সর্বনাশ! আজকের দিনের ভাষায় বলতে গেলে এ যেন নিতান্ত চ্যাংড়া ঘানা বা মালি রাষ্ট্র সেকুরিটি কৌনসিলে বলে বসল, এই সকল বিচার করিয়া দেখিলে (অর্থাৎ যেহেতু ইজরাএলই প্রথম আক্রমণ করেছে) সাইনাইকে ইজরালের (প্রাচীন দিনের ভাষায় দুর্যোধনের) জয়লব্ধ বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না।
ধুন্ধুমার লেগে গেল সভায়, মহাভারতের ভাষায় সঙ্কলরবে (একসুরে) তুমুল নিনাদ উঠল সভাস্থলে। এখানে আমার বলা উচিত যে, বিদুরাদি কেউ কিছু বলার পূর্বেই বিকর্ণ আপন রায় দিয়ে বসে আছেন। তাঁর ভয় হয়েছিল, প্রবীণরা নীরবতা দিয়ে দ্রুপদনন্দিনীর প্রশ্নটি পিষে ফেলবেন– নীরবতা যে শুধুমাত্র হিরন্ময় তাই নয়, সরব প্রশ্নকে নিধন করার মারণাস্ত্রও বটে।
অনেকেই বিকর্ণের পক্ষে সায় দিচ্ছেন দেখে কর্ণ ফ্লর গ্রহণ করলেন। বললেন, হে বিকর্ণ, এই সভায় বহুবিধ বিকৃতি দৃষ্ট হইতেছে বটে।
আমরাও বলি, সেই কথাই কও। বিকৃতি মানে প্রোটকল-সম্মত নয়!
কর্ণ বললেন, তুমিই কেবল বালস্বভাবসুলভ অসহিষ্ণুতায় অধৈর্য হইয়া স্থবিরোচিত বাক্য প্রয়োগ করিতেছ। তুমি দুর্যোধনের কনিষ্ঠ, পর্ব বিষয়ে যথাবৎ অভিজ্ঞ হও নাই।
এইবারে কর্ণ মারলেন পেরেকটার ঠিক মাথার উপর মোক্ষম ঘা। এই পর্ব বস্তুটি কী? কারণ মহাভারতের ধৃতরাষ্ট্রের শতপুত্রের যে নির্ঘণ্ট আছে তার প্রথমটার মতে বিকর্ণের নম্বর আট, দ্বিতীয়টার মতে উনিশ।
আর পর্ব অর্থই হচ্ছে নির্দিষ্ট–আমাদের পরব মাত্রই হয় নির্দিষ্ট দিন ক্ষ্যাণে। তাই পর্বই হচ্ছে প্রোটকল। যা নির্দিষ্ট হয়ে গেছে, যার থেকে নড়চড় নেই। বিকর্ণ সেই প্রোটকল ভঙ্গ করেছেন। কিন্তু তার ও দ্রৌপদীর কার্যোদ্ধার অংশত হয়ে গেছে। ওদিকে আবার কর্ণ স্বয়ং করে বসেছেন প্রোটকলে গলদ!
কারণ সভারম্ভেই মি. প্রেসিডেন্ট দুর্যোধন প্রোটকল ধার্য করে দিয়েছেন– কর্ণ যাকে পর্ব বলেছেন যে, কৌরবগণ দ্রৌপদীর সমক্ষে তাহার প্রশ্নের উত্তর করুন। অর্থাৎ তিনি ফ্লর দিয়েছেন কুরু সদস্যদের। অপিচ কর্ণ আইনত (ডে জুরে) রথচালক শ্রেণির লোক– আজকের ভাষায় শোফার সর্দারজি ক্লাস (যদ্যপি প্রকৃতপক্ষে (ডে ফাটো) তিনি কুন্তীনন্দন প্রথম পাণ্ডব; কিন্তু সদস্যগণ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ বলে এ বিবেচনা এস্থলে উঠতে পারেনি, কস্মিনকালে ওঠেওনি]। তিনি ফ্লর গ্রহণ করতে পারেন না। তবে বিকর্ণ যে প্রোটকল ভঙ্গ করেছেন সেটা হয়তো তিনি দেখিয়ে দিতে পারেন– কারণ পইন্ট অব্ অরডার সভাসীন যে কোনও সদস্য যে কোনও সময়ে তুলতে পারেন। কিন্তু তার পর কর্ণ যখন বললেন, দ্রৌপদী ও পাণ্ডবগণের যাহা কিছু আছে সে সমুদয়ই শকুনি ধর্মতঃ জয় করিয়াছেন তখন তিনি বিলকুল আউট অব্ প্রোটকল। কারণ প্রেসিডেন্ট রুলিং দিয়েছেন, উত্তর দেবেন কৌরবরা।
অতএব দ্রোণ যে ফ্লর গ্রহণ করেননি সেটাও অতিশয় করে। কারণ তিনি ও অন্যান্য কৌরবেররা অবগত আছেন ব্যাপারটা বহুলাংশে কুরু-পাণ্ডবের ঘরোয়া ব্যাপার। যে শকুনি সর্বস্ব জয়লাভ করেছেন তিনিও তার হক্কের দাবি করে ফ্লর চাননি।
বস্তুত সভাপতিরূপে ডিটিংগুইশ প্রেসিডেন্ট মি. দুর্যোধনের আচরণ অক্ষরে অক্ষরে প্রোটকলসম্মত। তিনি কুরুকুলকে ক্ষুর দিয়েছেন কিন্তু কি ভীষ্ম কি বিদুর কাউকে কিছু বলার জন্য কোনও চাপ দিচ্ছেন না।
অবশেষে তুমুল বাগ-বিতণ্ডার পর প্রেসিডেন্ট দুর্যোধন যখন স্পষ্ট দেখতে পেলেন যে কুরুকুলের কেউই আপন সুচিন্তিত অভিমত দিচ্ছেন না, যাজ্ঞসেনী যে জিতা সে রায় দূরে থাক (কর্ণের রায়ের মূল্য নেই, এবং দুঃশাসন তখন প্রতিহারী বা বেলিফ বা সভার মারশাল; এবং তিনিও সুদ্ধমাত্র দ্রৌপদীকে অপমানার্থে দাসী দাসী বলে সম্বোধন করছেন, যুক্তিতর্ক দ্বারা শকুনির লিগেলরাইট প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি) তখন তিনি যে রুলিং দিলেন সেটাও অতিশয় ন্যায্য। তিনি জানতেন যে যদিও তিনি আইনত প্রেসিডেন্ট, তবুও এ তত্ত্ব অনস্বীকার্য যে কুরুবৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম কুরুকুলের সর্বোচ্চ আসন ধরেন। তিনি যখন স্পষ্ট বলেছেন, স্বয়ং ধর্মরাজ এর মীমাংসা করুন তখন এ সিদ্ধান্ত এক হিসেবে তাবৎ কুরুবংশের সিদ্ধান্ত। এবং যেহেতু দুর্যোধন সভারম্ভেই বলেছেন কুরুকুল উত্তর দেবেন তখন যুক্তিযুক্তভাবেই শেষ উত্তর দিলেন, কুরুকুলের সিদ্ধান্ত; ধর্মরাজ উত্তর দেবেন। কিন্তু ধর্মরাজ যখন ফ্লর গ্রহণ করলেন না, তখন তিনি দ্রৌপদীকে বললেন, (ধর্মরাজ যখন ফ্লর নিচ্ছেন না তখন প্রোটকলানুযায়ী তাঁর কনিষ্ঠেরা ফ্লর পাবেন– হুবহু যেরকম অপর পক্ষে বিকর্ণ পেয়েছিলেন) হে যাজ্ঞসেনী, ভিম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবের মতই আমার মত।
এবং এঁরাও ফ্লর গ্রহণ করলেন না। অর্থাৎ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন না।
এখানেই সভা শেষ।
সম্পাদক মহাশয়, যতই চিন্তা করি, পুনরায় মহাভারত অধ্যয়ন করি, পুনরায় চিন্তা করি, তখন দেখি, সেই অতি প্রাচীনকালে আমরা কতখানি ন্যায়ধর্ম ও প্রোটকল মেনে সভা চালাতুম! যদি দুঃশাসনের অনার্য চরণের কথা তোলেন তবে বলব সেটা অবশ্যই নিন্দনীয়, দুর্যোধন কর্তৃক দ্রৌপদীকে উরুমধ্য প্রদর্শন অনুচিত কিন্তু সেগুলো ইনট্রিগেল পার্ট অব দি প্রসিডিংস অব দ্য মিটিং নয়, সভার কর্মসূচির অন্তর্গত অবর্জনীয় অংশ নয়। দুঃশাসন ও দুর্যোধন শুধু অতিশয় রূঢ় পদ্ধতিতে দেখাতে চেয়েছিলেন, তাঁদের মতে দ্রৌপদী জিতা। সভার কার্যকলাপে প্রোটকল আদৌ লাঞ্ছিত হননি।
