অসংখ্য রতনরাজি বিমল উজল
খনির তিমির গর্ভে রয়েছে গভীরে।
বিজনে ফুটিয়া কত কুসুমের দল।
বিফলে সৌরভ ঢালে মরুর সমীরে ॥
বিফলে নয় বিফলে নয়– আমরা সন্ধান পেয়ে গিয়েছি। এবং চুপি চুপি বলছি, তারা যে-প্রকারের ঢক্কানিনাদ করছেন তার থেকে সন্দ হয়, তাঁরাও নিঃসন্দেহ ছিলেন, আবিষ্কৃত হবেনই।
আইস সুশীল পাঠক, এবারে আমরা সেইসব জেদের জলুস দেখে হতবাক হই (ইংরেজিতে অবশ্য জে বক্রোক্তিতে ব্যবহার হয়; যেমন কেউ যখন বলে, এই প্রেশাস জেমটি তুমি পেলে কোথায়? তখন তার অর্থ এই আকাট পণ্টকটিকে তুমি আবিষ্কার করলে কোত্থেকে? আমি কিন্তু, দোহাই ধর্মের, সেভাবে বলছিনে), এদের সৌরভ শুঁকে কৃতকৃতার্থ হই।
কেউ কেউ বলেন, বহু শতাব্দীর ভিতর দিয়ে ইংরেজি ভাষার বৃদ্ধি (গ্রোথ) অধ্যয়ন করলে রোমাঞ্চ হয় (এ থ্রিলিং স্টাডি)! অবশ্যই হয়! আমরা শুধোব, কোন ভাষার ক্রমবৃদ্ধির ইতিহাস পড়লে রোমাঞ্চ হয় না? তবে ইংরেজির বেলা একটু বেশি হয়। কেন বেশি হয়? এই সম্প্রদায় বলেন, ইংরেজি তার শব্দসম্পদ আহরণ করেছে অন্যান্য বহু ভাষা থেকে যেমন লাতিন, গ্রিক, ফরাসি, হিব্রু, আরবি, হাঙ্গেরিয়ান, চীনা– এস্তেক হিন্দি-বাংলা থেকে তবেই নাকি সম্ভব হয়েছে, এদের মতানুসারে– শেক্সপিয়ার, মিলটন, ওয়ারওয়ার, টেনিসন ইত্যাদি ইত্যাদি।
বিস্তর ভাষা থেকে এন্তের শব্দ নিয়েছে বলে ইংরেজিতে অত-শত উত্তম কবি– এ সিদ্ধান্তটি পরে আলোচনা করা যাবে।
এই যে থ্রিলিং স্টাডি সেটা সম্ভব হয়েছে ইংরেজি অন্যান্য থেকে বিস্তর শব্দ নিয়েছে বলে। সাধু প্রস্তাব!… এস্থলে আমরা তা হলে এ তথ্যের আরেকটু পিছনে যাই– যথা, ইংরেজি অত বিদেশি শব্দ নিল কোথায়, কেন, কী প্রকারে? আমি কথা দিচ্ছি। এটা আরও থ্রিলিং হবে।
১. কোনও দেশ পরাধীন হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তার ভাষাও পরাধীন হয়ে যায়। নরমান বিজয়ের পর ইংরেজি যে প্রায় তিনশো বছর অবহেলিত অপাঙক্তেয় ছিল সেকথা পূর্বেই বলেছি। এস্থলে বিজয়ী জাত যদি শিক্ষা-দীক্ষা-সভ্যতায় বিজিত জাতের চেয়ে সর্বাংশে শ্রেষ্ঠ হয় তবে বিজিত ভাষা ক্রমে ক্রমে বিদেশি ভাষার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে যায়। তাই আজও ইংরেজ সবচেয়ে বেশি ঋণী ফরাসির কাছে। এমনকি, যেসব গ্রিক-লাতিন শব্দ নিয়েছে তার চোদ্দ আনা ফরাসির মারফত।
হুবহু এই ঘটেছিল ইরানে, সে দেশে আরব বিজয়ের ফলে। তাদের শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যম হুবহু তিনশো বছর ছিল আরবি। সে ভাষার প্রভাব ফারসির ওপর এতই প্রচণ্ড যে, আজ আরবি শব্দ বর্জন করলে ফারসি এক কদমও (কদম শব্দটাও আরবি) চলতে পারবে না। হুবহু তেমনি উর্দুর ওপর (বা প্রাকৃত হরিয়ানার ওপরও বলতে পারেন) ফারসির প্রভাব পড়েছিল ও ফারসির মারফত আরবির।
পক্ষান্তরে ফ্রান্স বা জরমনির ওপর কোনও বিদেশি বেশিকাল রাজত্ব করেনি বলে ফরাসি জরমনে বিদেশি শব্দ–ইংরেজি যেরকম বে-এক্তেয়ার হয়ে গিয়েছে তার তুলনায় মুষ্টিমেয়।
২. এর পর যদি সেই বিজিত জাত– এস্থলে ইংরেজ– বিধির লেখনে আপন দেশ ছেড়ে বাণিজ্য করতে বেরোয়, সেই বাণিজ্য রক্ষা করতে গিয়ে রাজ্য জয় করতে আরম্ভ করে, এবং সর্বশেষে রাজত্ব করার ছলে ডাকাতি করে চরকা পুড়োয়, আফিঙ গেলাবার জন্য সঙিন চালায়, শত্রু ঠেকাবার জন্য কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে, ড্রাই-আরথ পলিসি এক্তেয়ার করে, নির বাগ-আবদ্ধ সহায় নর-নারীকে যারা পাশবিক হুহুঙ্কারবলে গুলি করে মারে, তারা দেশে ফিরে স্বয়ং সম্রাটের আশীর্বাদাভিনন্দনসহ সুপপ্লেট সাইজের মেডেল পায়– তবে, তখনই, সেই বাণিজ্য সেই রাজত্ব সেই ডাকাতি– এক কথায় সেই রক্তশোষণ, সেই এপ্লয়টেশনের চৌকশ সুবিধার জন্য সেইসব মহাপ্রভুরা বহু ভাষা শেখেন এবং তারই ফলে তাদের আপন ভাষাতে বেনোজলের মতো হুড়হড় করে বিদেশি শব্দ ঢোকে।
এস্থলে বিশেষভাবে লক্ষ করার জিনিস, যে বিজিত জাত ইতোপূর্বে বিজয়ী জাতের কাছ থেকে অকাতরে শব্দ নিয়ে নিয়ে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে, তারাই পরবর্তীকালে অন্য জাতকে শোষণ করার সময় আরও অকাতরে শব্দ নিতে পারে। এদের তুলনায় ফরাসি-জরমন অনভিজ্ঞ বালখিল্য। তদুপরি এরা চেয়েছিল প্রধানত রাজত্ব করতে; বাণিজ্য করতে নয়। এরা নেশন অব শপকিপারজ বা শপ-লিটারজ নয়। বণিকের মানদণ্ড যখন পোহালে শর্বরী দেখা দেয় রাজদণ্ডরূপে তখন সে রাজদণ্ডের সর্বাঙ্গে বেনে-দোকানের কালিঝুলের চিত্র-বিচিত্র ছোপ আর সপসপে ভেজাল তেলের দুর্গন্ধ।
শুনেছি, কোনও কোনও আন্তর্জাতিক গণিকা বাইশটি ভাষায় অনর্গল কথা কইতে পারে। তাদের সেই ভাষাজ্ঞান নমস্য কিন্তু পদ্ধতিটা গ্রহণ না করাই ভালো। ইংরেজের শব্দভাণ্ডার হয়তো-বা নমস্য– আমি এস্থলে তর্ক করব না, কিন্তু তার পদ্ধতিটা ঘৃণ্য। পাঠক এটা দয়া করে ভুলবেন না। যদ্যপি এস্থলে এটা ঈষৎ অবান্তর তবু মনে রাখবেন, প্রথম গোলাম হতে হবে, পরে ডাকাত হবে, তবেই শব্দভাণ্ডারে সঞ্চিত হয়। এবারে চরে খান গে– যার যা খুশি করুন। এবং স্বীকার করুন, এ স্টাডি থ্রিলিংতর নয় কি না?
কিন্তু দোহাই ধর্মের, পাঠক ভাববেন না, গোলামির কড়ি তথা লুটের মাল দিয়ে ভরতি ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করতে আমি অনিচ্ছুক। ডাকাতির মোহরও মোহর, পুণ্যশীলের মোহরও মোহর। ফোকটে পেয়ে গেলে ব্যবহার করব না কেন? মধুভাণ্ডের রস তো আগাপাশতলা চোরাই মাল– সেটা জেনেও তো কবিগুরু সিলেটের কমলালেবুর জন্য ছোঁক ছোঁক করতেন। এটা তো তবু নির্দোষ উদাহরণ। শাহ-জাহানের হারেম ছিল ফেটে-যাওয়ার-মতো ভরতি। তথাপি তিনি মাঝে-মধ্যে বাজার থেকে রমণী আনতেন। অনুযোগ করাতে বলতেন, হালওয়া মিষ্টি, তা সে যে কোনও দোকান থেকেই আসুক। হালওয়া নিক অস্ত– আজ হর দুকান্ বাদ– না কী যেন বলে ফারসিতে।
