দুর্ভাগ্যের বিষয়, সম্পাদক মহাশয়, সে যুগে ফিলিমি ছিল না, তার মাসিক ছিল না, তস্য সম্পাদক ছিলেন না। কাজেই তাঁকে কীভাবে সম্বোধন করতে হয় সে-বাবদে কোনও প্রোটকল খুঁজে পেলুম না। তবু খুঁজছি, কারণ দুধ না পেলেও পিটুলি পাব নিশ্চয়ই!!
————
১. ইসলামে দাস যেমন আইনগত পূর্ণ নাগরিক নয় (সেখানেও সে কোনও কিছু স্টেক করতে পারে না) ঠিক তেমনি সে কোনও আইনভঙ্গ করলে (চুরি, ডাকাতি) তার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা হয় না। খেসারত দিতে হয় মুনিবকে।
২. জ্বর-জ্বালাদি রোগকেও পাশ বলে ধারণা করা হত বলে অথর্ববেদে ঋষি পাশমুক্তির জন্য বরুণদেবকে আহ্বান জানাতেন।
বিদ্রোহী
ইংরেজ কবি পারসি বিশ শেলির মধ্য-শব্দটি আমরা উচ্চারণ করতুম বিশী, কারণ অন্তে রয়েছে e অক্ষরটি এবং তাই আমরা বাল্যবয়সে শ্ৰীযুক্ত প্রমথনাথ বিশির সঙ্গে ইংরেজ কবি শেলির সাদৃশ্য দেখতে পেতুম। তিনি মোলায়েম প্রেমের কবিতা লিখতেন, কিন্তু ওদিকে তিনি আবার ছিলেন মাহমুদ বাদশার মতো প্রতিমা-বিনাশধর্মী– এ সংসারে যত প্রকারের false idols, false ideals, অন্ধবিশ্বাস, ভক্তিভরে কুমড়ো গড়াগড়ি, যা কিছু বুদ্ধিবৃত্তির ওপর নির্ভর করে না তার বিরুদ্ধে ছিল বিশীদার জিহাদ। তাই তিনি কবিতাগুলোকে পরাতেন প্রাচীন আসামের ছদ্মবেশ। নজরুল ইসলাম তখন সবে ধূমকেতুর মতো আত্মপ্রকাশ করেছেন। বিদ্রোহী কাজীকবি পরশুরাম হলে (ক্ষত্রিয়, ফিরিঙ্গি বিনাশার্থে তাঁর অবতরণ) প্রমথনাথ তাঁরই অনবচ্ছিন্ন পূর্ববর্তী বামনাবতার। তাই তিনি অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সেই হয়ে যান বারনারডশর প্রতি আসক্ত। এখানে আরও একটি সাদৃশ্য পাঠক পাবেন। বারনারডশ ছিলেন প্রতিমাবিনাশী। তার আদর্শ চরিত্র, সেই ব্ল্যাক গার্ল ওলড টেস্টামেনটের দেবতাগুলোকে তার ডাণ্ডা দিয়ে ক্রমাগত ভেঙে যাচ্ছে আর খুঁজে বেড়াচ্ছে শাশ্বত ভগবানকে।
প্রমথনাথ তাঁর ডাণ্ডা– নবকেরি নিয়ে আক্রমণ করতেন– প্রধানত বাঙালির জড়ত্বকে। শান্তিনিকেতন আশ্রমও রেহাই পেত না।
এটা এল কোথা থেকে!
আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের চতুর্দিকে যেসব অন্ধ-স্তাবকসম্প্রদায় রবীন্দ্রনাথকে প্রায় কর্তাভজাদের গুরুর আসনে বসাতে চাইতেন তার বিরুদ্ধে ছিল কিশোর প্রমথ-র ঘোরতর উম্মা। এদেরও ছাড়িয়ে যেতেন বাইরের থেকে প্রধানত কলকাতা থেকে আসতেন যেসব স্তাবক সম্প্রদায়। এঁদের কেউ কেউ বিলিতি ডিগ্রিধারী, জামাকাপড় চোস্তদুরুস্ত– কাঁধে ক্যামেরা ঝোলানো।
এদেরই মুখ দিয়ে ডি এল রায় বলিয়েছিলেন, কবিগুরুর উদ্দেশে :
মর্ত্যভূমে অবতীর্ণ কুইলের কলমফ হস্তে
কে তুমি হে মহাপ্রভু নমস্তে নমস্তে!
কিন্তু এর পরপরই রায় করলেন ভুল; রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে বললেন ঝুট কথা :
আমি একটা উচ্চ কবি, এমনিধারা উচ্চ,
শেলি ভিক্টোর য়ুগো মাইকেল আমার কাছে তুচ্ছ!
এরকম ধারণা রবীন্দ্রনাথ তো পোষণই করতেন না– বলা দূরে থাক। তিনি ছিলেন শেলির ভক্ত। বস্তুত তিনি বার বার আমাদের পড়িয়েছেন শেলির কবিতা। আমার বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথই বিশীদাকে শেলির প্রতি অনুরক্ত হবার পথ দেখিয়ে দেন।
বস্তুত রবীন্দ্রনাথ এই অন্ধ-স্তাবকদের নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। এবং তার ধৈর্যচ্যুতি যখন ঘটল তখন দুর্ভাগ্যক্রমে একাধিক সত্য গুণগ্রাহীকেও তাঁর কাছ থেকে অযথা কটুবাক্য শুনতে হল। ইরানি কবি তাই বলেছেন :
দাবানল যবে দগ্ধদাহনে বনস্পতিরে ধরে
শুষ্কপত্রে, আর্দ্রপত্রে তফাৎ কিছু না করে।
পাঠকের স্মরণে আসতে পারে রবীন্দ্রনাথের অপ্রিয় সত্যভাষণ– যখন তাঁর নোবেল পুরস্কার পাওয়া উপলক্ষে কলকাতা থেকে বহুলোক শান্তিনিকেতনে এসে তাঁকে অভিনন্দন জানান। আমার যতদূর জানা, বালক প্রমথনাথ সে সভায় উপস্থিত ছিলেন।
কিন্তু এহ বাহ্য। অন্ধ-স্তাবকদের চিনতে আমাদের বেশি সময় লাগেনি। কারণ এদের কেউ কেউ বিশেষত বিলেতফের্তারা, শ-র ভাষায় উয়েল শেল্ড অ্যান্ড উয়েল সোপড়, আসতেন আমাদের মতো ডর্মিটারিবাসী নিরীহদের ওপর ফপরদালালি করতে। তখন অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে যেত, শব্দসমন্বয় দ্বারা যে আলিম্পন সৃষ্ট হয়ে লিরিক উচ্ছ্বসিত হয় সে রসে তাঁরা বঞ্চিত, রবীন্দ্রসঙ্গীতে সুর এবং কথা কীরকম অদ্ভুত অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্টের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে অভূতপূর্ব সমন্বয়জনিত রসসৃষ্টি করেছে সে বিষয়ে পরিপূর্ণ জড়ভরত। এদের কেউ কেউ ছিলেন আবার পয়লা-নম্বরি ব্লাফমাস্টার। তিনি যে অন্ধস্তাবক নন সেইটে বোঝাবার জন্য একজন আমাকে বলেন, পুব হাওয়াতে দেয় দোলা, মরি মরি– এই মরি মরি টা কেমন যেন বস্তাপচা বলে মনে হয় না। আমি বিস্ময়ে নির্বাক। অতি মহৎ কবিই যে হ্যাঁকনিড ক্লিশের নতুন ব্যবহার করে নবীন রস সৃষ্টি করেন, এ তত্ত্বটা এই ফিরিঙ্গি-মার্কা এ্যাডুয়েট জানে না? আমার তো মনে হত, এস্থলে মরি মরি ভিন্ন অন্য কিছুই মানাত না।
কিন্তু বিশীদা ছিলেন কালাপাহাড়। আশ্রমের সে সময়কার ভাষায় এদের হুট করে দিতে তাকে অতিমাত্রায় বেগ পেতে হত না। তাঁকে দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হতে হত আশ্রমের ভিতরকার অন্ধ-স্তাবকদের নিয়ে। বিশেষ করে বিচার-সভায় অর্থাৎ আশ্রম পরিচালনার ব্যাপার নিয়ে।
শান্তিনিকেতনের বয়স তখন কত? একুশ-বাইশের মতো। এত অল্প সময়ের মধ্যে কোনও ট্র্যাডিশন, ঐতিহ্য, আচার নির্মিত হতে পারে না। বিশেষত শুরু রবীন্দ্রনাথই করে যাচ্ছেন নানা প্রকারের এক্সপেরিমেন্ট। একবার ভেবে দেখলেই হয়, আশ্রম প্রবর্তনের সময় ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণে একই পঙক্তিতে ভোজন করত না, কিছুদিন পরে একজন কায়স্থ শিক্ষক আসছেন শুনে কর্তৃপক্ষ সন্ত্রস্ত, ব্রাহ্মণ শিষ্য এই ব্রাহ্মণ শুরুর পদধূলি প্রতি প্রাতে নেবে কি না! তারই পনেরো বছর পর আমি যখন পৌঁছলুম তখন সেসব সমস্যা অন্তর্ধান করেছে। ইতোমধ্যে মৌলানা শওকত আলী সাধারণ ভোজনালয়ে ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণ ব্রাত্য সক্কলের সঙ্গে এই পঙক্তিতে ভোজন করে গেছেন।
