আমি ভালো করেই জানি, এ প্রবন্ধ ইংরেজিতে লিখলে ধুন্ধুমার লেগে যেত। কারণ, তা হলে হয়তো বিদেশি পুস্তকবিক্রেতাদের চাই, বোম্বাইবাসী শ্রীল শ্রীযুক্ত সদানন্দ বিটকল এটি পড়তেন (শুনেছি, বোম্বাইওয়ালারা নাকি এ বাবদে কলকাতাকে কল্কে দেয় না বড় আনন্দ হল)। যারা বাঙলা জানেন, তাঁরা যদি হুহুঙ্কার সচিৎকার যুদ্ধং দেহি রব ছেড়ে আসরে নামেন তবে আমি প্রস্তুত।
শুধু দয়া করে পরের হাত দিয়ে তামাক খাবেন না।(৫)
সুপণ্ডিত বিপ্রসন্তানকে ডোবাবেন না। অবশ্য তার যদি ব্যবসাতে শেয়ার থাকে তো আলাদা কথা। আমার বিশ্বাস তার নেই।
আর সরকার যদি শেষটায় কন্ট্রোল তুলে নেন মাছের বেলা যা হয়েছে তা হলে আম্মো শেয়ারের সন্ধানে বেরুব। টাকা নিয়ে কথা, মশাই। তার আবার সুনীতি দুর্নীতি কী?
ঝুলবই না হয় একদিন পপলারের মগডালে। ক্রুশবিদ্ধ ক্রাইস্টের দু দিকে আরও কে যেন দুজন ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল।
———–
১. ক্রোআঁশা =ক্রেসেন্ট অর্ধচন্দ্রের ন্যায় দুধেমাখমে তৈরি ফিনসি রুটি। তুর্করা ভিয়েনা যুদ্ধে পরাজিত হলে পর, ভিয়েনাবাসী তুর্কদের পতাকা-লাঞ্ছন অর্ধচন্দ্র আকারে রুটি বানিয়ে তাঁদের জয় সেলেব্রেট করে। আজ যদি ইস্টবেঙ্গল একটি কেকের উপর মার্শপেনের বাগান বানিয়ে সেটা খায়– অনেকটা সেইরকম! আমি কিন্তু মোহনবাগানি।
২. যাঁরা আর্ট হিস্ট্রির চর্চা করেন, তাদের স্মরণে আসবে গোঁয়ার ছবি, যেখানে গাছে ঝোলানো শত্রুকে পর্যবেক্ষণ করছেন এক অফিসার টেবিলে কনুই রেখে হাতে আরামসে মাথা রেখে। বস্তুত এ ছবি বেরোবার (১৮১০-১৩) কয়েক বছর পরই হাইনে তার প্রবন্ধ লেখেন।
৩. হাইনে ইহুদি। ইহুদিরা খ্রিস্টকে স্বীকার করে না।
৪. এস্থলে নিবেদন, বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা তথা দুর্বলতাবশত আমাকে মাঝে মাঝে পত্রিকায় পঞ্চতন্ত্র বন্ধ করতে হয়। সাতিশয় শ্লাঘা সহকারে স্বীকার করছি তখন কোনও কোনও পাঠক সম্পাদকও আমার কাছে কৈফিয়ত চেয়ে কখনও মিঠে কখনও কড়া চিঠি লেখেন। (যেসব বিচক্ষণ জন আমার লেখা অপছন্দ করেন, তাদের সান্ত্বনার্থে বলি, I am a fool; এবং প্রবাদ আছে One fool raiseth a hundred)। কাজেই পরের কিস্তির গ্যারান্টি দিতে পারি না বলে আমি সন্তপ্ত।
৫. যেসব ভারতীয় বিদেশি বইয়ের ব্যবসা করেন, তাঁদের সম্বন্ধে একটি আপ্তবাক্য প্রযোজ্য। শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণে এসেছেন এক সদ্য বিলেত-ফো– ইভনিং জ্যাকেট, বয়েলড শার্ট পরে। অতি কষ্টে পিড়িতে বসতে বসতে বললেন, মুশকিল, বাঙালাটা ভুলিয়া গেইছি। রবিঠাকুর নাকি শুনে বললেন, সত্যি মুশকিল হে ভড়, ইংরেজিটাও শিখলে না; বাঙলাটাও ভুলে গেলে!
পাসপরট
গল্পটি পুব বাঙলার বিশেষ একটি জেলা সম্বন্ধে। মনে করুন তার নাম লোহারা।
পুব বাঙলার সাধারণজন মাত্রেরই দৃঢ়তম বিশ্বাস লোহাভরা জেলার লোকমাত্রই অতিশয় ধুরন্ধর। এদের কেউ একা বা দল বেঁধে ঢাকা স্টেশনে নামলে বিদগ্ধ, হাজির-জবাব কুট্টি পর্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে এদের রীতিমতো সমঝে চলে। সর্বশেষে বলা হয়, ওই জেলাতে কখনও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সেখানে স্বয়ং শয়তান সে জেলার যে প্রধান প্রতিভূ সে পর্যন্ত মাছি ধরে ধরে খায়–কারও গোলায় হাত দিতে হিম্মত পায় না।
তামাম পুব বাঙলার চাণক্য-মাকিয়াভেললি যে এদের সম্মুখীন হলে হুশিয়ারির খাতিরে তদ্দণ্ডেই তাঁদের কানাকড়িটি পর্যন্ত স্টেট ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে আসেন সে-তত্ত্বটি লোহাভরাবাসী বিলক্ষণ অবগত আছে বলে তারা সহজে আপন বাসভূমির খবর দেয় না; লোহাভরার পার্শ্ববর্তী কোনও এক জেলার বাসিন্দা বলে পরিচয় দেয়।
***
পারটিশনের ফলে কলকাতা এবং ঢাকাতেও নানা নয়া নয়া সমস্যা দেখা দিল।
ঢাকা সেকরেটারিয়েটে খবর এল আমেরিকা থেকে ভারতের বিস্তর জানোয়ার-দরদী মহাজনরা বাধা দিচ্ছেন, বাদর যেন মারকিন মুলুকে চালান না দেওয়া হয়, মারকিনরা নাকি ডাক্তারি এক্সপেরিমেন্টের অছিলায় এদের ওপর পাশবিক অত্যাচার (ডিভিসেকশন) করে। মারকিন ডাক্তাররা তাই ঢাকাকে অনুরোধ করেছেন, তারা যদি ন্যায্যাধিক মূল্যেও মর্কট সরবরাহ করেন। পশ্চিম ও পুব বাঙলার মর্কটে মর্কটে নাকি রত্তিভর ফারাক নেই এবং এরা কোনও প্রকারের মাইগ্রেশন সারটিফিকেট নিয়ে দেশত্যাগী হয়েছে বলে জানা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সেকরেটারি মহোদয় তিনি আমাকে সংক্ষেপে ইতিহাসটি কীর্তন করেন– তাঁর দফতরের ঝানু-ঝাণ্ড এসিসটেনট তস্য এসিসটেনটদের এত্তেলা দিয়ে তাদের ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, এটা ফরেন ইচেনজের সাতিশয় গুরুতর ব্যাপার!
দফতর-ভূশুণ্ডিরা একবাক্যে উত্তর দিলেন : বদর ধরার কৈশল অতিশয় প্যাচাল। এর স্পেশালিস্ট ছিলেন হিন্দুরা। তাঁরা ইন্ডিয়া চলে গেছেন।
অনেক তর্কাতর্কির পর স্থির হল জেলায় জেলায় খবরের কাগজে যেন নিম্নোক্ত বিজ্ঞাপনটি ফলাও করে ছাপানো হয়–
বাঁদর! বাঁদর!! বাঁদর!!!
এতদ্বারা সর্বসাধারণকে জানানো যাইতেছে যে, মারকিন-মুলুকের অনুরোধে এই দেশ হইতে জীবন্ত বাঁদর আমেরিকায় রফতানি করা হইবে। তজ্জন্য উপযুক্ত মূল্য দেওয়া হইবে।
স্বাক্ষর সেকরেটারি
সবুজপুরা, ঢাকা-১১।
আমি সচিব মহোদয়কে শুধালাম, উত্তম ব্যবস্থা। তার পর?
বললেন, যেই না বিজ্ঞাপনটি লোহাভরা জেলায় বেরিয়েছে অমনি দেখা গেল, তাবৎ জেলার লোক লুঙ্গি ফেলে ফেলে গুয়া গাছের ডগায় চড়ে বসে আছে। সবাই মারকিন মুলুকে যাবে। মুশকিল! জানেন তো, লোহাভরার লোকের যা কাত্তিকের মতো চেহারা, তাতে কোনটা বাঁদর কোনটা মানুষ ঠিক ঠাহর করা—
