জিদ ঋষি নন– গ্যোটের মতো। কিন্তু তিনি তখন ফ্রান্সের গ্রা ম্যাক্স–এ্যাড় মাস্টার অর্থাৎ ফ্রান্সের পথভ্রষ্টা সাহিত্যসম্রাট। সেই ফরাসি সম্রাট সঞ্জীবনী সান্ত্বনা নিচ্ছেন যে জরমনি নির্মমভাবে ভূলুণ্ঠিত করেছে গরবিনী ফ্রান্সকে, তারই ঋষি কবির কাছ থেকে!
***
মিশরের আড্ডা সম্বন্ধে পক্ষাধিককাল পূর্বে যখন লিখি তখন কল্পনাও করতে পারিনি, এই মিশরই দু-পাঁচ দিনের ভিতর লেগে যাবে জীবনমরণ সংগ্রামে। সেই আড্ডাতে যিনি ছিলেন আমাদের কবিম্রাট তাঁর কবিতা পড়লে মনে হত তিনি যেন ইসলাম অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী যুগের বেদুইন ভাট। কথায় কথায় বিশাল মরু দিগন্তে বিলীন, ছুটছে ঘোড়া উড়ছে বালি আর জাত ইহুদি ইব্রাহিমের পুত্র মিশররাজ ইউসুফ ও জোলেখার সাহারার উষ্ণশ্বাস-ভরা নীলনদের দু-কূলভাঙা প্রেম।(২) আলট্রা মডারন কাইরো শহরের শিক পশ কাফের বাতাবরণে আমাদের কবিরাজ আহমদ ইবন শহরস্তানি অল-মুকদদসি যখন তার সেই ফারাও যুগের প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাত, তখন আমার মনে হত এ রস রোমানটিক, ক্লাসিক, এপিক, বৈদিক, প্রাগৈতিহাসিক সবকিছু ছাড়িয়ে গিয়ে সোজা বেআনডারটালে পৌঁছে গেছে। কবিও তাই চাইতেন।
আমাদের মুকদৃদসি কিন্তু আর্ট কী, অলঙ্কার কাকে বলে, আর অনুভূতি-প্রধান না তাতে অন্য কোনও মনোবৃত্তি চিত্তবৃত্তি প্রবেশ করতে পারে কি না সে নিয়ে কোনও আলোচনা করতে চাইত না, পারতও না। এ কিছু নতুন তত্ত্ব নয়। মা-ঠাকুরমার রূপকথা শুনে আমরা, হ্যাঁ, বয়োবৃদ্ধরা পর্যন্ত বিমোহিত হয়ে ভাবি, রূপকথা কল্পনা করার, তাকে অনাড়ম্বর ভাষায় প্রকাশ করার রহস্যটা কোনখানে। প্রশ্ন শুধিয়ে দেখি ঠাকুরমা-ও জানেন না। মুকদদসির বেলাও হুবহু তাই।
শুধু একটি কথা মাঝে মাঝে মাথা দোলাতে দোলাতে বলত, কবি হওয়ার একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে হে, কবি হওয়ার একটা বিশেষ মূল্য আছে। সে মূল্য কিন্তু অর্থ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি কোনওকিছুর মাপকাঠি দিয়েই বিচার করা যায় না। কোন এক ইরানি কবি নাকি পেয়েছিলেন লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা, দাতে পেয়েছিলেন বেয়ারিচের কাছ থেকে একটি ফুল, কিংবা কী জানি, কার ঠোঁটের কোণে স্বীকৃতির একটুখানি স্মিতহাস্য, কী জানি।
কবি মুকদদসি বড় স্পর্শকাতর। সে আরব। ইহুদিদের কাছে তারা নির্দয়ভাবে লাঞ্ছিত অপমানিত হয়েছে। তাকে চিঠি লিখেছি, সখা তুমি ইহুদিকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হাইনরিষ হাইনে পড়।
***
যে একেরমান গ্যোটের সঙ্গে কথোপকথনের বিবৃতি দিয়ে বিশ্ববিখ্যাত হন তিনি ছাত্রাবস্থায় গ্যোটিঙেন শহরে হাইনের বন্ধুত্ব লাভ করেন। এক জহুরিকে চিনতে অন্য জহুরির বেশিক্ষণ সময় লাগেনি। প্রথম দর্শনেই প্রেম হয়।
ছাত্রাবস্থাতেই হাইনের সরল মধুর কবিতা জরমানির সর্বত্র খ্যাতিলাভ করে। অতিশয় সাধারণ জন-দফতরের কেরানি, ম্যাটরিকের মেয়ে, ছাপাখানার ছোকরা তাকে যেন দুবাহু মেলে আলিঙ্গন করে নেয়। আর ওদিকে বন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত আলঙ্কারিক সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ফন শ্লেগেল তো তাকে প্রথমদিনই বিজয়মুকুট পরিয়ে দিয়েছিলেন।
ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন একেরমান; ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮২৪। তার পর সেটি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।
গ্যোটিঙেন থেকে ঘোড়ার গাড়িতে ঘণ্টাখানেকের পথ– লানটুভের বিয়েরগারটেন। খোলামেলাতে বিয়ারের আড়া। রোববার দিন গ্যোটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরা সেখানে এসে জালা জালা বিয়ার খায়, হইহুল্লোড় করে, আর নৃত্যগীত তো লেগেই আছে।
একেরমান, হাইনে এবং কলেজের আরও কয়েকজন ইয়ার-বসি গেছেন সেখানে ফুর্তি করতে।
হাইনে আগের থেকেই মৌজে বোধহয় হামবুর্গের ব্যাঙ্কার কাকার কাছ থেকে বেশ কিছু পেয়েছেন।(৩) তিনি ছেড়ে দিয়েছেন তার আনন্দোল্লাসের লাগাম– বাক্যস্রোত ছুটেছে তুরুক সোওয়ারের মতো। বিয়ার তাদের টেবিলে নিয়ে এসেছে পাব-এর খাবসুরুত কোমলাঙ্গি তরুণী লটে (Lotte), হাইনে ফুর্তির চোটে জড়িয়ে ধরেছেন সুন্দরী লটেকে। কিন্তু একেরমান ও অন্যান্য ইয়াররা পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে জানতেন, এই লটেটি বিয়ার-খানার আর পাঁচটা বার্গারুলের মতো ঢলাঢলির পাত্রী নয়। রাগে তার বাঁশির মতো নাকের ডগাটি হয়ে গেছে টুকটুকে রাঙা, চোখ দিয়ে বেরুচ্ছে আগুনের হলকা, আর সে এমনই ধস্তাধস্তি আর পরিত্রাহি চিৎকার ছাড়তে আরম্ভ করেছে যে, ইয়ারগোষ্ঠী কানে আঙুল দিয়ে চেপে ধরেছেন। হাইনে ওটা মশকরা হিসেবেই ভেবে নিয়েছিলেন গোড়ার দিকে, কিন্তু একটু পরেই কী যেন ভেবে অপ্রতিভ হয়ে চুপ মেরে গেলেন– যেন কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।(৪)
পরের সপ্তাহে একেরমানরা যখন হাইনেকে তুলে নিতে এলেন, তখন তিনি তাদের সঙ্গে যেতে কবুল নারাজ। শেষটায় একরকম গায়ের জোরে জাবড়ে ধরে তাকে গাড়িতে তুলতে হল।
কাফেতে আসন নিয়ে হাইনে মাথা হেঁট করে রইলেন চুপ। ঘাড় তুলে মেয়েটির দিকে তাকাবার মতো সাহস পর্যন্ত তার নেই।
কিন্তু কী আশ্চর্য! লটে স্বয়ং এসে উপস্থিত হাইনেদের টেবিলে। মধুর হাসি হেসে হাইনের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালেন। এয়ার-দোস্তরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
লটে হাইনের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার ওপর রাগ করবেন না, স্যার। আপনি অন্য ছাত্রদের মতো নন। আমি আপনার কবিতা পড়েছি। কী সুন্দর! কী সুন্দর!! আপনার যদি ইচ্ছে যায়, তবে এইসব ভদ্রলোকের সামনাসামনি আমাকে আলিঙ্গন করতে পারেন কিন্তু এইসব মধুর কবিতা আপনাকে রচনা করে যেতেই হবে।
