সিরিল বললেন, বট্ট্যে? তুমি যখন পাঁচ রকম ঔচে (উচ্ছে) বর্ণনা দিতে দিতে বারির চূড়ান্তে পৌঁছে গিয়ে বল, ইংরেজ রাসৃটিক, তেহোর কদর বোঝে না, তখন আমি বাধা দিই? তুমি যখন বারোরকম অ্যামবল (অম্বল)–
***
শ্ৰীযুক্ত নীরদ চৌধুরী যাই বলুন, যাই কন, জামাকাপড় বাবদে আমরা মুক্ত।
রাস্তা দিয়ে নাগা সন্ন্যাসী যখন যায়, তখন তো আমরা শুধোইনে, এটা হিন্দু না মুসলমান ড্রেস!!
পপলারের মগডালে
দুই মহা চাণক্যে বিশ্রম্ভালাপ হচ্ছিল। নিদাঘের মধ্যরাত্রি আসন্ন। প্রচুর সুরা পান হয়েছে। ফলে সর্বাঙ্গ দিয়ে অজস্র স্বেদ ও তজ্জনিত বাষ্প বিনির্গত হচ্ছে। এমতাবস্থায় সেই স্টিম থেকে যে স্পিরিট বেরুচ্ছে সেটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সামান্যতম স্পর্শ পেলেই দপ করে জ্বলে উঠবে বলে চাণক্যদ্বয় সিগার ধরাচ্ছেন না।
ইতোমধ্যে একজন গভীরতম চিন্তায় নিমজ্জিত থাকার পর দ্বিতীয়জনকে প্রশ্ন করলেন, একটা সমস্যা নিয়ে আমি অত্যন্ত বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছি, ভ্রাতঃ! ভেবে ভেবে কোনও কূলকিনারা পাচ্ছি নে। মার্শাল থেকে শুমপেটার হয়ে কেইনস রবিনস সবাইকে চষেছি বেকার বেকার। তা আপনার কাছে তো কিছুই অজানা নেই
হুম।
এই ডাক-বিভাগটা চলে কী প্রকারে? অত অঢেল টাকা পায় কোথায়? ভাবুন দিকিনি, বিরাট বিরাট মাইনের ডাঙর ডাঙর আপিসাররা রয়েছেন, দশাসই সব আপিস দপ্তর, অগুনতি ভ্যান, লম্বা দৌড়ের রেলগাড়ি হলেই তার আধখানা জুড়ে ডাকের জন্য খাস ব্যবস্থা– এ তো আর ফোকটে-মুফতে হয় না! হ্যাঁ, মানলুম, তারা কোটি কোটি টাকার ডাকটিকিট বেচে। কিন্তু ওটাকে তো আর ব্যবসা বলা চলে না। ১০ পয়সার ডাকটিকিট বেচে ১০ পয়সায়, ১৫ পয়সার টিকিট বেচে ১৫ পয়সায়, কুড়ির কুড়ি পয়সায়ই। এক কানাকড়িরও তো মুনাফা নেই ওতে, যা দর তাতেই বিক্রি! লাভ রইল কোথায়? তা হলে ডাক-বিভাগটা চলে কী করে?
অতি হক কথা কয়েছেন, আমিও সানন্দে স্বীকার করছি, টিকিট বিক্রি করে ডাক-বিভাগের রত্তিভর মুনাফা হয় না। যে দাম আছে, তাতেই সে বিক্রি করতে বাধ্য। কিন্তু জানেন তো, দাদা, বড় বড় মুনাফার ব্যবসা মাত্রেই লাভের পথটা থাকে লুকানো যেদিকে সরল জনের নজর যায় না, তার মনে কোনও সন্দেহই হয় না। আচ্ছা! এইবারে দেখুন সমস্যাখানার রহস্য। পনেরো গ্রাম ওজনের খামের জন্য পোস্টাপিস চায় পনেরো পয়সা টিকিট নয় কি? এইবারে আপনাকে আমি শুধধাই হক্ক কথা কন। প্রত্যেকখানি চিঠির ওজনই কি টায়-টায় পনেরো গ্রাম? হাজারখানার ভিতর একখানারও হয় কি না হয়– এ তো কানায়ও দেখতে পায়। একটার ওজন হয়তো বারো গ্রাম, কোনওটার আট, কোনওটার-বা তেরো। এইবারে বুঝলেন তো, এই যে তফাতটা– এই যে ফারাকটুকু, এর থেকেই ডাকবিভাগের নিরেট লাভ–ওই দিয়ে তার দিব্যি চলে যায়।
পাঠক ভাবছেন, আমি অর্থশাস্ত্রের জটিলতম সমস্যায় কণ্টকিত এই প্রস্তাবটি উত্থাপিত করলুম কেন? আমিও তাই ভাবছি। বস্তুত আমি মেহতা-চৌধুরী-জনসুলভ এই পঞ্চতন্ত্র কাহিনীটি যখন শ্রবণ করে কৃতকৃতার্থ হই তখন, কিংবা আমার বাতুলতম মুহূর্তেও আমি ওহেন সম্ভাবনার কণামাত্র আভাস পাইনি যে, ইটি একদিন আমার কাজে লাগবে।
লেগেছে। টায়-টায় না হলেও হরেদরে। সর্ব কাহিনী, তাবৎ উপমাই দাঁড়ায় তিন ঠ্যাঙের উপর ভর করে। চার পায়েই যদি দাঁড়ায়, তবে তো সে হুবহু একই বস্তু হয়ে গেল। উপমা রূপক, প্রতীক হতে যাবে কেন?
বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ দেখি, এক দরদী সম্ভ্রান্ত সম্প্রদায় বিকট চিৎকার করে চিল্লি দিয়ে কেঁদে উঠেছেন, বিদেশি পুস্তক বিক্রেতাদের জন্য। হায় হায় হায়, এদের কী হবে? এরা কোজ্জাবে, মা!
কান্নার বহর দেখে মনে হল, এঁরা যেন ফুটপাথের পুরনো বই বিক্কিরিওলাদের চেয়েও বিকটতর বিপাকে পড়েছেন। এদের দুরবস্থা (প্রেস! হ্যাঁ, আমি আকার দিয়ে দুরবস্থাই লিখছি) দেখ সেই সম্ভ্রান্ত সম্প্রদায় ঘটি ঘটি চোখের জল ফেলছেন।
আম্মো দরদী। কিন্তু এই ডুকরে-ওঠা, চিল-চাঁচানো মড়া-কান্না শুনে আমার হৃদয়ে মিলক অব মেন কাইন্ডনিস না বয়ে লেগে গেল সেথায় অন্য ধুন্ধুমার। খাঁটি মড়া-কান্না আমি বিলক্ষণ চিনি। আমার বসত-বাসা শুশানের লাগোয়া।
***
মহাকবি হাইনরিষ হাইনের মরমিয়া প্রেমের গীতি-কবিতা সম্বন্ধে একাধিকবার লেখবার সুযোগ আমি পেয়েছি। ইনি সাক্ষাৎ চণ্ডীদাস। পাঠককে শুধোই, সুখের লাগিয়া এঘর বাঁধিনু, তোমার চরণে আমার পরাণে লাগিল প্রেমের ফাঁসি শুনে কি তোমার কখনও মনে হয়েছে, এ কবি …চিঠির মতো (এ মাসিকের বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত কোনও ফরিয়াদ নেই– অম্মদ্দেশে শত্রু-মিত্র উভয়ভাবেই পুজো করার পদ্ধতি ঐতিহ্যসম্মত) কিংবা কংগ্রেস কমুনিস্টের মতো কটুকাটব্য কস্মিনকালেও করতে পারে?
তাই যখন বিঘ্নসন্তোষী, পরশ্রীকাতর একপাল (লুমপেন-পাক) ফেউ লাগল হাইনের পিছনে তখন তিনি কোনও উত্তর দিলেন না। সবাই ভাবল, যার মুখ দিয়ে সদাই মধু ঝরে সে আবার এসব বেতালা বদখদ বেত্তমিজি বাতের কীই-বা জবাব দেবে। ভুল, ভুল! সব্বাই করলেন ক্ষ-তে গলদ।
একদিন তার হল ধৈর্যচ্যুতি।
কী যেন একটা আমার ঠিক স্মরণে আসছে না– ভ্রমণ-কাহিনী না কী যেন কিসে মোলায়েম প্রাকৃতিক বর্ণনা দিতে দিতে তিনি বললেন, সবাই জানেন, আমি সাতিশয় সাধারণ কবি, তাই আমার খাঁইও অতিশয় সাধারণ। কবি মানুষ, দয়াময় ভগবান যদি নদীপারে আমাকে একখানা কুঁড়েঘর দেন, তা হলেই আমার দিব্যি চলে যাবে। আর ঘরের তৈরি সাদামাটা কিঞ্চিৎ রুটি- শহুরে বান, ক্রোআঁশা(১) কিসসুটি না– আর ঘরেই তৈরি মাষা পরিমাণ মাখম, ব্যস। তদুপরি দয়াময় ভগবান যদি আমাকে আরও খুশি করতে চান, তবে তিনি যেন ওই নদীপারে উঁচাসে উঁচা একসারি পপুলার লাগিয়ে দেন। সর্বশেষে, তাঁর অসীম করুণাবশে যদি দয়াময় আমাকে পরিপূর্ণ কৈবল্যানন্দ দিতে চান, তবে তিনি যেন আমার পিছনে যারা লেগেছে ওই দুশমনদের পলারের মগডালে ফাঁসি দেন। অন্তবিহীন আনন্দরসে ভরপুর হৃদয় নিয়ে, কুটিরের দাওয়ায় বসে আমি তখন উপরপানে তাকিয়ে দেখব, সাতিশয় মনঃসংযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করব, আহা কী রমণীয় দৃশ্য! দুশমনদের পাগুলো মৃদুমন্দ পবনে দুলছে– দোদুল দোলায় হিল্লোল লাগিয়ে।(২) হ্যাঁ, আলবৎ প্রভু যিশুখ্রিস্ট আদেশ দিয়েছেন(৩) শত্রুকে ক্ষমা করবে, তাকে প্রেম দেবে। নিশ্চয় করব, নিশ্চয়ই দেব– আমার সর্বসত্তা উজাড় করে, কিন্তু ওই যে বললুম, ওদের ফাঁসি হয়ে যাবার পর।
