনুষ্ঠান বা আচারটা আরম্ভ হয় সেটা বলা কঠিন। অন্তত মোলশো বছর তো হবে।
প্রতি শুক্রবারের বিকেলে দেড়/ দুই হাজার বছর ধরে ইহুদিরা এই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বিলাপ রোদন করছেন। অনেকক্ষণ ধরে যে দীর্ঘ মন্ত্রোচ্চারণ করেন সেটিতে বার বার যে ধুয়া আসে (আমার যতদূর স্মরণে আসছে তারই ওপর নির্ভর করে বলছি, কারণ বহু চেষ্টা করেও এই সুন্দর কিনোৎ = ইংরেজি এলিজি মন্ত্রটি জোগাড় করতে পারিনি। তার নির্যাস আমাদের সর্বগৌরব-মহিমার যে মন্দির ধ্বংস হয়েছে আমরা তারই স্মরণে এই বিজনে রোদন করি।
