খবরটা এর চেয়েও বিস্কুটে।
ফ্রানসের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ফ্লোবেরের(১) বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস মাদাম ভারি ফ্রাসে এখন থেকে ছাপা যাবে, বেচা যাবে বটে কিন্তু বিজ্ঞাপন দেওয়া তথা বইয়ের দোকানে পেটি রেখে খদ্দের আকৃষ্ট করা বেআইনি!
কেন?
বইখানা অ্যামরাল, ইমরাল (immoral) অর্থাৎ দুর্নীতিপূর্ণ, এক কথায় অশ্লীল। বইখানা লিখতে ফ্রোবেরের লেগেছিল পূর্ণ চারটি বছর কিঞ্চিৎ অধিক–১৮৫২ থেকে ১৮৫৬। প্লটটি নিয়ে চিন্তা করেছিলেন তার পূর্বে তিনটি বছর। এই ছোট বইখানা লিখতে ফ্লোবেরের এতখানি সময় লাগল কেন? তার প্রথম কারণ, তিনি ছিলেন মাত্রাধিক পিটপিটে পারফেনিস্ট। বাস্তব জগতের পরিবেশ যেমন তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন, (অন্য উপন্যাসে একটি রোমান ভোজের নিখুঁত বর্ণনা দেবার জন্য তিনি নাকি প্রাচীন ক্ল্যাসিক্স ঘটেন– কেউ বলে ছ মাস, কেউ বলে দু বছর)(২) ঠিক তেমনি তার স্বপ্নলোক কাগজকলমে মৃণয় করার সময় তিনি চাইতেন সেটা যেন বাস্তবের চেয়েও বাস্তব হয়, এবং সর্বশেষে প্রত্যেকটি বাক্য, প্রত্যেকটি সেনটেনস যতক্ষণ না তার নিখুঁত ভারসাম্য পায়, তার প্রত্যেকটি শব্দ অন্য শব্দগুলোর সঙ্গে মিলে গিয়ে যতক্ষণ না উন্নয়নাতীত হয়, নিটোল সুডৌল না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি পরের সেটেসে যেতেন না, কিংবা বলব, যেতে পারতেন না, যেন আগের সেটেনস্ তাকে জোর করে আঁকড়ে ধরে বলছে, আমাকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছিয়ে দিয়ে তবে তুমি এগোও।
এমন দিন বহুবার গেছে, যেদিন ফ্লোবের মাত্র একটি ছত্রের বেশি লিখতে পারেননি! এটা কিংবদন্তি নয়। নইলে চারশো পাতার বই লিখতে চারটি বছর লাগবার কথা নয়। এবং স্মরণ রাখা উচিত, ফ্লোবের যখন কোনও বই লিখতে আরম্ভ করতেন, তখন সেইটে নিয়েই অষ্টপ্রহর মেতে থাকতেন। পেটের ধান্দা তার ছিল না, তার দেখভাল করার জন্য লোকের অভাব ছিল না, তিনি চিরকুমার, প্রতিদিন নিয়মিতভাবে লেখার টেবিলে বসতেন, বাড়ি ছেড়ে পারতপক্ষে রাস্তায় পর্যন্ত নামতেন না, অথচ চল্লিশ বছর সাধনার ফলস্বরূপ তিনি লিখেছেন মাত্র খান-আষ্টেক বই।
মোটামুটি ভালো বই হলেই আমরা সেটাকে বলি রসোত্তীর্ণ, খেয়াল না করেই বলি পিস অব আর্ট, কিন্তু সত্য সত্য যদি কোনও একখানি বইকে শব্দার্থে পিস অব আর্ট বলতে হয় তবে সে বই মাদাম ভারি। এর সর্বোৎকৃষ্ট পরিচিতি লিখেছেন ফ্লোবেরের পুত্রপ্রতিম প্রিয়শিষ্য মোপাসাঁ। তাঁর ভুবনবিখ্যাত নেকলেস গল্পে পাঠক ফ্লোবেরের প্রভাব দেখতে পাবেন। বস্তৃত বভারি বেরুবার পর সে-যুগের ফরাসি কৃতী লেখকদের বড় কেউই এর প্রভাব থেকে নিষ্কৃতি পাননি। একমাত্র এরকম বইকেই পিস অব আর্ট বলা চলে। সিপাহি বিদ্রোহের বছরে এই কাব্য প্রকাশিত হয়– আজও নবীন লেখক নবীন পাঠক এ পুস্তকের শরণ নেন।
মোপাসাঁ তার গুরু সম্বন্ধে দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন। আজও যারা ফ্লোবের নিয়ে আলোচনা করেন তারা এ দুটি প্রবন্ধের বরাত না দিয়ে পারেন না।(৩) এছাড়াও তিনি কাগজে-কলমে ফ্লোবেরের মৃত্যুর পর তার হয়ে একাধিক লড়াই দিয়েছেন। এসব উত্তমরূপে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য আইস, পাঠক, প্যারিস যাই।
কিন্তু প্যারিসের বর্ণনা দেবার মতো কোথায় আমার বীর্যবল, কীই-বা অধিকার! তাই আমার যেটুকু দরকার সেটুকু নিবেদন করি।
সেই ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকে প্যারিস যত না কাজ করেছে তার চেয়ে বেশি চেঁচিয়ে দুনিয়া ফাটিয়েছে, লিবেরতে (liberty), লিবেরতে, তুজুর (চিরন্তন) লা লিবেরতে। সে চিল্কারে মোহাচ্ছন্ন হয়েছেন গ্যেটে থেকে শুরু করে মিশর-ইন্ডিয়া পেরিয়ে চীন দেশের সুন ইয়াট সেন পর্যন্ত। ক্রমে ক্রমে তার বিকৃত রূপ দেখা দিল তার সামাজিক জীবনে তার আমোদ-আহ্লাদে। পুরীর নুলিয়ারা যে বড়ম্বর পরিপূর্ণ বস্তাভরণ পরিধান করে সমুদ্রে নামে, কিংবা আমাদের জেলেরা মাছ ধরার সময়, সেই পরে মেয়েরা প্যারিসে নৃত্যাদি আরম্ভ করলেন। এবং শুধু যে আপন-ভোলা নটরাজের জটার বাঁধন খুলে যায় তাই নয়, দিব্য সচেতন অবস্থায়– যাক গে, পূর্বেই বলেছি, যতখানি জ্ঞাতাস্বাদো বিপুলজঘনাং হলে পর প্যারিস বর্ণনের শাস্রাধিকার জন্মে, আমার ততখানি নেই।
এই বাতাবরণের মাঝখানে ফ্লোবের এতই সংযত সমাহিত যে, আজকের দিনের মডার্নরা তাঁকে রীতিমতো চেঁচিয়ে গালাগাল দেবেন, কাপ্রুs তোমার sহs নেই (কাপুরুষ! তোমার সাহস নেই– পাঠক সামবাজারের সসীবাবুর মত স-গুলো উচ্চারণ করবেন!)।
বইখানা পত্রিকায় কিস্তিতে কিস্তিতে বেরিয়ে পুস্তকাকারে ছাপা হবে এমন সময় ঘটল বিপর্যয়।
আল্লায় মালুম কোন শুকদেব ঠাকুরের সুপরামর্শে তখনও তো দ্য গল জন্মাননি– ফরাসি সরকার লাগিয়ে দিলেন ফ্লোবেরের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা। ফরাসি সরকারের শিক্ষা বিভাগ- মিনিস্ট্রি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন, ওই সময় থেকেই বোধহয় প্যারিসের যদো মেধা ওর নাম দেয়, মিনিস্ট্রি অব পাবলিক ডিস্ট্রাকশন।
ফ্লোবেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নাকি বভারি পুস্তকের মাধ্যমে দেশের দশের নীতিধর্মের সর্বনাশ করছেন! সোজা বাংলায় তাঁর বইখানা অশ্লীল, কদর্য!!
অশ্লীল শব্দটা একথা শুনে হেসে উঠল না তো?
সেই যে-রকম ঢাকাতে সোয়ারি কম ভাড়া হাঁকলে রসিক কুট্টি কোচমান ফিসফিস করে বলে, আস্তে কন, কত্তা, ঘোড়ায় হাসব!
