কিন্তু প্রশ্ন, মিশ্রিত ভাষা হলেই বুঝি তিনি অতুলনীয় সর্বশ্রেষ্ঠ একচ্ছত্রাধিপতি? ফরাসি ভাষা লাতিনসতা, এবং সে কিছু গ্রিক শব্দ নিয়েছে। ইটিকে প্রায় অবিমিশ্র ভাষা বলা চলে। তবে কেন মিশ্রিত ভাষার পদগৌরবদমদমত্ত সায়েব-লোগ হন্যে হবে অবিমিশ্রা ফরাসি ভাষার পিছনে পড়িমরি করে? আসলে ভঙ্গজ চৌষট্টি-আঁসলা সর্বত্রই কুলীনের জন্য ছোঁক ছোঁক করে।
মিশ্র বলেই নাকি ইংরেজি শেক্সপিয়ার, মিলটন পেয়ে ধন্য হয়েছে।
তা হলে হায় কালিদাস! তোমার কী গতি হবে, বাছা? তোমার শকুন্তলা, রঘুবংশ, মেঘদূতের পেটে বোমা মারলেও যে তাদের জবান থেকে বিদেশি লবজো বেরুবে না!
হায় হোমর, ইস্কিলস, আরিসতোফানেস, ইউরিপিদিস!
(কিন্তু আশ্চর্য, ইংরেজ তো এখনও প্রতি বছর এঁদের কাব্য লক্ষ লক্ষ ছাপায়–নয়া নয়া অনুবাদ করে!)।
প্রাচীন যুগের আধা-মিশ্র আরবি ভাষায় কবিকুল, ওল্ড টেস্টামেটের স, দায়ুদ সলমনের সঙ অব সজ তোমরা তো বানের জলে ভেসে গেলে। দাঁতের স্মরণে দীর্ঘনিশ্বাস দীর্ঘতর হল। সান্তনা, চীনা-জাপানের কবিদের সঙ্গে পরিচয় নেই। তাঁরা অন্-ওয়েট, অ-অনড়, অসাঙ হয়ে রইলেন।
পাপমুখে কী করে বলি, এক পাল্লায় মিশ্রিত ভাষার কবি, অন্য পাল্লায় অবিমিশ্র ভাষার কবিকুল তুললে কোনটা ওজনে ভারী হবে সে নিয়ে আমার মনে সন্দ আছে। অবশ্য প্রতিপক্ষ বলতে পারেন, ইংরেজি কাব্যে যে ভেরাইটি আছে অন্য কাব্যে নেই। উত্তরে বলি, ফরাসি গদ্যে যে ভেরাইটি আছে, ইংরেজি গদ্যে তা নেই। এবং অনেকে বলতে পারেন, বত্রিশ-ভাজাই দুনিয়ার সর্বোত্তম খাদ্য না-ও হতে পারে। সিংহের এক বাচ্চাই ব্যস!
বিবিসি সম্প্রতি এবারের মতো পুনরাবৃত্তি করলেন, ইংরেজিই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে চালু ভাষা। অবশ্যই। কিন্তু কোন পদ্ধতিতে সেটি চালু হল– যার বয়ান এইমাত্র দেওয়া হল– সেটি বলতে ভুলে গেলেন। হয়তো-বা সে স্থলে সেটি অবান্তর ছিল। তার পর সগর্বে বললেন, হালের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন– থুড়ি, সেমিনারে দশটি প্রবন্ধ পড়া হয়; তার ন-টি ছিল ইংরেজিতে।
আমি বলি, অধুনা ডাক্তারদের একটি সেমিনারে দশটি প্রবন্ধ পড়া হয়। তার ন-টি ছিল ক্যানসার সম্বন্ধে, তবে নিশ্চয়ই ক্যানসারের গর্ব অনুভব করা উচিত।
পদ্ধতিটা কী সম্পূর্ণ অবান্তর?
ইংরেজ তার মিশ্রিত ভাষার প্রশংসা করে। তাই শুনে শুনে এদেশের অনেকেই ইংরেজের গলার সঙ্গে বেসুরো গলা মেলান। কিন্তু তর্কস্থলে একবার যদি ধরে নিই, ইংরেজের ভাষা যদি ফরাসির মতো অপেক্ষাকৃত ঢের ঢের অবিমিশ্র হত, তা হলে কে কী করত? নিশ্চয়ই উচ্চতর কণ্ঠে বলত, ভো ভো ত্রিভুবন! শূন্বন্তু বিশ্বে… ইত্যাদি ইত্যাদি… এই যে আমাদের ভাষা সে কী নির্মল কী নির্ভেজাল! সে কোনও ভাষার কাছে ঋণী নয়, সে স্বয়ংপ্রকাশ। ওহো হো হো, সে কী পূত, পবিত্র– পর্বতনিঝরিণীর ন্যায় অপাপবিদ্ধ। আইস, ইহাতে অবগাহন করিবা!
এতে আশ্চর্য হবার কী আছে? সে তার আপন রক্ত অমিত্র রাখতে চায়, ইস্তক তার ঘোড়া, তার কুকুরটাকে পর্যন্ত দো-আঁশলা হতে দেয় না। এদেশের হুদো হুদো পকেট-ছুঁচোর কেত্তনওলা মি লাটুরা আপন আপন রক্তের বিশুদ্ধতা (অবশ্য কিঞ্চিৎ নরমান বেআইনি ভেজাল আছে বইকি!) ভাঙিয়ে মারকিন মুলুকে পয়সাউলি শাদি করছেন। প্রত্যয় যাবেন না, এই হালে বিবিসি-তেই এক ইংরেজ চারচিলের বিদেশি মাতার প্রতি ইঙ্গিত করে (যদ্যপি মাতা অধিকাংশ মারকিনের মতো গোড়াতে ইংরেজই বটেন) বলেন, হি উয়োজ নেভার কুআইট ওয়ান অব আস। শুনেছি চারছিল পার্লামেন্টে তাঁর জীবনে মাত্র একবার হুট হয়েছিলেন, তাঁর বক্তৃতা চিৎকারে অসমাপ্ত থেকে যায় তিনি যখন ডুক অব্ উইজারের মারকিন রমণী বিবাহ-প্রস্তাব সমর্থন করতে চান।
সব বাবদে ইংরেজ অবিমিশ্র থাকতে চায়– শুধু ভাষার বাবদে ব্যত্যয়!
আসলে ভাষাটা বর্ণসংকর হয়ে গিয়েছে যে! এখন এরই প্রশংসায় আসমান ফাটাও!
আমরাও হুক্কাহুয়া করি। দু-একটা নরসমেন, গোটা-দুই ফরাসিও করেছে। কেউ কিছু বললে, ওদের দোহাই দেব।
হিটলার পঞ্চাশ লক্ষ ইহুদি পোড়াল নরডিক রক্ত অমিশ্র রাখার জন্য।
ইংরেজি ভাষা নির্মিত হল কত পরাধীন জাতের রক্তশোষণের পিঠ পিঠ।
.
কিন্তু ইহসংসারের সর্বাপেক্ষা মিশ্রিত, বর্ণসংকর ভাষা কোনটি- ইংরেজি যার একশো যোজনের পাল্লায় আসতে পারে না? বেদেদের, জিপসিদের ভাষা। নর্থ-পোল থেকে সাউথ-পোল, পৃথিবীর নগণ্যতম ভাষার অবদানও এ ভাষাতে আছে। বস্তুত, মূলত ইটি কোন দেশের ভাষা, আর্য সেমিতি না মঙ্গোলীয় জাতের, সেই তর্কেরই সমাধান হয়নি।
বিবেচনা করি, এ ভাষাতে আরও ডাঙর ডাঙর শেক্সপিয়ার-মিলটন গণ্ডায় গণ্ডায় অসংখ্য রতন, ডেজারট-ফ্লাউয়ারের ন্যায়–ঘাপটি মেরে আপসে আপসে আবৃজা করছেন।
একাধিক গুণী বলেন, বেদেদের ভাষা মূলে ভারতীয়। বৎস! আর কী চাই! কেল্লা ফতেহ। আইস ভ্রাতঃ! সবে মিলি বেদেদের ভাষা শিখি।
ভূতের মুখে রাম নাম
যে কোনও ভদ্রসন্তান স্তম্ভিত হবে। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ঝাড়া দশটি মিনিট গা-গা রব ছাড়বে। অপেক্ষাকৃত রোগাপটকা ভিরমি যাবে। খবরটা এমনই অবিশ্বাস্য।
মানুষের তৈরি বেঙ্গল ফ্যামিনের সময় এক অজানা কবি রচেন–
দেখো না আজব হ্যায়,
এ যেন ভূতের পায়
স্বস্তিবাচন
করা নিবেদন।
এ যেন প্রেতের গায়
উদা উদা আতর মাখানো ভুরভুরে খুশবায়।
এ যেন দুখিনী মায়
Amery-র কাছে শিশুটির তরে
ভিক্ষার চাল চায়।
