কিন্তু এস্থলে তার স্থাপত্য শিক্ষালয়ে প্রবেশ করতে অক্ষম হওয়া, তাঁর নিদারুণ দৈন্য, পাবলিক লাইব্রেরি থেকে অবিচারে নানা জাতের বই এনে সেগুলো গোগ্রাসে ভক্ষণ–এর কোনওটাই আমাদের বিষয়বস্তু নয়। আমরা জানতে চাই, ওয়াইন-উইমিন-সং মদ্য-মৈথুন-সঙ্গীত– এই তিন বস্তুতে যে রাজসিক প্রিয়দর্শন ভিয়েনা নগর প্যারিসের সঙ্গে পাল্লা দিত, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তো বহু পূর্বে সে প্যারিসকে ছাড়িয়ে গিয়েই ছিল, সেই ভিয়েনাতে নারী সম্প্রদায়ের সঙ্গে হিটলারের কোনও সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল কি না।
গুস্তাফ দৃঢ়কণ্ঠে বলছেন, যতদিন হিটলার তার সঙ্গে বাস করেছেন ততদিন ওদিকে তার কণামাত্র উৎসাহও তিনি কখনও দেখেননি। বস্তুত দীনবেশে সজ্জিত হলেও কঠোর কৃসাধনরত সন্ন্যাসীর চোখেমুখে যে দীপ্তি পথিকজনেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ভিয়েনার দ্র, দেমি মদেন, গণিকাদের চোখেও সেটা ধরা পড়ত হিটলারকে দেখে। এবং তরুণ হিটলারের দিকে কটাক্ষনয়নে তাকিয়ে বিশেষ ইঙ্গিতও দিত। সাদামাটা, কিঞ্চিৎ ঈর্ষান্বিত গুস্তাফ সেদিকে হিটলারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, তিনি তার বাহু ধরে অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলতেন, চল, চল, গুল, বাড়ি চল।
পূর্বেই বলেছি তার পর তিনি উধাও হলেন।
সেই ১৯০৮ থেকে ১৯১৯-২০ পর্যন্ত যে যা-কিছু লেখেন তার পনেরো আনা কাল্পনিক। অবশ্য ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হিটলার যখন জওয়ানরূপে যুদ্ধক্ষেত্রে, তার সম্বন্ধে সে সময়কার খবর সরকারি কাগজপত্রে রয়েছে, কিন্তু সেগুলো আমাদের কাছে অবান্তর।
বস্তুত এ-কথা প্রায় নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, ১৯০৮ থেকে ১৯২৫-২৬ পর্যন্ত কোনও রমণী তার ওপর কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।(১) পরিচয় হয়েছিল তাঁর বহু রমণীর সঙ্গে– একে ভিয়েনায় তার যৌবনের বেশ কিছুকাল কেটেছে, যে-ভিয়েনার রমণী জাতিকে খাতির করতে তার সঙ্গে প্রেমে পড়ার জন্য সর্বক্ষণ সচেতন, কিংবা অচৈতন্যি দুটোই বলতে পারেন, এক কথায় ভিয়েনা গ্যালান্ট নগর– তদুপরি ১৯২২ থেকে ১৯২৭ পর্যন্ত তিনি মুনিকের রাজনৈতিক আকাশে অন্যতম জ্যোতিষ্মন গ্রহ, কম্যুনিস্টদের মোকাবেলা করতে পারেন একমাত্র তিনি, রাস্তাঘাটে নাৎসি আর কমুনিস্ট দলে আবার প্রতিদিন মারামারি হয় এবং উভয় পক্ষে কয়েকটা গুপ্ত এবং প্রকাশ্যে খুনও হয়ে গিয়েছে– এ সবার নেতা তো বীর্যবান না হয়ে যায় না। তদুপরি মহিলাদের প্রতি কী প্রকারের ব্যবহার করতে হয়, তাদের প্রতি ব্যবহার্য সর্ব আদব-কায়দা-এটিকেট-গ্যালানট্রি তিনি জানেন– ভিয়েনাতে অবশ্যই তার বেশিরভাগ তিনি দেখে শিখেছিলেন, কিন্তু হিটলারের মতো অসাধারণ জিনিয়াসের পক্ষে সেইটে যথেষ্টর চেয়েও ঢের বেশি। এবং সর্বশেষ কথা, তাঁর যে একটা ম্যাগনেটিক চার্ম চৌষিক আকর্ষণ শক্তি ছিল সেটা তো জর্মন ভাষায় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ বহু বিদেশি রমণীও বলেছেন।
আমি পূর্বেই নিবেদন করেছি, হিটলার-জীবনে প্রেম হাফ প্লাস ওয়ান প্লাস হাফ।
স্তেফানির প্রতি তার প্রেম প্রথম হাফটা, শেষ হাফটা এফা ব্রাউন, যাকে তিনি শেষ মুহূর্তে বিয়ে করেন এবং সেই সূত্রে পৃথিবীর বহু লোক এ প্রেমের খবর পায়। কিন্তু আমরা এস্থলে যে দৃষ্টিবিন্দু– অর্থাৎ প্রেমের পরিপ্রেক্ষিতে হিটলারকে দেখছি, সেভাবে কেউ দেখেননি, লেখেননি। হয়তো সেই হাফটি এস্থলে আগে বর্ণনা করে মাঝখানে ফুল ওয়ানটিতে গেলে ভালো হত, পাঠক পুরো পার্সপেকটিভ পেতেন, কিন্তু শেষটায় অনেক চিন্তা করে দেখলুম বিশেষ কারণ না থাকলে এ ধারার কালানুক্রমিক অগ্রসর হওয়াই প্রশস্ত (সিনেমার ফ্লাশব্যাক কিংবা ফ্লাশ ফরওয়ার্ড টেকনিক অবশ্য আজকাল বড়ই জনপ্রিয়)। দ্বিতীয়, এফার সঙ্গে হিটলারের সর্বশেষ প্রেম ১৯৩৯-৪৫-এর যুদ্ধাদি দ্বারা এতই বিক্ষুব্ধ যে বহু অবান্তর নর-নারীকে সেখানে টেনে এনে প্রবন্ধের কলেবর বাড়াতে হয়। তৃতীয়ত, অনেকেই সে প্রেম সম্বন্ধে অল্পবিস্তর পড়েছেন বলে স্বল্প পরিসর প্রবন্ধে মূল ঘটনাগুলো শুধু আবার তারা শুনতে পাবেন মাত্র– অর্থাৎ, সে-প্রেম বর্ণাতে হলে পূর্ণ পুস্তকের প্রয়োজন।
এস্থলে নিবেদন করা কর্তব্য মনে করি, রমণীর প্রতি পুরুষের একনিষ্ঠ প্রেম এদেশের এবং ওদেশের বহু কাব্যকাহিনীতে আছে কিন্তু বাস্তবে যদ্যপি যে কোনও কারণেই হোক, (কুলীন প্রথার কথা তথা শ্রীকৃষ্ণ বা দশরথের কথা এস্থলে স্মরণে আনছিনে) আমরা আজ এদেশে একদারনিষ্ঠতাকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখি, ইয়োরোপে বহুকাল যাবৎ একই রমণীকে আজীবন পুজো করার বিশেষ মূল্য দেয়নি। অতএব পাঠক যেন স্তেফানির কথা স্মরণে এনে হিটলারের সর্মহৎ, সর্বগ্রাহী প্রেমকে তার যথোপযুক্ত সম্মান দিতে কুণ্ঠিত না হয়।
ঠিক কোন সালে যে প্রেমের সূত্রপাত হয় সে কথা তার অন্তরঙ্গতম ব্যক্তিও জানেন না– যদিও আমার সুদৃঢ় অচল বিশ্বাস, বয়সে পরিণত হওয়ার পর তিনি কারুর সঙ্গেই অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব স্থাপন করে নি, ফোটোগ্রাফার হফম্যান ছিলেন তাঁর একমাত্র নিত্যালাপী বিদৃষক– তবে নিশ্চয়ই ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের কিছু পূর্বে।
ইতোমধ্যে হিটলারের একটি বিশিষ্ট স্বভাবের উল্লেখ না করলে সে বলার যথার্থ তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করা অসম্ভব।
