***
কিন্তু যে গল্পটা দিয়ে আরম্ভ করেছিলুম সেটা গেল কোথায়?
যারা বিদেশি বই বেচনেওলাদের তরে ঘটি ঘটি অশ্রু বর্ষণ করছেন তাঁদের একজনের ভাবখানা অনেকটা : পচ শিলিঙের বই যদি তারা তারই ন্যায্য এক্সচেঞ্জে ভারতীয় টাকায় বেচে, তবে তাদের মুনাফা রইল কোথায়? এক ডলারের দাম সাত টাকা পঞ্চাশ পয়সা (কথার কথা কইছি, আমি সঠিক ভাও জানিনে), যদি সাত টাকা পঞ্চাশেই বেচে, তবে লাভ রইল কোথায় ওই সেই ডাকটিকিট বিক্রির মতো!
তিনি তার পর আরেক ঘটি এন্ট্রা চোখের জল ফেলে বলছেন, তাদের কত খর্চা। চিঠি লিখতে হয়। (মরে যাই!), ডাকমাশুল দিতে হয় (ও বাছারে!) এবং তার পর আর কী সব ধানাইপানাই করেছেন আমার মনে নেই। কিন্তু এইবারে অসহিষ্ণু পাঠক, ক্ষণতর, মেহেরবানি করে তুমি নিচের মোক্ষম তত্ত্বটি মনোযোগ সহকারে পড়।
উপরের উল্লিখিত ওই একজনই না, যাদের হাত দিয়ে বিলিতি বইওলারা তামাক খাচ্ছেন তাদের কেউই তো বলছেন না (কিংবা আমার হয়তো চোখে পড়েনি)– অন্তত সেই সরল বিপ্রসন্তান (ইনি পণ্ডিত তথা বি– এ দুয়ের সংযোগে মানুষ বড় সরল, neif হয়) বলেননি–
বিলিতি বইওলারা কত কমিশন পায়?
আমানউল্লার মাতা রানিমার আদেশে তার বন্দি চাচা নসরউল্লাকে খুন করা হয়। সর্বত্র খবর রটল, কফি খেয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
সংবাদদাতা বিলকুল ভুলে গেলেন মাত্র একটি সামান্যতম তথ্য পরিবেশন করতে। কফিতে ছিল সেঁকো বিষ।
এঁনারা এই সেঁকো বিষ অর্থাৎ কমিশনটির বাৎ বেবাক ভুলে যাচ্ছেন।
কত কমিশন পায়? জানিনে। তবে বঙ্গসন্তানদের ধারণা ২৫% ৩০%-এর বেশি হবে না, কারণ বাঙলা পুস্তক বিক্রেতা সচরাচর এর বেশি পায় না (হালে জনৈক প্রখ্যাত পুস্তক-বিক্রেতা গুদোম সাফ করার জন্য শতকরা ৪০/৫০ দিচ্ছেন বলে– পাঠক পরম পরিতোষ পাবেন, ওর মধ্যে আমার বইও ছিল– বাঙলা বইয়ের বাজারে ধুন্ধুমার লেগে যায়)। তাই প্রশ্ন, যেস্থলে বাঙালি প্রকাশক দু হাজার বই ছাপিয়ে শতকরা ২৫/৩০ কমিশন দেয়, সেস্থলে মার্কিন ইংরেজ এক ঝটকায় পঞ্চাশ হাজার এক লক্ষ ছাপিয়ে কত দেয়? কুইক টানঅভার নামক একটি বস্তুও আছে। শুনেছি এরা ষাট পার্সেন্ট পর্যন্ত দেয়। আমি বলতে যাচ্ছিলুম আশি। তা বলব না কেন? তোমরা যখন এই জীবনমরণ ভাইটাল তত্ত্বটি চেপে যাচ্ছ। দেখাও না কাগজপত্র। আমি অবশ্য বিশ্বাস করব না। তোমরা সব পার।
ঈশ্বর সাক্ষী, স্বরাজ লাভের পর থেকে সরকার বিস্তর বিস্তর আইন পাস করেছেন– আমি চাঁদপানা মুখ করে সব সয়েছি, রা-টি কাড়িনি। কিন্তু সরকার যখন এই কমিশন ব্যাপারের গুহ্য, সযত্নে লুক্কায়িত কমিশন তত্ত্বটি জানতেন বলে হুকুম দিলেন, বাপধনরা যখন দশ টাকার বই চার টাকায় পাচ্ছ তখন আর লাভ করতে যেও না, শিলিঙের দাম ১.০৫, এক পাচেই বেচো, কিনছ তো অষ্ট গণ্ডা পোহা দিয়ে–তখন উল্লাসে নৃত্য করে উঠলুম। আহা হাহা হা! কী আনন্দ, কী আনন্দ!
সস্তায় বই পাব বলে? মোটেই না। বই এমনিতে পাব না, অমনিতেও পাব না। ডিভ্যালুয়েশনের পূর্বেও পাইনি, এখনও পাব না। শুনবেন, কেন? বছর দুই ধরে আমি ধন্না দিচ্ছি, কয়েকখানা ফরাসি ও জর্মন বইয়ের জন্য (হিটলারের জীবনীটি সম্পূর্ণ করব বলে। যুদ্ধের কয়েকটা বছর বাদ দিলে ১৯৩৪ থেকে ১৯৬৪ অবধি আমি এ বিষয়ে বই কিনেছি– কয়েক হাজার টাকার)। সম্প্রতি কলকাতার বইয়ের বাজারে এক ঝাণ্ডু শ্রী রায় (ইনি এম এ, সুশিক্ষিত, সুপণ্ডিত) আমাকে জানালেন, আমি যদি প্রত্যেক বইয়ের অর্থাৎ একই বইয়ের পাঁচখানা করে কপি কিনি(!), তবে বিলিতি বইয়ের বুকসেলার আমাকে আমার প্রার্থিত বই আনিয়ে দিতে পারবেন। তার যুক্তি, একসঙ্গে পাঁচখানা বই না কিনলে বুকসেলার কমিশন পান না!
এ প্রস্তাবটি এমনই উন্মাদের বাতুলতা যে, কোনও পাঠকই এটা বিশ্বাস করবেন না। একই বইয়ের পাঁচখানা করে কপি নিয়ে আমি করব কী? পঞ্চবীর-পতিগর্বিতা দ্রৌপদীর পাঁচটি স্বামীই যদি একই রবর স্ট্যাম্পের পঞ্চলাঞ্ছন, পাঁচ অ্যানকোর হতেন তবে তিনিও যে খুব সন্তুষ্ট হতেন না, অনুমান করা যায়। পাঁচ কেন, দুটো হলেই চিত্তির। আমার শোনা মতে এক রমণীর বিয়ে হয়, যমজ ভাইয়ের একজনের সঙ্গে। ভাশুর ভাদ্রবধূ উভয়ই সন্ত্রস্ত। শেষটায় সাবধানী ভাশুর আরম্ভ করলেন টিকিটিতে পুজোর সময় একটি জবা ফুল বেঁধে নিতে। শয্যায় পদ্মনাভকে স্মরণ না করা পর্যন্ত ক্ষণে ক্ষণে চৈতনপ্রত্যন্তে হাত বুলিয়ে চেক অপ করে নিতেন, ফুলটি স্থানচ্যুত হয়নি তো! কাহিনীটি শুনে ইন্দ্রজিৎ ব্রিামীয় একখান পান ছেড়ে মন্তব্য করলেন, টিকিতে ফুল! তা হলে স্বামী নিয়ে fooling বন্ধ হল।
পাঁচখানা বই- একই বই (পাঁচখানা ভিন্ন ভিন্ন বই নয়, যে-ব্যবস্থাতে তো আমি হরবকত রাজি)– না কিনলে নাকি বাবুরা কমিশন পান না!
তবে আইস পাঠক, শূন্বন্তু বিশ্বে–
কারণ বিশ্বজোড়া ছড়িয়ে-পড়া একটি মাসিক থেকে (জুলাই, ১৯৬৮) বিজ্ঞাপনটি তুলে দিচ্ছি :
Published in England at Rupees 105.00 you have the chance of buying them (the book is in six volumes)-under our NO-RISK money-back guarantee for a mere Rs. 72.00-a saving of 30% on the published price.
অস্য বিগলিতাৰ্থ– সাদামাটা খদ্দের হিসেবেই তুমি ৩০% কমিশন পাবে; এবে শুধোই– অনাথা, অবলা বিলিতি বুকসেলাররা কত পাবেন? সে দিশি কোম্পানি বোম্বায়ে বসে, বিলেত থেকে প্রাগুক্ত বই আনিয়ে এদেশে বিক্রি করছেন, তিনি বুঝি আলা খয়রাতি হাসপাতাল খুলেছেন! তা হলে সাধু! সাধু!! সাধু!!!
