তবু হিন্দু মন সর্বক্ষণ খুঁত খুঁত করে আচারের সন্ধানে। সে চায়, সর্ব সমস্যার সামনে সে যেন নজির দেখাতে পারে, এটা পূর্বে এরকম পদ্ধতিতে হয়েছে, অতএব এবারেও সেইরকম হওয়া উচিত– এটা এরকম হয়নি, অতএব এবারে হবে না; তাতে করে নবাগত ছাত্রের অসুবিধা হোক আর না-ই হোক। মুসলমান যে এ বাবদে দুর্দান্ত প্রগতিশীল তা নয়, সে-ও ইনোভেশনকে ডরায় এবং তাকে বলে বিদাৎ, কিন্তু ইসলাম মাত্র ১৩০০ বছর পুরনো বলে অতখানি লোকাচার দেশাচারের দোহাই দেয় না।
প্রমথনাথ বিশী ছিলেন এই ট্র্যাডিশন নামক প্রতিষ্ঠানটির দুশমন। বিচার সভা তথা অন্যান্য স্থলে তিনি প্রিসিডেনসের দোহাই শুনতে চাইতেন না। তাঁর বক্তব্য এবং সেটা সবসময়ই উত্তেজিত কণ্ঠে পঞ্চমে, তদুপরি তার কণ্ঠস্বরটি ঠিক আব্দুল করীম খানের মতো নয়– শুনে আমার মনে হত, তাঁর নীতি; নতুন সমস্যা যখন এসেছে তখন তার নতুন সমাধান খুঁজতে হবে এবং যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করে পূর্বে হয়নি, তাই এখন হবে না, এটা কোনও কাজের কথা নয়। অবশ্য তিনি যে সবসময় রেশনালিটি এবাভ অল সচেতনভাবে ভলতেরের মতো নীতিরূপে গ্রহণ করতেন তা না-ও হতে পারে।… এমনকি শুরু রবীন্দ্রনাথের মতের বিরোধিতাও তিনি করেছেন। এই নিয়ে বোধহয় গুরু-শিষ্যে মনোমালিন্যও হয়েছে। তবে নিশ্চয়ই চিরস্থায়ী তো নয়ই, দীর্ঘস্থায়ীও নয়।
প্রমথনাথ জাত সাহিত্যিক। শান্তিনিকেতনে যখন ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কলেজ স্থাপিত হল– সাধারণ জন একেই বিশ্বভারতী বলে, যেন গোড়ার স্কুলটি বিশ্বভারতীর সোপান নয়– তখন রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রণ জানালেন বিশ্বাচার্যদের। তারা এসে পূর্ণোদ্যমে আরম্ভ করলেন, প্রধানত প্রাচ্যবিদ্যাচর্চা (এবং সর্বপ্রধানত ইন্ডলজি)– চীনা, তিব্বতি ভাষাও বাদ গেল না, এবং লাতিন, ফরাসি, জর্মন ইত্যাদি ইউরোপীয় ভাষাচর্চা। সবাই সেই দয়ে মজলেন। বাঘা বাঘা পণ্ডিত যেমন বিধু শাস্ত্রী, ক্ষিতি শাস্ত্রী, সাহিত্যিক অমিয় চক্র, এস্তেক ক্ষিতিমোহনের সহধর্মিণী ঠানদি– কেউ ফরাসি, কেউ জর্মন, কেউ চীনা, কেউ-বা তিব্বতি শিখছেন মাথায় গামছা বেঁধে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নোটবই হাতে নিয়ে লেভি-র ক্লাসে শিখছেন একাক্ষরপারমিতার ঠিকুজি আর অহিবুধনিয় সংহিতার কুলজি।
শুধু শ্রীপ্রমথ নিশ্চল নির্বিকার। তিনি বেঙ্গলি লিতেরাতোর পার একসেলাস (litterateur par excellence) বঙ্গসাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধক। তার কোন প্রয়োজন, রজত কাঞ্চন? এমনকি সংস্কৃত ব্যাকরণ ঘটতেও তিনি নারাজ। হরিবাবু স্কুলে যেটুকু শিখিয়ে দিয়েছেন তারই প্রসাদাৎ তিনি কালিদাস শূদ্রক পড়ে নেবেনখন। শুনেছি, লক্ষৌয়ের খানদানি ঘরের ছেলেকে উর্দু ভিন্ন অন্য কোনও ভাষা বলতে দেওয়া হয় না– পাছে বিজাতীয় ভাষা বলতে গিয়ে উর্দুর তরে বিধিনির্মিত তার মুখের ডৌল অন্য ধ্বনির খাতিরে এডজাসটেড হয়ে বিকৃত হয়ে যায়!
বিশ্বভারতীর উত্তর-বিভাগকে (কলেজকে) এহেন নিরঙ্কুশ বয়কট করার পিছনে বিশীদার হৃৎ-করে সেই বিদ্রোহ ভাব ছিল কি না হলফ করে বলতে পারব না।
কিন্তু বিএ এমএ তো পাস করতে হয়; নইলে গ্রাসাচ্ছাদন হবে কী প্রকারে?
অতিশয় অনিচ্ছায় তিনি কলকাতার কলেজে ঢুকলেন। তাঁর কলেজ-জীবন সম্বন্ধে আমি বিন্দুবিসর্গ পর্যন্ত জানিনে। এই মর্মান্তিক অধ্যায় তিনি বোধহয় তার জীবন-পুঁথি থেকে ছিঁড়ে ফেলেছেন। তবে আমি নিঃসন্দেহ, প্রসি-প্রতিষ্ঠান-প্রসাদাৎ তিনি তাঁর কলেজ-জীবনের ন-সিকে কাটিয়েছেন চায়ের দোকানে, মেসের রকে এবং ইহলোক পরলোকের সর্ববিশ্ববিদ্যালয়কে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ্য অভিসম্পাত অনবরত দিতে দিতে। এবং আমি তার চেয়েও নিঃসন্দেহ, এমএস পাস করার পর তিনি বঙ্গভাষাসাহিত্য ও তজ্জড়িত তত্ত্ব ও তথ্য ব্যতিরেকে বিশ্ববিদ্যালয়র্জিত সাতিশয় বিতৃষ্ণা ও চরম জুগুপ্সাসহ অর্জিত জ্ঞানগম্যি শেষনাগের মতো, প্রাগুক্ত অহিবুধনিয় সংহিতায় অহির বাৎসরিক কবর্জনন্যায় অক্লেশে পরম পরিতোষ সহকারে ত্যাগ করেছেন চিরকালের তরে। লোকে যখন শুধোয়, কালচার কী– উত্তরে গুণীজন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়লব্ধ জ্ঞানগম্যি বিস্মৃত হওয়ার পর যেটুকু অবশিষ্ট থাকে সেই কালচার। কিন্তু, প্রমথনাথের কালচার অত্যন্ত কনসানট্রেটেড নির্যাসেরও নির্যাস। মাত্র একবার, তা-ও অযত্নে ডেসটিল করা গৌড়ি (rum) বা মধ্বী (mead, meth) খেয়েই মানুষ হয় গড়াগড়ি দেয় নয় ল্যাম্পপোস্ট ধরে চুমো খায়– যেন লঙ লসট ব্রাদার। রাজা জহানগির খেতেন ডবল ডেসটি এরেক। প্রমথনাথের ব্রুয়ারিতে পাক বড় কড়া–শতগুণে কড়া।
কিন্তু সেই বিদ্রোহীর কী হয়?
শ-র কৃষ্ণাও একদিন হৃদয়ঙ্গম করল, এলোপাতাড়ি লাঠির বাড়ি ধুপুস-ধাপুস মারাতে কোনও তত্ত্ব নেই। নিছক বর্বরস্য শক্তিক্ষয়। প্রমথ তাই প্রমথেশের মতো ধ্যানতাণ্ডবে সম্মেলন করেছেন।
কিন্তু বিদ্রোহী থাকবেই।
কেন?
প্রমথের প্রিয় কবি শেলি। তাঁর প্রিয় এবং শ্রেষ্ঠ নায়ক প্রমিথিয়স অনবাউন্ড। তিনি দেবাদিদেব দ্যোঃ পিতর, জুপিটারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বর্গলোক হতে অগ্নি নিয়ে এসে মানবসন্তানকে উপহার দেন– যার জন্য তাবৎ সভ্যতাসংস্কৃতির সৃষ্টি। প্রমথগণ ধূর্জটির অনুচর বা ইয়েস-মেন বটেন কিন্তু প্রমথগণ অগ্নিবাহ রূপেও পরিচিত– এঁরা মরীচির পুত্র ও সপ্ত পিতৃগণের প্রমথ। তা প্রমথ অগ্নির পুত্র। অপরঞ্চ গ্রিক পুরাণে আছে প্রমিথিয়ুস নলের (reed–এবং স্যাকরারা এখনও নল ব্যবহার করে, তথা অগ্ন্যস্ত্র অর্থে নালাস্ত্র, নালিকও ব্যবহৃত হয়) মাধ্যমে পৃথিবীতে অগ্নি আনয়ন করেন। এবং আমাদের কাহিনীতে আছে, নলরাজ ইন্ধন প্রজ্বালনে সুচতুর ছিলেন।(১) এবং এই নলের বিরুদ্ধে দেবতারা যেরকম লেগেছিলেন (প্রমিথিয়ুসের বিরুদ্ধে জুপিটার) অন্য কারও বিরুদ্ধে না; আমার পুরাণাদির জ্ঞান অতিশয় সীমাবদ্ধ, তাই শপথ দিতে পারছি না, অন্য কোনও মানবীর স্বয়ংবরে স্বয়ং দেবতারা সপত্নরূপে অবতরণ করেছিলেন কি না–দময়ন্তীর বেলা যেরকম করেছিলেন। এবং নলের অন্য নাম প্রমন্থ।(২)
