কিন্তু যুক্তিতর্ক এক জিনিস আর অনাগত যুগের সুখস্বপ্ন দেখা অন্য বিলাস। রাজকুমারী মীরাকে রাজসভার গুণীজ্ঞানীরা নিশ্চয়ই অত্যুত্তমরূপে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, বৃন্দাবনের পেভমেন্ট(!) সোনা দিয়ে গড়া নয়, যদ্যপি বর্ষারম্ভে মেঘাগমনে তথাকার আকাশ মেদুর হয় অতি অবশ্য, ঘন তমালমরাজি জনপদভূমিকে শ্যামল করে রাখে নিঃসন্দেহেই, কিন্তু সেস্থলে বিষধর সর্পও ঠিক ওই সময়েই গোপগোপীদের প্রাণহরণ করে, তদুপরি– তদুপরি নিশ্চয়ই সভাসদরা বিস্তর অকাট্য যুক্তিতর্ক দ্বারা সপ্রমাণ করেছিলেন যে, ওই সাতিশয় অগণ্ডগ্রাম রাজকন্যার বাসভূমি হওয়ার পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত, তথাপি তিনি স্বপ্ন দেখছেন,
চাকর রহসু বাগ লাগাসু
নিতি উঠি দরশন্ পাসুঁ
বৃন্দাবনকে কুঞ্জগলিমে
তেরি লীলা গাসুঁ!
পিস্তলের বুলেট দিয়ে যেরকম ভূত মারা যায় না, যুক্তিতর্কের খাণ্ডার দিয়েও সুখস্বপ্ন খণ্ডবিখণ্ড করা যায় না।
স্বপ্ন দিয়ে তৈরি আর স্মৃতি দিয়ে গড়া মেলা ঝামেলার ভিতর রিপটার অনুপ্রবেশ করে খামখা হয়রান হতে চান না তাই বলেছিলুম, আমি রিপটার নই, হবার মতো এলেম ও হক্কও আমার নেই।
কিন্তু সেই ১৯২৯ থেকে আমি গণ্ডায় গণ্ডায় ইহুদিদের সংস্পর্শে এসেছি। বোম্বাই অঞ্চলে শনিবারের তিলি নামে পরিচিত এদেশে অতি প্রাচীনকালে আগত ইহুদিদের সঙ্গে আমি বাস করেছি (ব্যক্তিগতভাবে আমি এঁদেরই ইহজগতের সর্বোত্তম ইহুদি বলে মনে করি), দিগ্বিজয়ী ইহুদি পণ্ডিতের কাছে হিব্রু শেখার নিষ্ফল প্রচেষ্টা আমি দিয়েছি (দোষ রাব্বির নয়, আমার) ইহুদির (তথা খ্রিস্টান ও মুসলমানেরও) পুণ্যভূমিতে আমি বাস করেছি, জরডনের পাক পানিতে ওজু করেছি, গ্যালিলীয় হ্রদের অতিশয় সুস্বাদু মৎস্য আমি দিনের পর দিন দু বেলা পরম তৃপ্তি সহকারে ভক্ষণ করেছি, বস্তুত প্যালেস্টাইনের উত্তরতম সীমান্ত থেকে যেখানে সিরিয়া আজ সৈন্য সমাবেশ করেছে দক্ষিণতম সীমান্ত গিজা অবধি, তথা পূর্বতম সীমান্ত (ট্র্যান্স) জরডন থেকে পশ্চিমতম সীমান্তের খাস ইহুদি নগরী তেলআবিব (বসগিরি) পর্যন্ত অবাধে যাতায়াত করেছি।
***
পরম পরিতাপের বিষয় উপরের ছত্রের কালি শুকোতে না শুকোতে মর্মান্তিক দুঃসংবাদ এসেছে যে, আরবে-ইহুদিতে কোনওপ্রকারের সমঝতা সম্ভবপর হল না বলে সশস্ত্র যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।
এ দুঃসংবাদের পর বিমূঢ় মূহ্যমান হয়ে আমার এ অক্ষম লেখনী আর এগোতে চায় না।
যদি ইজরাএল হারে তবে তার তিনদিকের আরব বেদুইন ও বাস্তুহারা আরব (প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার) যারা জরডন অঞ্চলে কেউ কুড়ি বছর ধরে, কেউ-বা এগারো বছর ধরে তাঁবুতে তাঁবুতে দুঃখদৈন্যের জীবন কাটাতে কাটাতে এই মহালগ্নের অপেক্ষা করছিল তারা পঙ্গপালের মতো সমস্ত ইজরাএলে ছেয়ে পড়ে বালবৃদ্ধনারী কাউকে নিষ্কৃতি দেবে না। হিটলারকে ছাড়িয়ে যাবে।
আর সম্মিলিত আরব জাতিপুঞ্জ যদি হেরে যায় তবে তাদের সে অবমাননা ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও তাদের সে অবমাননা, তাদের আত্মসম্মানবোধের পরিপূর্ণ পদদলিত বিনাশ তাদের করে তুলবে নিষ্ঠুরের চেয়েও নিষ্ঠুর, সর্বনেশে ভবিষ্যতের প্রতিশোধকারী জিঘাংসু জীবন্ত প্রেতাত্মার মতো।
মধ্যযুগের সেই নির্মম ক্রুসেডের মতো এর প্রস্তুতি চলবে পুনরায় শত বছর ধরে, পরিণাম হবে শত শত বর্ষব্যাপী।
প্রথম লেখনেই আরম্ভ করেছিলুম এই বলে যে, এ তো শুধু অবতরণিকা। মনে মনে দুরাশা করেছিলুম, এই বিষবৃক্ষের চারাটাকে বিশ্বমানবের শুভবুদ্ধি হয়তো-বা উৎপাটিত করে দেবে; এখন দেখছি, এই শিশু বিষবৃক্ষ মহীরুহ হয়ে উঠবে একদিন শত শত বছর ধরে এ বিষবৃক্ষ পাবে উভয়পক্ষের ক্রোধোন্মত্ত প্রতিশোধ কামনার অপবিত্র শূকররক্তের উর্বরতাদায়ক খাদ্যনিষ্কর্য।
এ বিষবৃক্ষকে তখন আর সমূলে উৎপাটিত করা যাবে না।
যদি যায়, কিংবা বিধির আদেশে কোনও দৈবাগত ঝঞ্ঝায় সে ভূপাতিত হয় তবে সে মৃত্যুবরণ করার পূর্বে সঙ্গে নিয়ে যাবে অসংখ্য নরনারী বালবৃদ্ধকে নিষ্পিষ্ট করে তাদের প্রাণবায়ু ॥
আরব-ইজরাএল যুদ্ধারম্ভ দিবস।
————
১. ইহুদি আরব উভয়ের কাছেই এ গিরি পূতপবিত্র। কুরানশরীফে আল্লাতালা এর নাম নিয়ে শপথ গ্রহণ করেছেন। ৯৫ সুরা, ২য় ছত্র।
ভঙ্গ বনাম কুলীন
যে ভাষার প্রশংসায় এক শ্রেণির মহাজন অধুনা পঞ্চমুখ সেই ভাষায় একটি প্রবাদ আছে : হে গভীর-সংকট-সঙ্কুল-অরণ্যের-পথভ্রান্ত-পথিক, অরণ্য ভেদ করে জনপদে না পৌঁছবার পূর্বে হর্ষধ্বনি করো না। অধম আপ্তবাক্যটি বিস্মরণ করে হর্ষোল্লাস করে বসেছি, এমন সময় দেখি, আমি গভীরতম অরণ্যে। সেই শ্রেণির সজ্জনগণ এখন আরও প্রাণপণ লড়াই দিচ্ছেন, ইংরেজি যেন সর্বাবস্থায় কলেজাদিতে শিক্ষার মাধ্যমরূপে বিরাজমান থাকে। বোধহয়, অধুনা শিক্ষামন্ত্রী যে প্রাদেশিক ভারতীয় ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করে ফেলবেন বলে মনস্থির করে বসেছেন, এ সংবাদ এঁদের বিচলিত করেছে।
এই শ্রেণির একাংশ কোনও তর্কাতর্কি না করে তারস্বরে ইংরেজি ভাষাসাহিত্য ও তার প্রসাদগুণ কীর্তন করেন। সে কীর্তনের ঢঙটি বড়ই মজাদার। সর্বপ্রথম তারা বলেন, যারা বাংলা বা অন্য কোনও ভারতীয় ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান করতে চান তারা অজ্ঞ; তাঁরা ভাষাতত্ত্বের মূল নীতিই জানেন না। যেহেতু এদের প্রবন্ধাদি ও ইংরেজি কাগজে ছাপা চিঠিতে এঁদের নাম থাকে তাই প্রথমেই মনে প্রশ্ন জাগে, এঁরা বুঝি সুনীতি চাটুয্যের গুরুসম্প্রদায়। কারণ এনারা যখন বলেন, আমরা লিনুগুইসটিকস জানি না, তখন আমরা ধরে নিই, আমরা জানি আর না-ই জানি, তেনারা অতি অবশ্যই জানেন। এবং লিনগুইটিক্স তো আর মাত্র একটি বা দুটি ভাষা শিখেই আয়ত্ত করা যায় না–অতএব এঁরা নিশ্চয়ই এন্তের, বিশেষ করে ইয়োরোপীয় ভাষা, বিলক্ষণ রপ্ত করার পর আমাদের অজ্ঞ বলে আত্মপ্রসাদ অনুভব করছেন। কিন্তু কই, এঁদের নাম তো ভাষাবিদ পণ্ডিতদের নাম করার সময় কেউ বলে না। এঁরা তা হলে নিশ্চয়ই ইংরেজ কবির আদেশানুযায়ীতে
