বলেই লটে তার গাল বাড়িয়ে দিলেন হাইনের দিকে। আর হাইনে? কে জানত হাইনের মতো সপ্রতিভ লোকও লজ্জায় লাল হয়ে যেতে পারেন– লজ্জায় লাল হয়ে তিনি চুমো খেলেন।
একেরমান বলেছেন লক্ষ করলুম (নটবর) বন্ধু স্পিটা হিংসেয় একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে।
***
হাইনের চোখ দুটি ভিজে গিয়েছে। মৃদু কণ্ঠে বললেন, এ জীবনে এর চেয়ে সুখী আমি আর কখনও হইনি। এই আমি প্রথম হৃদয়ঙ্গম করলুম, কবি হওয়ার মূল্য আছে, কবি হওয়া সার্থক।
***
সখা মুকদদসি, কবি হওয়া সার্থক।
———–
১. দুঃখের বিষয়, মূল পাঠটি আমার কাছে নেই। উভয় মহাপুরুষের পরিচয় হয় কারলস বাড-এ (চেক নাম Karlovy Vary)। ছোট গলির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে উভয়ের দেখা হয় জনা দু-তিন রাজপুত্রের সঙ্গে। গ্যোটে সসম্মানে তাদের পথ ছেড়ে দেন। বেটোফেন পাগলা ষাড়ের মতো সোজা চলতে থাকলে রাজপুত্রেরা সবিনয় তার জন্য পথ ছেড়ে দিয়ে একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যান। গলির শেষে পৌঁছে বেটোফেন প্রতীক্ষা করেন গ্যোটের জন্য। তিনি পৌঁছলে পর রাজপুত্রদের প্রতি ইঙ্গিত করে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন, এরা কারা? আপনি-আমি দেবদূত ইত্যাদি। সমস্ত ঘটনাটিই হয়তো কিংবদন্তিমূলক। এর একাধিক পাঠ (ভারসন) আমি কারলস বাডে বাসকালীন শুনেছি। তবে রাও তার বেটোফেন-গ্যোটে সম্বন্ধে পুস্তকে ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন।
২. আমরা যে গ্রন্থকে ওলড টেস্টামেন্ট বলি সেইটেই ইহুদিদের তৌরা ইত্যাদি। সেসব গ্রন্থে বর্ণিত অনেক পয়গম্বর কুরানেও বর্ণিত হয়েছেন। ইউসুফ তাদেরই একজন। নজরুল ইসলাম হাফিজের অনুবাদ করেছেন : দুঃখ কর না, হারানো ইউসুফ কিনানে আবার আসিবে ফিরে।
৩. টাকাকড়ি বাবদে হাইনে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন অত্যন্ত বেহিসেবি। তিনি স্বয়ং এক জায়গায় লিখেছেন, কে বলে আমি টাকার মূল্য বুঝিনে? যখনই ফুরিয়ে গিয়েছে তখনই হাড়ে হাড়ে বুঝেছি।
৪. কনটিনেনটের ছাত্র-পাবে এ ঘটনা নিত্য নিত্য ঘটে। কেউ বড় একটা সিরিয়াসলি নেয় না। চেঁচামেচিটা অনেক ক্ষেত্রেই ন্যাকরা বলে ধরা হয়।
ন্যাংটাকে ভগবানও ডরান
কী করে হঠাৎ একরাশ টাকা আমার হাতে এসে পৌঁছল, সেটা দফে দফে বুঝিয়ে বলা শক্ত। দরকারও নেই। মোটামুটি বলতে পারি, অনেকটা লটারি জেতার মতো।
কিন্তু বিপদ হল, টাকাটা যার মারফৎ এসেছিল, তাঁকে নিয়ে। তিনি লন্ডনের বিকটতম উন্নাসিক এক দর্জির দোকানে কাজ করেন। সে দোকান নাকি রাজ-পরিবারের বাইরের কারও জন্য অর্ডার নেয় না। সেই কর্ম-প্রতিষ্ঠানে না আছে সাইনবোর্ড, না আছে টেলিফোন-কেতাবে তাদের নাম, নম্বর। তাদের প্রাইভেট নম্বর শুধু রাজ-পরিবার জানেন। অন্য লোকে সন্ধান পাবেই-বা কী করে!
আমি বাস করতুম তারই বাড়িতে। বাড়ির জেল্লাই কিছু কম নয়। বাকিংহাম প্যালেস পেরিয়ে হাইড পার্ক গেটে তার ভবন। সে রাস্তাতেই থাকেন আর্টিস্ট এপসটাইন (না রোটেনস্টাইন, ঠিক জানিনে) ও চার্চিল সাহেব। আমি সেথায় আশ্রয় পেলুম কী করে? সেই খলিফের খলিফে গিয়েছিলেন হল্যান্ডে। সেথাকার রাজকন্যার বিয়ে হবে। বরের বিয়ের বেশভূষা তৈরি করতে। অতিশয় অনিচ্ছায়, দেশের আপন রাজার আদেশে। সেই বিদেশের রাজধানীতে পথ, হোটেলের নাম সব হারিয়ে যখন গা গার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন আমি তাকে কিছুটা সাহায্য করতে পেরেছিলুম। ব্যস! হয়ে গেল। তিনি সেখান থেকে পড়কে আমাকে লন্ডন নিয়ে এলেন। তদবধি তার ভবনে বাস। অবশ্য স্বীকার করব, লোকটি দ্র। আমি অন্যত্র সস্তা জায়গায় থাকলে যে কড়ি শুনতুম, তিনি সেটি সপ্তারম্ভে সহাস্যে নিতেন। পাছে আমি লজ্জিত হই, আমি মুফতে আছি।
আমি বললুম, কী ধরনের কাপড়ে স্যুটটি হবে সে বাবদে আমারও তো কিছু রুচি থাকতে পারে। দেখি, কাপড়ের নমুনা।
পাগলামিতে হাতেখড়ি হচ্ছে হেন লোককে যেভাবে ডাক্তার প্রণব রায়ের মতো লোক হ্যাঁন্ডিল করেন, সেইভাবে সদানন্দ হাস্য হেসে বললেন, বৎস, তোমাকে গুটিকয়েক প্রশ্ন শুধোই। তোমার যখন বিয়ে হয়, তখন গুরুজন তোমার ওই রুচির কথা শুধিয়েছিলেন?
সত্যের অনুরোধে আমাকে নিরুত্তর থাকতে হল।
আর এ তো সামান্য স্যুট। অবশ্য তুমি কুতর্ক করতে পার, সামান্য জিনিসেই বরঞ্চ আপন রুচিমাফিক জীবনানন্দ লাভ করা যায়। কিন্তু এ তো সামান্য জিনিস নয়, এ ব্যাপারটি অসামান্য। ভেরি ভেরি ইমপরটেন্ট। নইলে কও, এরই মেহেরবানিতে আমি বাড়ি গাড়ি হাকালুম কী প্রকারে? অতএব বুঝিয়ে কই।
গভীর দম দিয়ে মি. সিরিল হজসন-জবসন ফজ-রোবসন বললেন, উপস্থিত নববসন্ত সমারম্ভ। তুমি এসব স্যুট পরবে নিদাঘের অন্তিম নিশ্বাস থেকে হেমন্তের শেষান্ত পর্যন্ত। এইবারে শোনো বস, তত্ত্বকথা। শিশির বসন্ত নিদাঘ হেমন্ত প্রতি ঋতু অনুযায়ী বকিঙহম প্রাসাদ ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের পরিচ্ছদ ধারণ করেন। কিন্তু প্রতি বসন্তে একই বর্ণনা, প্রতি শিশিরে একই সর্ষপবর্ণ– অর্থাৎ নুন-হলদে না, একই বর্ণ না, একই বর্ণনা করা চলবে না।
প্রতি ঋতুর সমারম্ভে আমাদের একটি গুহ্যতম– টপমোস্ট সিরিট সভা বসে আসছে ঋতুর বর্ণ স্থির করার জন্য। যে বর্ণ স্থির করা হল, সেটা অত্যন্ত গোপনে রাখতে হয়। নইলে রাস্তার যেদো-মেধো সেই রঙের স্যুট পরে যত্রতত্র ঘোঁতঘোঁত করে ঘুরে বেড়াবে। তা হলে ডুক অব এডেনবরা যখন অ্যাসকটে নামবেন– না, সেখানে হাঙ্গামা কম, প্রশ্ন শুধু ওয়েসকিট নিয়ে–
