বিস্ময়ে অধম নির্বাক! তবু অতি কষ্টে ক্ষীণ কণ্ঠে চি চি করে বলছি, অবিশ্বাস্য, অবিশ্বাস্য, স্বপ্ন নু মায়া নু মতিভ্রম নু– আপনাকে শ্রীরায়ের তন্বী মাফিক একই বইয়ের পঞ্চগব্য খেতে হবে না, হল না– পাঁচ ঢালা গোবর খেতে হবে না– একই বইয়ের পাঁচ কপি কিনতে হবে না।
এস্থলে আরেকটি নিবেদন– বিলিতি পুস্তক-বিক্রেতার বিরুদ্ধে আমার পুঞ্জীভূত বহুবিধ আক্রোশ আছে, গত পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে জমে উঠেছে ঘোরতর বিতৃষ্ণা এবং আমি তাই আদৌ নিরপেক্ষ নই, আমি প্রাইভেট এবং পাবলিক প্রসিকিউটর উভয়ই দিশি পুস্তক বিক্রেতা ২৫% কমিশন পেয়ে, রোক্কা টাকা ঢেলে বই কিনে নিয়ে যায় আপন রিকে; সে বই বিক্রি না হলে তার পুরোপুরি সমুচহ লোকসান। প্রকাশক বই ফেরত নেবে না। বিলিতি বাবুরা অর্ডার নিয়ে, কোনও কোনও স্থলে পুরো দাম বায়না পকেটস্থ করে বইয়ের জন্য বিদেশে অর্ডার দেন। সিকি কানাকড়ির রিস্ক নেই। এ যে কত বড় ঈশ্বর-প্রতিশ্রুত স্বর্গরাজ্য সে জানে বিক্রেতা।
***
এবারে একটি ব্যক্তিগত নিবেদন; একমাত্র তাদেরই উদ্দেশে যারা আমার অক্ষম লেখনীপ্রসূত মন্দ-ভালো পড়েন। তারাই বলুন, এই যে প্রায় কুড়ি বছর ধরে আমি লিখছি, কখনও দলাদলিতে ঢুকেছি? কখনও কাউকে আক্রমণ করেছি? এমনকি আমি যখন আক্রান্ত হয়েছি, তখন আত্মপক্ষ সমর্থন করেছি? হ্যাঁ, দুএকবার বাদ-প্রতিবাদে নেমেছি, যখন দেখেছি কোনও নিরীহ, বেকসুর, অখ্যাত লেখক আক্রান্ত হয়েছেন কোনও বুলি দ্বারা, যিনি তাঁর নামের পিছনে জুড়ে দিয়েছেন তার সবকটা ডিগ্রির ফিরিস্তি যাতে করে সাধারণ পাঠক, প্রাগুক্ত নিরীহ লেখক এবং সম্পাদক স্তম্ভিত, বিস্মিত এবং সর্বোপরি আতঙ্কিত হন– সেই নিরীহের পক্ষ সমর্থন করে। তখন সেই ফিরিস্তি-পুচ্ছধারী হামলা করেছেন আমার প্রতি। আমি তদ্দশ্যেই নিরুদ্দেশ, কারণ, আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করার কোনও প্রয়োজনবোধ করিনি, সেকথা পূর্বেই সবিনয় নিবেদন করেছি। ইতোমধ্যে সেই নিরীহ কিছুটা সান্ত্বনা পেল যে, এ দুনিয়ায় অন্তত আরেকটা মূর্খ আছে, যে তার মতে সায় দেয়।
কেন নামিনি? আমার কলমে বিষ নেই?
কিন্তু এবার নামতে হল। ১৯২১ সালে যখন সর্বপ্রথম জর্মন ফরাসি পাঠ্যপুস্তক কিনতে গিয়েছি, তখন বিলিতি বই বিক্রি করত শুধু বিলিতিরা, এবং তারা কান পাকড়কে নিয়েছে ঢালাও হিসেবে এক শিলিঙের জন্য এক টাকা। তখন বোধহয় শিলিঙের দাম ছিল দশ আনা। এটা নিশ্চয়ই দুর্নীতি নয়। সেই সকল বিপ্রসন্তান বলেছেন, এতদিন পর্যন্ত বই-এর ব্যবসার মধ্যে দুর্নীতি ছিল না বললেই হয়। মোক্ষম তত্ত্ব এবং তথ্য। কারণ সে যুগে, এবং এই পরশুদিনতক সরকার পুস্তকের ব্যাপারে কোনও নিরিখ, প্রাইস-শেডুল বা কেনা-বেচার সময় এক শিলিঙের জন্য কত ভারতীয় মুদ্রা নেবে তার কোনও আইন করে দেননি (controlled price)। কাজেই দুর্নীতির কোনও প্রশ্নই ওঠেনি। কিন্তু সাধারণ গেরস্ত এ নীতিটি মানবে কি? তুলনা দিয়ে শুধোই, আজ মাছের বাজারে আর কন্ট্রোল নেই; মাছওলা যদি কাদা চিংড়ির জন্য ১০ টাকা কিলো চায় তবে তো সেটা দুর্নীতি নয়–মানবে গেরস্ত? দমদমা তো মানছে না। তাদের ওপর এ বৃদ্ধের আশীর্বাদ রইল।
তখন কলকাতায়, বিলিতি বইয়ের ব্যবসাতে প্রাক্তন সুনীতিতে টইটম্বুর টাকার হরিনুট দেখে সে-বাজারে নাবলেন লেটিভরা।
কিন্তু সেই ১৯২১ থেকে ১৯৬৬-র ইতিহাস লিখতে হলে তো এক কিস্তিতে হবে না। তবে লিখব।(৪)
এ সুবাদে সদাশয় সরকারকে আবার বলি তোমার রেশনের চাল অখাদ্য, তুমি ভেজাল কালোবাজার ঠেকাতে পারছ না, বিদেশ গিয়ে দু মাসের জন্য রিসার্চ করে আমার দুখানা বই শেষ করার জন্য কুল্যে দু হাজার মার্ক চেয়েছিলুম তুমি দাওনি, বিদেশি বই কেনার জন্য তুমি ক্রমাগত এক্সচেঞ্জ কমাচ্ছ (এবং যা দিচ্ছ সে-ও ছুতোর-কামারের টেকনিকাল বই আর পাঠ্য পুস্তকের জন্য আমার কাজে লাগে না, ফলে মৃত্যুর পূর্বে আমাকে তুমি বিদেশি বইয়ের দুর্ভিক্ষ লাগিয়ে অন্নহীনবৎ মারছ– আমি রত্তিভর প্রতিবাদ করিনি, করছি না, করবও না। কিন্তু তুমি এই যে বিদেশি বইয়ের দাম কন্ট্রোল করছ, তার জন্য আমি তোমাকে দু হাত তুলে আশীর্বাদ করি। শঙ্কর তোমাকে জয়যুক্ত করুন।
ভেবো না আমি স্বার্থপর। আমি বই পাব না, এমনিতে না, অমনিতেও না। তুমি অঢেল হার্ড কারেসি ছেড়ে দিলেও না, না ছেড়ে দিলেও না। কেন, তার ইঙ্গিত বক্ষ্যমাণে দিয়েছি। বারান্তরে সবিস্তর।
হায়! কোথায় সেই কুটির আর সামনের সুদীর্ঘ পপলার গাছ। সরকার না একবার বলেছিলেন, তারা কালোবাজারিদের ল্যামপোস্ট ঝোলাবেন! পপলার গাছ অনেক ভালো। অনেক দূর থেকে দেখা যায়।
হ্যাঁ, আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল। যদ্যপি আমি বৃদ্ধ এবং শঙ্কর খেদ করেন, বৃদ্ধস্তাবৎ চিন্তামগ্ন আমি কিন্তু তরুণে আরক্ত। তাদের প্রতি এই সুবাদে একটি সদুপদেশ দিই; দুষ্টেরা তোমাদের বিদেশি ভাষা শেখার জন্য উপদেশ দেবে; সরল কনস্যুলেটগুলো তার জন্য ব্যবস্থা করবে এবং করছে। কিন্তু অমন কম্মটি কর না। বিদেশি বই না কিনতে পারলে বিদেশি ভাষা শিখে তোমার লাভ? এ যেন একগোচ্ছা চাবি নিয়ে বাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছে সিন্দুক কিন্তু একটাও নেই! এ যেন রশি নিয়ে হাওয়ার কোমর বাঁধার মতো বন্ধ্যাগমন! এবং পারলে বাঙলাটাও শিখবে না। বলা তো যায় না, সে বাজারেও কোনদিন কী হয় না হয়! হয়তো একই বই পাঁচ কপি কেনবার বায়নাক্কা বাঙলা পুস্তক বিক্রেতাও করবেন এবং অথবা পাঁচ টাকার বইয়ের জন্য সাত টাকা চাইবেন। আগের থেকে সাবধান হওয়া বিচক্ষণের কর্ম। কেন, নিরক্ষরের দিন কাটে না এদেশে? টিপসই দিয়ে চালাবে।
