পূর্বেই নিবেদন করেছি মোটামুটি ১৯২৭, পাকাভাবে বলতে গেলে তার দু-তিন বছর আগে থেকেই হিটলার মুনিকাঞ্চলে এমনই প্রখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি যেখানে যেতেন সেখানেই তাঁর চতুর্দিকে ভিড় জমে যেত! দিনের পর দিন বিশাল জনতার সামনে তিনি ওজস্বিনী বক্তৃতা দ্বারা দেশের দুঃখ-দৈন্যের নিদারুণ বর্ণনা দিচ্ছেন, বিশেষ করে শিশু-পুত্রকন্যার জন্য আহার-বসন সংগ্রহার্থে মা-জননীদের কঠোর সংগ্রাম (মেয়েরা দু হাত দিয়ে মুখ চেপে কাঁদলেও তার সম্মিলিত ধ্বনি হিটলারকে কখনও কখনও পুরো দু-তিন মিনিট বক্তৃতা বন্ধ করতে বাধ্য করত), এবং সমসাময়িক রাষ্ট্রনায়কের ক্লৈব্য তথা পাপাচার (করাপশন) নিয়ে তাঁর সুতীক্ষ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং সর্বোপরি তার আত্মবিশ্বাস, তাঁর আশাবাদ যে তিনিই মেসায়া (কল্কি, যিনি পুনরায় পৃথিবীতে ধর্মস্থাপনা করবেন) তিনিই ভের্সাঈ ডিকটাট (ডিকটা = ডিটেশন থেকে, অর্থাৎ ক্রীতদাসদের প্রতি যে কোনও অন্যায় পশুবলপ্রযুক্ত অলঙ্ঘ্য আদেশ, যে আদেশ পালন না করলে আদিষ্ট ব্যক্তিকে সবংশে নির্বংশ করা হবে এবং জর্মন রাষ্ট্রকে সমূলে উৎপাটিত করা হবে) ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে জর্মনিকে পুনরায় সার্বভৌম এবং ধীরে ধীরে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নেশানরূপে পরিণত করবেন।(২)
ব্যক্তিগত জীবনেও হিটলার আর কাউকে আমল দিতেন না। প্রায় প্রতিদিনই তিনি তার প্রিয় তিনটে ক্যাফের একটাতে কয়েকজন বন্ধুসহ বসতেন। কিন্তু আমরা যাকে বলি আড়া মারা, কিংবা গালগল্প করা– সে কর্মে ভিয়েনা বাঙালির চেয়েও এক কাঠি সরেস এবং যে ভিয়েনায় হিটলার প্রথম যৌবন কাটান– সেটি হত না। হিটলার ভিয়েনাতে অনেক কিছু শিখেছিলেন, শুধু এই সমাজনন্দন আচরণটি রপ্ত করতে পারেননি। সর্বক্ষণ তিনিই কথা বলতেন, একমাত্র তিনিই।
এসব মণ্ডলীতে মহিলাদের নিরঙ্কুশ প্রবেশ-নিষেধ না হলেও তাদের মাত্র দু-একজন আহ্বান পেতেন অতিশয় কালেভদ্রে। হিটলার ভিয়েনার কায়দায় তাঁদের হস্তচুম্বন করতেন (যদিও জর্মনিতে তখন সেটা বিলকুল আউট অব ডেট), তাঁদের সুখ-সুবিধার প্রতি কড়া নজর রাখতেন, সামান্য হা, হুঁ কিংবা অতি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করতে দিতেন, কিন্তু একটা দিকে তিনি কঠোর কঠিন দৃষ্টি রাখতেন, কোনও রমণী যেন ভ্যাচর ভ্যাচর করতে আরম্ভ না করে– তা তিনি যত বুদ্ধিমতীই হোন, মাদাম পম্পাডুর, ইজাবেলা ডানকান, মাদাম দ্য স্তাল যেই হোন না কেন।
———-
১. এমনকি পরবর্তীকালে এফা ব্রাউনও না।
এস্থলে আরেকটি বিষয়ের উল্লেখ করি। ১৯৪১-এর গ্রীষ্মকালে হিটলারের সেনাদল যখন বীরবিক্রমে জয়ের পর জয় লাভ করে মস্কো পানে এগিয়ে চলেছে তখন তিনি প্রতিদিন লাঞ্চ-ডিনারের পর ঘন্টার পর ঘণ্টা গল্প করতেন। ১৯৪২-৪৩-এর শীতে স্তালিনগ্রাদের পরাজয়ের পর জেনারেলদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি শুধু তার মহিলা সেক্রেটারি-স্টেনোদের সঙ্গে খেতেন। (এফার হেডকোয়ার্টার্সে আসার অনুমতি ছিল না। হিটলার সময় পেলে বেৰ্ষটেশগাডেনের বাড়ি বের্গহপে তাঁর সঙ্গে মিলিত হতেন) কিন্তু ওই ১৯৪১-৪২ এক বা দেড় বছর তিনি যে-সব গালগল্প করেছেন সেটি লিখে রাখা হয়েছিল স্টেনোদের দ্বারা। প্রকাশিত হয়েছে হিটলারস্ টেবল-টক শিরোনামায়। প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার কেতাব। এ পুস্তকের বহু স্থলে পাওয়া যায় রমণীজাতি সম্বন্ধে তার অভিমত। কিন্তু ভিয়েনা বাসকালীন কিংবা ১৯২৫-২৬ পর্যন্ত তিনি যে কোনও রমণীকে কাছের থেকে চিনতে পেরেছেন, এর কোনও ইঙ্গিত নেই। অবশ্য এ-দ্বারা কোনও কিছু নিঃসন্দেহে প্রমাণ করা যায় না।
২. হিটলারের বক্তৃতা দেবার ভঙ্গি ও বিষয়বস্তু নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লেখা যায়– লেখক তার বহু বক্তৃতা শুনেছে। এ বাবদে একটি অত্যুত্তম– সর্বোৎকৃষ্ট বললেও অত্যুক্তি হয় না— পরিচ্ছেদ লিখেছেন জর্নালিস্ট মার্কিন মাউরার তাঁর জর্মনি পুটস দি ক্লক ব্যাক পুস্তিকায়।
প্রেম
কী কায়দায় আলাপ হয়েছিল সেটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়।
ছোকরা আইন পড়ে।
একদিন বলল চ, একটা ইনট্রেসটিং মোকদ্দমা হচ্ছে। এদেশের নিয়ম, আইন পরীক্ষা দেবার পূর্বে ছ বার না দশবার আমার সঠিক মনে নেই– আদালতে হাজিরা দিতে হয়, বোধহয় সরকারি উকিলের অ্যাসিসট্যান্টরূপে দু-চারবার কাগজপত্রও দুরস্ত করে দিতে হয়।
সুইস আদালত আদৌ ভীতি উৎপাদক নয়। কেমন যেন ঘরোয়া ঘরোয়া ভাব।
অথচ মোকদ্দমাটা বেশ গুরুতর বিষয় নিয়ে।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে একটি যুবতী। সুন্দরী বলা চলে না, সাদামাটা, তবে দেখতে ভালোই। এবং তার চেয়ে বড় কথা, মেয়েটি বেশ স্বাস্থ্যবতী। মুখের রঙটি যেন শিশিরে ভেজা। জানা গেল, মেয়েটি সুইস ইতালিয়ান।
দোস্ত ফিসফিস করে বলল, জানিস তো, জাতে সুইস হলেও এই ইতালিয়ানরা একটু আস্টেডি অর্থাৎ উড়ুক্কু ভাব ধরে।
প্রেমট্রেমের ব্যাপার আদালত সংক্ষেপেই সারে। তবে এস্থলে বিবরণীটি নিশ্চয়ই কোনও রোমান্টিক ছোকরা পুলিশ লিখেছিল। প্রেমটা হয়েছিল গভীরই। প্রতি ছুটির দিনে উইক-এন্ড, এমনকি কাজকর্মের ফাঁকেফিকিরে সিনেমা-কাবারে-সুইমিং পুল। বেশ স্ফূর্তিতে কেটেছে দিনগুলো– কোনও সন্দেহ নেই। এবং কোনও সন্দেহ নেই মেয়েটাই মজেছিল মরমে মরমে।
