সেকুরিটি কৌনসিলের কার্যকলাপ যখন আমি সরাসরি বেতারে শুনছি তখন ক্ষণে ক্ষণে মনে হচ্ছিল এইরকমই একটি ধুন্ধুমার যেন আমি সশরীর কোথাও দেখেছি। হ্যাঁ, হা– ওই ধুন্ধুমার কথাটাই সব মনে করিয়ে দিল। যে মধুকৈটভনিধন শ্রীবিষ্ণুকে আর্যদ্রাণ সায়ংপ্রাতঃ স্মরণ করেন সেই বিষ্ণু তথা অন্যান্য দেবাদিকে প্রচণ্ড নিপীড়ন আরম্ভ করে মধুকৈটভের পুত্র ধুন্ধুমার এবং অবশেষে নৃপতি কুবলাশ্ব কর্তৃক নিহত হয়। মহাভারতের • আপ্তবাক্যমধ্যে সেটি লিপিবদ্ধ আছে।
ধুন্ধুমার স্মরণ করিয়ে দিল সেই সভা, যেখানে দ্রৌপদী লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। আমি জাতিস্মর। আমি সে সভায় উপস্থিত ছিলুম তখনকার দিনের পি-টি-আই চিফ রিপোর্টার মূলগায়েন সঞ্জয়ের দোহাররূপে।
পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে দুইটি নিরপরাধ ব্যক্তি যেভাবে আত্মসমর্থন করেছেন তার তুলনা আজো ইহসংসারে অলভ্য। ঐতিহাসিক যুগে সোক্রাতেস, তার বহু পূর্বে দ্রৌপদী।
কিন্তু অবিস্মরণীয় তত্ত্ববাক্য : সোকরাতেস জাত দার্শনিক, পড় তার্কিক। তিনি যে আত্মপক্ষ সমর্থনকালে শাণিত শাণিত তর্কবাণে অ্যাথিন্স নগরীর নভোমণ্ডল দিবাভাগে তমসাচ্ছন্ন করে দেবেন তাতে আর বিচিত্র কী? সেকুরিটি কৌনসিল প্রসঙ্গে পূর্বেই নিবেদন করেছি, রুশ প্রতিনিধি ফেদেরেনকো ইজরাএলকে সফিস্ট আখ্যা দিতে চেয়েছিলেন। সোকরাতেস এইসব সফিস্টুদেরই নগরীর মুক্ত হট্টে বাক্যেতর্কে নিত্য নিত্য অম্লত পান করাতেন। তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন অত্যাশ্চর্য অবিস্মরণীয় হলেও সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য নয়।
কিন্তু একবস্ত্রা যাজ্ঞসেনী আত্মসমর্থন হেতু দুর্যোধনের সভামধ্যে যে যুক্তিজাল বিস্তার করে কতিপয় সূচ্যগ্র তীক্ষ্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন তার সম্মুখে তদানীন্তন ভারতের গুণীজ্ঞানী শূরবীর সমন্বিত সর্ববৃহৎ সভা নিরঙ্কুশ নিরুত্তর। অসূর্যম্পশ্যা কৃষ্ণা যে আইনকানুন প্রোটকল সম্বন্ধে কতখানি অনভিজ্ঞা ছিলেন তা তাঁর সভা মধ্যে রোদনের সময়ই ধরা পড়ছে : হায়, আমি স্বয়ংবরকালে রঙ্গমধ্যে ক্রমাগত ভূপালগণের নেত্রপথে একবার নিপাতিত হইয়াছিলাম, ইতোপূর্বে যাহারা আর আমাকে দেখেন নাই, এক্ষণে আমি তাহাদেরই সম্মুখে সভামধ্যে উপস্থিত হইয়াছি, যাহাকে পূর্বে গৃহমধ্যে বায়ু ও আদিত্য পর্যন্ত দেখিতে পান নাই… (আমরা বলি) তিনি যে সোরাতেসের মতো সেকালের কোনও প্রটো-আকাডেমির সদস্য ছিলেন না অথবা ডক্টরেট অব জুরিসপ্রুডেন্স পাস করেননি সে বাবদে আমরা স্থিরনিশ্চয়, দৃঢ়প্রত্যয়। তাই পাঞ্চালীর ডিফেন্স আমাদের কাছে ঘূতলবণতৈলতণ্ডুলবস্ত্রইন্ধনসমস্যাহীন কলিকাতা মহানগরীর মতো সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।
এ যেন সেকুরিটি কৌনসিলের ঠিক উল্টো পিঠ। হেথায় তাবৎ সভা কা কা রবে চিৎকার করছে কিন্তু ডিসটিংগুইশ ইজরাএল প্রতিনিধি নিপ, নীরব। অথচ তার জিভে ফোস্কা পড়েনি, তার টনসিলে বাত হয়নি। সভায় ৯৫ নয়াপয়সা মেম্বর কোনও প্রোটকল খুঁজে পাচ্ছেন না যেটা গজাঙ্কুশের মতো প্রয়োগ করে ইজরাএলের দাঁতকপাটি খুলতে পারেন।
আর হেথায় দ্রুপদতনয়া বারবার একটিমাত্র প্রশ্ন জিগ্যেস করছেন, ধর্মরাজ দূতক্রীড়ায় অগ্রে আমাকে কি নিজেকে বিসর্জন করেছেন? (ইজরাএলকেও মাত্র একটি প্রশ্ন জিগ্যেস করা হয়েছিল ইজরাএলি বাহিনী এখন কোথায়?) যুক্তিটি অতি সুস্পষ্ট। ধর্মরাজ যদি নিজেকে স্টেক করে আগেভাগেই খুইয়ে ফেলে দুর্যোধনের দাস হয়ে গিয়ে থাকেন তবে যেহেতু দাসের কোনও সম্পত্তিতে অধিকার থাকতে পারে না অতএব দাস যুধিষ্ঠির কৃষ্ণাকে স্টে করতে পারেন না (দাস হবার পূর্বেও তিনি মাত্র ২০% মালিক কিন্তু এ লপইনট বোধহয় তখন ওঠেনি।(১)
তা সে যা-ই হোক, ওই একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তরই তিনি পাচ্ছেন না। এবং হা অদৃষ্ট! কোনও প্রোটকলও খুঁজে পাচ্ছেন না যার চাপে তিনি সভাসদদের মুখ খোলাতে পারেন। বরঞ্চ ভীষ্ম যে প্রোটকল উত্থাপিত করলেন তার মোদ্দা : ডিসটিংগুইশট দ্রুপদতনয়া তাদের প্রশ্ন শুধিয়েছেন (ইংরেজিতে এস্থলে বলে বার্কিং আপ দি রং ট্রি)। তার উচিত তার স্বামী ধর্মরাজকে এ প্রশ্ন জিগ্যেস করা। তিনিই বলতে পারেন, কৃষ্ণা জিতা বা অজিতা!
কিন্তু বিদুর যে জিনিসের আশ্রয় নিলেন, সেটাকে প্রিসিডেনস, নজির বা হদিস বলা যেতে পারে, ঠিক প্রোটকল নয়। তাঁর মতে মহর্ষি কশ্যপ দৈত্যকুলের প্রহ্লাদকে অনুশাসন দেন হে প্রহ্লাদ, যে ব্যক্তি জানিয়া শুনিয়াও প্রশ্নের প্রত্যুত্তর না দেয় এবং যে সাক্ষী মিথ্যা সাক্ষ্য দান করে তাহারা সহস্ৰ সংখ্যক বারুণ-পাশ দ্বারা বন্ধন পায়।(২) অর্থাৎ silence সর্বাবস্থায় golden নয় (অবশ্য এস্থলে gold is silent, কারণ সভাসদদের আর সকলেই দুর্যোধনের gold 60161 silent!)
কিন্তু এ নজির ধোপে টিকল না। মহাভারতকার বলছেন, বিদুরের বাক্য কর্ণগোচর করিয়া সভাস্থ পার্থিবরা কিছুই প্রত্যুত্তর করিলেন না!!!
কিন্তু এ সব চুলচেরা বাগ্বিতণ্ডার মূলে কে?
দ্রৌপদী যে প্রশ্ন শুধিয়েছিলেন সেটা তো কেউ সেকেন্ড করবে। নইলে সেটা উলট্রা ভিরেস, নাকচ।
নিতান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে তাকে সেকেন্ড করে বসল দুর্যোধনের ছোট ভাই চ্যাংড়া অর্বাচীন বিকর্ণ! তিনি স্পষ্ট গলায় বললেন, যাজ্ঞসেনী যাহা কহিয়াছেন কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর, ইহারা আসিয়া এ বিষয়ে কিছু বলুন। তার পর তিনি যখন দেখলেন সভাসদবর্গের কোনও ব্যক্তিই সাধু অসাধু কিছুই কহিলেন না তখন হস্তে হস্ত নিষ্পেষণ করিয়া নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে করিতে কহিতে লাগিলেন, অর্থাৎ অনেক যুক্তিতর্ক দেখিয়ে রায় দিলেন, এই সকল বিচার করিয়া দেখিলে দ্রৌপদীকে জয়লব্ধ বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না।
