প্রোটকল শব্দটির বেলাও তাই হয়েছে। একদা গ্রিক ভাষাতে বোঝাত– যেমন ধরুন, আপনার একখানা টাইম-টেবিল আছে। হঠাৎ ইশটিশানে পেয়ে গেলেন, হ্যান্ড-বিল-পারা একখানা নোটিশ। তাতে ট্রেনের সময় পরিবর্তনের নবীন ফিরিস্তি রয়েছে। আপনি সেটি আপনার টাইম-টেবিলের যথাস্থলে গঁদ দিয়ে সেঁটে দিলেন। তখন এ কাগজের টুকরোটি পেয়ে গেলেন পৈতে। হয়ে গেলেন প্রোটকল। গেরেমভারি নাম। এ পাড়ার মেধো হয়ে গেলেন ভিন্পাড়ার মধুসূদন।
সরকারি না-হক ট্যাকশো যেরকম বাড়তে বাড়তে পর্বতপ্রমাণ হয়ে যায় এ শব্দটিও আড়াই হাজার বছর ধরে বাড়তে বাড়তে তার তনুটিকে অদ্যকার বন্ধু করে তুলেছে। বেশ এক যুগ পূর্বে এটিকেটের মহানগরী প্যারিসে পররাষ্ট্র বিভাগ বা ফরেন আপিসে একটি ভিন্ন বিভাগ খোলা হয়েছে; তার নাম প্রোটকল বিভাগ। একটা পুরো পাক্কা আস্ত ডিপারটমেন্ট।
রাজ্যচালনার কোন গুরুভার এঁদের স্কন্ধে সমর্পিত হয়েছে?
বহুবিধ। এমনকি আমার মতো লোক না পারলেও আপনি এদের সাহায্য তলব করতে রেন। অবশ্য কলকাতাতে এরকম পুরো-পাক্কা-প্রোটকল বিভাগ আছে কি না, আমি সঠিক নিনে। ধরুন আছে। আরও ধরুন, আপনি, সম্পাদক মশাই, কোনও পারটিতে নর্থ পোলের কনসাল জেনারেলের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। কথায় কথায় বেরিয়ে গেল তিনি ভারতীয় ফলমে বড়ই ইনটেরসটেড। পরিচয় নিবিড়তর হল। ইতোমধ্যে তিনি আপনাকে একটি খাসা উনারও খাইয়ে দিয়েছেন। সেটি রিটার্ন করতে হয়। কনসাল বিপত্নীক। একটি অবিবাহিত মেয়ের বয়স একুশ অর্থাৎ সোসাইটি করার বয়স হয়েছে। অন্য মেয়েটি পল্টনের কেপটেনকে বিয়ে করেছেন। তিনি একা এসেছেন কলকাতায়, বাপের কর্মস্থলে। ওদিকে আপনি সাউথ পোলের কনসুলেট জেনারেল শার্জে দাফেরকেও ওই দিনই নিমন্ত্রণ করেছেন। তাঁর ভামিনী ও এক কন্যাও সঙ্গে আসছেন। কন্যাটির স্বামী ছিলেন। তিনি স্বামীর কাছ থেকে সেপারেশন নিয়ে পিতার সঙ্গে বাস করেন।… ডিনারে আরও ইনি উনি তিনি আসবেন।
এবারে আমরা আসছি ইংরেজিতে যাকে বলে– থিক্ অব্ দ্য বেটুল-এর। অর্থাৎ মূল সমস্যায়। আপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন প্রিসিডেনস বস্তুটি সাংঘাতিক। আপনার ড্রয়িংরুমে ককটেলাদি পান করার শেষের দিকে যখন বাটলার এসে আপনার স্ত্রীর সামনে বাও করবে তখন তিনি মুচকি হাসবেন প্রধান অতিথির দিকে। সেই মসিয়ো ল্য কনস্যুল জেনারেল যেন পবনে ভর করে আপনার স্ত্রীকে এসে দান করবেন তার দক্ষিণ বাহু। তারই উপর নির্ভর করে দু-জনাতে এগোবেন খানা-কামরার দিকে। এর পর যাবেন আপনি। কিন্তু দক্ষিণ বাহু দান করবেন কাকে? সাউথ পোলের শার্জে দাফেরের স্ত্রীকে, না নর্থ পোলের অবিবাহিতা কন্যাকে, না কেপটেনের স্ত্রীকে, না কর্নেলের তালাকপ্রাপ্ত মহিলাকে?…এবং তার পর আসবেন কোন জোড়া, তার পর, ইত্যাদি।
তাই আপনি সুবুদ্ধিমানের মতো পূর্বাহেই ফোন করেছেন, শ্যা দ্য প্রোটকলকে– অর্থাৎ প্রোটকলের বড় কর্তাকে। অতি অমায়িক লোক। তদুপরি আপনি সম্মানিত কাগজের তারই মতো শ্যা, বড় কর্তা। কে কতখানি সম্মান পাবেন, তাদের দফতর ফিষ্টি দিলে আপনার প্রিসিডেনস কী– অর্থাৎ কার আগে কার পরে আপনি খানা-কামরায় ঢুকবেন তার প্রোটকলে আপনার নাম উঁচুর দিকে। অতএব একগাল হেসে বললেন,–সে কী মসিয়ো– (ভুললে চলবে না, আন্তর্জাতিক প্রোটকলের ভাষা এখনও ফরাসিস্!) আপনি অতখানি আঁবায়াসে (এমবারাট) হচ্ছেন কেন? এ যে একেবারে ডিমের খোসায় কালবোশেখী। আপনি তো আর অফিশিয়াট ডিপ্লোমেটিক ডিনার দিচ্ছেন না। কী বললেন? না, না, না পারলো, আমি আপনার ব্যান-কুয়েটটাকে মোটেই হেনস্তা করছিনে। তবু বলছি, ওটা তো।
ওই আনন্দেই থাকুন, সম্পাদক মশাই, ওঁকে বিশ্বাস করেছেন কী মরেছেন।
যতই ঘরোয়া বাড়ির ব্যাপার ফেমিলি ওয়ে বলে নেমন্তন্ন করুন না কেন, এবারে খাঁটি দিশি তুলনা দিচ্ছি সেখানে যদি মাছের মুড়োটা আপনার দিদির শ্বশুরকে না দিয়ে দেওয়া হয় আপনার ভাগ্নের শ্যালাকে, তদুপরি উনি কুলীনস্য কুলীন, আর কালো ছোকরা মৌলিকস্য মৌলিক, তা হলে ব্যাপারটা কীরকম দাঁড়াবে? আমি বলছি না, শ্বশুরমশাই বাড়ি ফিরে অ্যাট হিজ আরলিস্ট কনভিনিয়ে আপনার দিদির পিঠে ছি, ছি, তিনি আবার বৌমা–দু ঘা না না, তা বলছিনে।
প্রোটকলের শ্যাফ সবিশেষ অবগত আছেন যে আপনি তার স্তোকবাক্য সিরিয়স নেননি। তিনিই বলবেন।
সে তো হল। কিন্তু ওই যে বললেন সাউথ পোলের ডিভোর্স কন্যা–স্বামী ছিলে কর্নেল–তিনি এখন কী নামে পরিচয় দেন? ঠিক ডিভোর্স তো হয়নি–হয়েছে সেপারেশন।
সেটা কি ইমপরটেন্ট?
ভেরি, ভেরি। মহিলাটি যদি স্বামীর নাম ত্যাগ করে পুনরায় তার মেডেন (কুমারী) নাম, অর্থাৎ তার পিতার নাম গ্রহণ করে থাকেন তবে তিনি পাবেন সেই পরিবারের র্যাঙ্ক, নইলে পাবেন কর্নেলের বিবাহিতা স্ত্রীর র্যাঙ্ক। তার পর দেখতে হবে
ততক্ষণে আপনার মাথাটি তাজ্জিম মাজ্জিম করছে। ভাবছেন, এবারে আর ডিমের খোসাতে টর্নাডো নয়, আপনার কানের টিপেনামে চলেছে মহাবেগে যুগ রুশমার্কিন নির্মিত স্পুটনিক।
আম্মো ভাবছি আজ যদি ডাচেস অব উইনজর তৃতীয় বারের মতো যদি, মানে, ইয়ে হয়ে যান তবে তার নাম কী হবে? শুনেছি, হালে নাকি তিনি লন্ডনে জলচল হয়ে গেছেন। ডুককে বিয়ের পূর্বে মিসেস সিমসন অবস্থাতে তিনি রাজবাড়িতে দাওয়াত খেয়েছেন যদ্যপি রাজমাতা মেরি সে দাওয়াত বর্জন করেন। তাঁর সে বামনাই নাকি প্রোটকল-নিন্দিত অপকর্ম হয়েছিল। ঈশ্বরেচ্ছায় তিনি দেহরক্ষা করেছেন। এখন প্রশ্ন, ডাচেস যদি আরেকটা ডিভোর্স নেন তবে তিনি লন্ডনে সাধনোচিত ধাম পাবেন কি না, অর্থাৎ বকিংহম ধামে নিমন্ত্রিত হবেন কি না?
