সে যুগে ঔপন্যাসিক ছাড়া অন্য কোনও রূপে র আত্মপ্রকাশ করেছেন কি না, সে সম্বন্ধে আমরা কোনও কৌতূহল প্রকাশ করিনি।
অথচ ইয়োরোপের ভাবুকজন মাত্রই রলাঁকে চেনেন আরও অন্য একটি রূপে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার বহু আগের থেকেই রলা ইয়োরোপে ক্রমবর্ধমান উকট জাতীয়তাবাদ (শভিনিজম) যে ভিন্ন ভিন্ন দেশকে অবশ্যম্ভাবী প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সে সম্বন্ধে সচেতন হয়ে যান এবং দেশবাসী ফরাসি তথা জরমনদের (রলা ছিলেন জরমন সঙ্গীতের আবাল্য একনিষ্ঠ ভক্ত) এ বিষয়ে নিরবচ্ছিন্ন সাবধানবাণী শোনান। বলা বাহুল্য, এহেন পরিস্থিতিতেও সর্বত্র, সর্বকালে যা হয়ে থাকে, তাই হল। উভয় দেশই তাঁকে আপন আপন শত্রু বলে ধরে নিল।
বিশ্বযুদ্ধ লাগার সময় রলাঁ ছিলেন সুইজারল্যান্ডে। তিনি রেডক্রসে যোগ দিলেন এবং দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, প্রায় সমস্ত যুদ্ধকালটা ফ্রান্সের উদগ্র শভিনিজমের বিরুদ্ধে দৈনিকে মাসিকে প্রচার-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে লাগলেন। যুদ্ধশেষের সময় ভগ্নোৎসাহ ক্লান্ত রলা খুঁজলেন শান্তির সন্ধান। ডুব দিলেন তাঁর স্বদেশের শত্রু জরমন জাতের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীতসৃষ্টিকার বেটোফেনের সঙ্গীতের আরও গভীরে। বেটোফেন জরমন হয়েও জরমনদের বহু উর্ধ্বে– তাঁর সঙ্গীত মানুষকে তুলে নিয়ে যায় নভঃলোকে, যেখানে ক্ষুদ্র-নীচ শভিনিজম পৌঁছতে পারে না। একদা তিনি তারই মতো মহামানব কবি গ্যোটেকে বলেছিলেন, আপনি-আমি দেবদূত : আমাদের কাজ– মাটির মানুষকে স্বর্গলোকের দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া।(১)
রলাঁ যে বেটোফেনের আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেটাকে মডার্ন উন্নাসিক ইসকেপিজম, পলায়নী মনোবৃত্তি নাম দিয়ে সস্তায় কিস্তিমাত করবেন। কিন্তু ভুললে চলবে না, রল অবগাহন করতে নেমেছিলেন সুরগঙ্গায় ক্লান্ত দেহমন স্নিগ্ধ করে নিয়ে পুনরায় তার কর্তব্য-কর্মে মনোনিবেশ করার জন্য। তিনি গঙ্গা নদীর মীন হয়ে ইসকেপিজমের নদীগর্ভে বিলীন হতে চাননি।
***
আঁদ্রে জিদ-এর কপালে ছিল নিদারুণতর দুর্দৈব। তিনিও জাতি-ধর্ম-দেশের ঊর্ধ্বে বিরাজ করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে রলাঁ যেরকম আশু দুর্যোগের পূর্বাভাস সুস্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন তিনিও তেমনি পেয়েছিলেন দ্বিতীয়ের পূর্বাভাস। যুদ্ধ লাগার পর তাঁকে যখন বেতারে প্রোপাগান্ডা করতে বলা হল, তিনি অসম্মতি জানালেন। দেশকে ভালোবাসতেন রলাঁ, জিদ উভয়েই, কিন্তু যে স্থূল পদ্ধতিতে অশ্রাব্য কটু ভাষণে যুদ্ধের সময় এক জাতি অন্য জাতিকে গালাগাল দেয়, স্পর্শকাতর বিশ্ব-নাগরিক এবং সর্বোপরি বিদগ্ধ কলাকার জিদ তার সঙ্গে সুর মেলাবেন কী করে! জিদ তার জ্বরনালে (রোজনামচাতে) লিখছেন, ন! দেসিদেম, জ্য ন্য পারলরে পা আ লা রাদিয়োনা, আমার স্থির সিদ্ধান্ত, আমি বেতারে বক্তৃতা দেব না।…খবরের কাগজগুলো এমনিতেই যথেষ্ট দেশপ্রেমের ঘেউ-ঘেউয়ে ভর্তি। নিজেকে যতই ফরাসি বলে অনুভব করি ততই আমার ঘেন্না করে। এর পর জিদ বড় সুন্দর করে বলেছেন; তিনি নিজেকে যেভাবে ফরাসি মনে করে গর্ব অনুভব করেন, এই স্কুল পদ্ধতির সঙ্গে তো তার কোনও মিল নেই।
জিদের স্মরণে এল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার সময়কার কথা। তখন কিছু লোক এমনই হাস্যকর প্রচারকার্য আরম্ভ করে যে, তখনকার দিনের অন্যতম খ্যাতনামা লেখক সিআঁ জাক্ বলেন, চুপ করে থাকাটা কি তবে এমনই কঠিন? সে ক্ সি দিফিসিল দ্য স্য ত্যার?
তার পর জিদ বলছেন, কিন্তু হৃদয় যখন ফেটে পড়তে চায়, তখন নীরব থাকাটা যে বড়ই বেদনাময়। এটা স্বীকার করে তিনি শেষ করেছেন এই বলে, কিন্তু আমি তো চাইনে আজ এমন কিছু লিখতে, যার জন্য কাল আমাকে মাথা হেঁট করতে হয়!
এই সময় জিদ পড়ছেন জরমন কবি ও ঔপন্যাসিক আইসেনডরফের বই নিষ্কর্মা!
অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটে যেতে লাগল জিদের চোখের সম্মুখে। অবিশ্বাস্য মনে হল বিশ্বজনের কাছে যে, নেপোলিয়নের দেশ ফ্রান্স মাত্র পাঁচ-ছয় সপ্তাহের একতরফা যুদ্ধের পর– বস্তুত ফ্রান্স একবার মাত্রও পুরো জোর হামলা করতে পারেনি!–বিজয়ী জরমনির পদতলে লুষ্ঠিত হল।
জিদ বলছেন, শত্রু যখন প্রচণ্ড শক্তিশালী, তখন তার কাছে পরাজিত হওয়াতে নিশ্চয়ই কোনও লজ্জা নেই; এবং আমিও কোনও লজ্জা অনুভব করিনে। কিন্তু যখন ভাবি আমরা কী সব স্তোকবাক্যের ওপর নির্ভর করে কর্তব্যকর্ম অবহেলা করে পরাজয় ডেকে এনেছি তখন যে গভীর বেদনা অনুভব করি সেটা ভাষাতে প্রকাশ করতে পারিনে, অস্পষ্ট মূর্খ আদর্শবাদ, প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে মোহাচ্ছন্ন অপরিচয়, অপরিণামদর্শিতা, মূর্খের মতো অর্থহীন এমন সব বাগাড়ম্বরে অন্ধবিশ্বাস– যার মূল্য আছে শুধু অপোগরে কল্পরাজ্যে।
নিরঙ্কুশ পরাজয়ের পরের দিন জিদ লিখেছেন :
একমাত্র গ্যোটের সঙ্গে কথোপকথনই আমাকে দুশ্চিন্তার এই মৃত্যু-যন্ত্রণা থেকে কিঞ্চিৎ মুক্তি এনে দেয়
Seules les Conversations avec Goethe parviennent a distraire un peu ma pensee de Pangoisse.
পাঠক লক্ষ করবেন, গ্যোটের সঙ্গে কথোপকথন Conversation with Goethe (মূল জরমনে Gaspraeche mit Goethe in den letzten Jahren seines Lebens)
গ্যোটে সম্বন্ধে সর্বাপেক্ষা প্রামাণিক অত্যুত্তম জীবিত জীবনী লিখেছেন গ্যোটের সখা এবং শিষ্য একেরমান (অনেকটা শ্রীম)। কথোপকথন হয়েছে গ্যোটে এবং একেরমানে। অথচ জিদ ইচ্ছে করে এমনভাবে বাক্যটি রচনা করেছেন যে মনে হয় তিনি, জিদ-ই, যেমন স্বয়ং কথাবার্তা বলছেন জরমন মহাকবি ঋষি গ্যোটের সঙ্গে, ইঙ্গিত করছেন, তিনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন ঋষির বাণী, তার কণ্ঠস্বর। দুশ্চিন্তার বিভীষিকায় যেটুকু সান্ত্বনা তিনি আদৌ পাচ্ছেন সেটি তারই কাছে থেকে।
