***
ইতিহাস-দার্শনিক শ্রীযুক্ত টইনবি বলেছেন, দেশকালপাত্রের যোগাযোগের ফলে নিত্য নিত্য প্যাটার তৈরি হচ্ছে বটে, কিন্তু সেগুলো আকছারই প্রাচীন প্যাটারনের পুনরাবৃত্তি মাত্র। তফাত ডিটেলে।
অতএব, যখন সবিশেষ অবগত আছি, উভয় বাঙলার দেশকালপাত্রে ফারাক যৎসামান্য তবে পূর্বোল্লিখিত পূর্ববঙ্গীয় প্যাটারনের পুনরাবৃত্তি পশ্চিমবঙ্গে প্রতিভাসিত হবে না কেন? আমরা কিসে কম?
অবশ্য স্বীকার করছি ডিটেলে উনিশ-বিশ হওয়া বিচিত্র নয়।
এবং তাই হয়েছে।
কারণে, কিংবা অকারণে, অথবা বলতে পারেন, কিসমতের মারে এদেশে পাশপর যোগাড় করাটা ক্রমশ কঠিন হতে কঠিনতর হতে লাগল, স্বরাজ পাওয়ার অল্প কিছুকালের মধ্যেই। শেষটায় হাল এমন অবস্থা দাঁড়াল যে তখন কেউ আর নিতান্ত বিপদে না পড়লে ওই সাপের পায়ের সন্ধানে বেরুত না। অবশ্য লক্ষপতি, কালোবাজারি, বিদেশে যার আচার-করা ফরেন কারসি আছে তাদের কথা আলাদা। এসব কাহিনী দফে দফে বয়ান করার প্রয়োজন নেই। খবরের কাগজে অনেক খবর বেরোয় সাদা কালিতে ছাপা। সেগুলো পড়ার জন্য একটি তৃতীয় নয়নের প্রয়োজন–ইংরেজিতে যাকে বলে টু রিড বিটুইন দ্য লাইনজ। যাদের সেটা আছে। আমার নেই তারা আপনাকে-আমাকে অনায়াসে দু কলমফ শেখাতে পারেন। সেকথা থাক।
ইতোমধ্যে একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেল।
লোকটার নিশ্চয়ই কোমরের জোর, কড়ির ওজন ও বুকের পাটা আছে, নইলে সরকারের সঙ্গে লড়তে যাবে কেন? কটা আদালতে হারার পর লোকটি সুপরিম কোরটে পৌঁছল জানিনে। সেখানে প্রধান বিচারপতি (তৎকালীন) শ্ৰীযুক্ত সুববা রাও যা রায় দিলেন তার বিগলিতাৰ্থ, কোনও ভারতীয় যদি আপন দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতে চায় তবে তাকে ঠেকাবার এখৃতেয়ার ভারত সরকারের নেই। সেটা হবে সংবিধান-বিরুদ্ধ।
ব্যস্। আর যাবে কোথায়।
আমাগো দ্যাশে কয়, একেতো ছিল নাচিয়ে বুড়ি তার উপর পেল মৃদঙ্গের তাল।
পুব বাঙলার প্যাটারনে এস্থলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে গাছের মগডালে না চড়ে মেয়েমদ্দে আণ্ডাবাচ্চায় ধাওয়া করল পাসপরট ফরমের জন্য। বাঁদরের জন্য ও-বস্তুর প্রয়োজন নেই তাকে খাঁচায় পুরে প্লেনে ঢুকিয়ে দিলেই হল। মানুষের বেলা জাহাজের কাপতান, প্লেনের টিকিট বেচনেওয়ালা, ভূপৃষ্ঠে বর্ডারের উভয়পক্ষের পুলিশ শুধোত, অভিজ্ঞান-পত্রটি কোথায়?
ইতোমধ্যে নাকি আরও দুজন জজ সাহেবের রায় বেরুল : আইনত নাকি পাসপরটের কোনও প্রয়োজনই নেই। এটা আমি বুঝতে পারিনি, কাজেই এটি নিয়ে তড়িঘড়ি আলোচনা করা আমার শোভা পায় না।(১) পয়লা তো ঝামেলাটা বুঝে নিই।
উপস্থিত একটি কথা বলে রাখি।
আইন অবশ্যই সর্বজনমান্য। কিন্তু কার্যত কী হয়?
আইনত (ডেজুরে) পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই তার নাগরিককে অবাধ চলাফেরা করার ক্ষমতা দেয়, কিন্তু কার্যত (ডে ফাঁকটো) কোনও দেশ দেয় বলে জানি নে।
এই তো হালের কথা। মার্কিন দেশে যে জোর গণতন্ত্রের রাজত্ব সেকথা আমরা সবাই জানি। অন্তত সেই নিয়ে তাদের বড়-ফাটাইয়ের অন্ত নেই। দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম সর্বত্রই তাঁরা যে গণতন্ত্র তথা ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিচ্ছেন একথা তারা বিশ্ববাসীকে অহরহ শোনাচ্ছেন। সত্যি হতে পারে, মিথ্যা হতে পারে, কিংবা হয়তো মারকিনগণ নিজেদের এটা বোঝাবার চেষ্টা করছেন। এবারে সেই হালের কথাতেই আসি।
দার্শনিক বারট্রানড রাসল কিছুদিন হল স্থির করলেন, একটা বেসরকারি আদালত বসিয়ে সেখানে ভিয়েতনামে মারকিন পাপাচারের বিচার করা হবে। ভোলা আদালতে যেরকম যে কোনও মানুষ, হয় আসামি নয় ফরিয়াদি পক্ষে দাঁড়াতে পারে বা আদালতের দোস্ত (আমিকুস কুরিএ) হিসেবে নিরপেক্ষভাবে কথা বলার হক ধরে রাসেলের বেসরকারি বেআইনি (বা অ-আইনিও বলতে পারেন) আদালতেও সেই ব্যবস্থা থাকবে।
এ আদালতে হাওয়া কোন দিকে বইবে সেটা ঠাহর করার জন্য হ্যামলেট নাটকের ভূতের প্রয়োজন হয়নি। তৎসত্ত্বেও মার্কিন জুজুর ভয়ে সব রাষ্ট্রই মুখে কথা চাপলেন। অর্থাৎ সে আদালতের জন্য আসন দিতে (ভেনু) রাজি হন না– তোমার আসন পাতবো কোথায় হে অতিথি–অবশ্য ভিন্নার্থে।
শেষটায় সরল সুইডেন লাজুক কনেটির মতো কবুল পড়ল এবং আখেরে পস্তাল, কিন্তু সেকথা থাক।
সেই উয়োর ক্রাইমস ট্রিবুনালে সাক্ষ্য দিলেন ৭ মে তারিখে এক ভদ্রলোক– এঁর নাম রালফু শ্যোমান। মারকিন নাগরিক, এবং রাসলের খাস নায়েব (পারসনাল সেকরেটারি)। ভিয়েতনামে মারকিনদের পাশবিক অত্যাচারের দফে দফে বয়ান দিয়ে যার সঙ্গে এ রচনার কোনও সম্পর্ক নেই– তিনি বলেন, তিনি স্বয়ং হানয় গিয়েছিলেন এবং অনুমান করেন, যেহেতু তিনি ওই জায়গায় মারকিন সরকারের বিনানুমতিতে গিয়েছিলেন তাই সে সরকার এক্ষণে তার পাসপরট রদ করবে (অর্থাৎ বাতিল বা বাজেয়াপ্ত করে নেবে)।
যদি করে তবে সেটা আইনসঙ্গত কি না, সেটা বিচার করার মতো আইনজ্ঞান আমার কেন, বহু ধুরন্ধরেরও নেই।
(১) এই দেখুন না, কেন্দ্রীয় সরকার পাসপট বাবদে যে আইন এতদিন মেনে চলতেন তারও একটা রেজো দেতত্র (raison detre) নিদেন একটা ভিত ছিল (২) তিনজন মহামান্য জজ সেটা অস্বীকার করলেন (৩) অন্য দুজন মহামান্য জজ ওই তিনজনের সঙ্গে একমত হলেন না। ওদিকে পাসপ দরখাস্তের বন্যায় হিল্পি দিল্লি যায়-যায়। সেটা ঠেকাবার জন্য সরকারকে বাধ্য হয়ে জারি করতে হয়েছে, (৪) অরডনস্ সাময়িক আইন। এ আইনের আয়ুষ্কাল মেরেকেটে ছ মাস। ইতোমধ্যে সরকার এই অরডানটি মেজে-ঘসে (৫) বিলরূপে পরিবর্তন করে পেশ করবেন পারলিমেনটের সন্মুখে।
