প্রাচীন গ্রিকেরা প্রমিথিউস শব্দের অর্থ করতেন : পূর্বে (প্র)+ মতি, চিন্তাকারী (methe), কিন্তু অধ্যাপককুল প্রমিথিয়ুস নিয়েছেন সংস্কৃত প্রমন্থ= অরণি বা সমিধ অর্থে; যে দণ্ড মন্থন, ঘর্ষণ করে অগ্নি জ্বালানো হয়। দ্বিতীয়টিই শুদ্ধ। কারণ– metheus থেকে মথ, মন্থ। নইলে th=থ-এর অর্থ হয় না।
প্রমিথিয়ুস, নল– প্রমথ কখনও বিদ্রোহ করেন, কখনও বশ্যতা স্বীকার করেন। আমাদের প্রমথ শেষ পর্যন্ত কী করেন তার জন্য অত্যধিক অসহিষ্ণু না হয়ে বলি–
শতং জীব, সহস্ৰহং জীব।
———-
১. তিনি (নল) এক মুষ্টি তৃণ গ্রহণপূর্বক সূর্যদেবকে ধ্যান করিবামাত্র ওই তৃণে সহসা হুতাশন প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। দময়ন্তী সকাশে সৈরিন্ধ্রী কেশিনীর প্রতিবেদন। বনপর্ব।
২. এ তত্ত্বটি আমার গুরু আমাকে বলেন, কিন্তু আমি এটি কোথাও পাইনি। কেউ জানাতে পারলে বাধিত হব।
বিষবৃক্ষ
নিতান্ত বাধ্য হয়ে আমাকে কিছু ব্যক্তিগত কথা বলতে হচ্ছে। আমি খবরের কাগজের সম্মানিত রিপটার নই। তাঁদের আপ্রাণ চেষ্টা, যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ নৈর্ব্যক্তিক (ইপাসনাল) ভাবে আপন বয়ান পাঠকের সম্মুখে পেশ করা। তৎসত্ত্বেও তারা মাঝে মাঝে কটুবাক্য শুনতে পান। পাঠকসাধারণ ভুলে যান, রিপটারও মাটির মানুষ, তারও ধর্মবুদ্ধি আছে, সে-ও অন্যায়-অবিচারের সামনে কখনও কখনও আত্মসংযম না করতে পেরে উত্তেজিত ভাষা ব্যবহার করে। ফলে কখনও-বা কটুবাক্য শুনতে হয়, কখনও-বা হাততালিও পেয়ে যায়। প্রকৃত রিপটার অবশ্য কোনওটারই তোয়াক্কা করে না। সে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে যদি দেখে যে, সে নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পেরেছে।
রিপরটার হওয়ার মতো শক্তি আমার নেই। তদুপরি দৈনন্দিন যেসব ঘটনা রিপরুটেড হচ্ছে, তার যদি কোনও ঐতিহাসিক মূল্য না থাকে, সে যদি আমাকে মানবসমাজের পতন উত্থান সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ চিন্তার খোরাক না যোগায় তবে সে জিনিসের প্রতি আপনার-আমার মতো সাধারণজনের চিত্ত আকর্ষিত হয় না।
যেমন ধরুন আরব-ইজরাএল দ্বন্দ্ব। কথার কথা কইছি, কাল যদি মার্কিন, ইংরেজ, ফরাসি, রুশ সবাই একজোট হয়ে একটা সমাধান করে দেন যার চেষ্টা এখন প্রতিদিনই হচ্ছে– তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, উভয় পক্ষই যখন শান্ত হয়ে গেছেন তখন আমরাও নিশ্চিন্ত মনে আর পাঁচটা খবরের দিকে নজর বুলাই। আর রিপরটারদের তো কথাই নেই। দুই প্রতিবেশী শান্তিতে আছে– এটা খবর নয়। দুই প্রতিবেশীতে খুনোখুনি হচ্ছে সেটা খবর। সংবাদ-সরবরাহ-ভুবনের আপ্তবাক্য- কুকুর মানুষকে কামড়ালে সেটা খবর নয়, মানুষ কুকুরকে কামড়ালে সেটা খবর।
অথচ আমি বিলক্ষণ জানি, আরব-ইজরাএল সমস্যার প্রকৃত সমাধান যে কী, তার সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি। নাসির বলছেন, আমি ইজরাএলকে সমূলে উৎপাটন করব। ওদিকে ইজরাএল যেটুকু জমির উপর এখন রাজ করছেন তা নিয়ে যে তিনি একদম সন্তুষ্ট নন, সেকথাও তিনি গোপন রাখেন না। অ্যানটনি ইডন-এর গোঁয়ার অভিযানের ফলে যখন ইজরাএল সৈন্য সবলে মিশরের সাইনাই (সিনাই, আরবিতে(১) সিনিন, সিনা) অধিকার করে তখন আনন্দে উল্লাসে কম্পিত, ভাবাবেগ দমনে অশক্ত ইজরাএল-প্রধান বেন গুরিয়ন যাজকসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেন তার অর্থ, আমরা আমাদের ন্যায্য ভূমি অধিকার করেছি, এ ভূমি আমরা আর কখনও পরিত্যাগ করব না। তাঁকে পরিত্যাগ করতে হয়েছিল (এবং আজ সেখানে পুনরায় দুই দল সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু তার বাক্যের প্রথমার্ধ, অর্থাৎ সাইনাই ইজরাএলের প্রাপ্য, এটা ইজরাএল-দৃষ্টিবিন্দু থেকে সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। রাজা সলমনের (আরবিতে সুলেমান) আমলে ইহুদি রাজত্ব কতখানি বিস্তৃত ছিল সেটা পাঠক বাইবেলের পিছনে যে প্রাচীন যুগের ম্যাপ দেওয়া থাকে সেইটে দেখলেই কিছুটা বুঝতে পারবেন। আজ তার বৃহৎ অংশ লেবানন, সিরিয়া, জর্ডন, মিশরের দখলে। কিন্তু হায়, বিশ্বের আদালত ইজরাএলের আড়াই হাজার বছরের তামাদি এ দাবি মানবে না। প্রায় দু হাজার বছর ধরে ইহুদিরা তাদের পুণ্যভূমি প্যালেস্টাইন ত্যাগ করে দলে দলে সেই সুদূর রুশ দেশ থেকে আমেরিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু একথাও সত্য, ইহুদিদের যাজক-সম্প্রদায় কখনওই আপন পুণ্যভূমিতে ফিরে যাবার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি। কারণ, স্বয়ং ইহুদির সদাজাগ্রত প্রভু য়াহবে ধর্মগ্রন্থ তোরাতে প্রতিজ্ঞা করেছেন, আমি তোমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাব, সেই দুগ্ধ-মধুর দেশে। এ স্বপ্ন বাস্তবে দানা বাঁধতে আরম্ভ করে প্রধানত ঊনবিংশ শতাব্দীতে এরই নাম জায়োনিজম এবং এর প্রধান কেন্দ্র ছিল জরমনিতে। মহাকবি হাইনে কিছুদিন বারলিনে এ আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন কিন্তু পরে সেটা ত্যাগ করেন; বস্তৃত জায়োনিজমের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই একদল শক্তিশালী ইহুদি এ আন্দোলনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তাঁদের বক্তব্য ছিল : প্যালেস্টাইনে স্বাধীন ইহুদি রাজ্য নির্মাণের প্রস্তাব দূরে থাক, সেখানে ইহুদিদের জন্য কোনও ধরনেরই খাস ন্যাশনাল হোম করা হবে ভুল। কারণ সে দেশ ছেড়েছি আমরা দু হাজার বছর পূর্বে, এখন (১৯/২০ শতাব্দীতে) সেখানে শতকরা দশজন ইহুদিও বাস করে না, বাদবাকি শতকরা ৭০/৮০ মুসলমান, ১৫/২০ খ্রিস্টান (হিসাবটা খুবই মোটামুটি, কারণ সে যুগে এ অঞ্চলের তুর্কি শাসনকর্তারা আদমশুমারিতে বিশ্বাস করতেন না। এখানে শত শত বছর ধরে বাস করছে (এবং এঁরা না বললেও আমরা জানি, এই মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের অনেকেই গোড়াতে ইহুদি ছিল, পরে ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান-খ্রিস্টান হয়। প্রভু যিশু স্বয়ং ইহুদি ছিলেন এবং তিনি যাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেন তার ৯৯% ছিলেন জাত-ইহুদি। পরবর্তী যুগে এঁদের অনেকেই হয়ে যান মুসলমান)। এঁদের অধিকাংশই চাষা, জেলে। এদের ভিটেমাটি কেড়ে না নিয়ে নবাগত ইহুদিদের বসাবে কোথায়?… তার চেয়ে বহুতর গুণে কাম্য আমরা, ইহুদিরা, যেন যেসব দেশে বাস করি সেইসব দেশের পূর্ণ নাগরিক হয়ে যাই। আমার যতদূর মনে পড়ছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন লয়েড জরজ ইহুদির জন্য ন্যাশনাল হোমের খসড়া বানাচ্ছেন তখন ভারত-খ্যাত ইহুদি (?) মনটাগু এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং বার বার বলেন, এতে করে আখেরে ইহুদিকুলের অমঙ্গল হবে।
