অতএব স্থির হল, ওই জাতশত্রু ইজরাএলি ইহুদিদেরই কোনও মেয়ে বিয়ে কর। হাজার হোক, ওরা তো ইয়াহভে মানে, ধর্মগ্রন্থ পেনটাটয়েশ স্বীকার করে। খ্রিস্টান, মুসলমান তো আর বাড়িতে ভোলা যায় না।
ন্যাজরিথ যাবার পথে পড়ে স্যামারিটানদের নাবলুস; নিশ্চয়ই দেখে যেতে হবে। নিঃসন্দেহে যারা অন্তত তিন হাজার বছর ধরে ভিটের মাটি (ওহ! আর সে কী মাটি, বালি-পাথরে ভর্তি!) কামড়ে ধরে পড়ে আছে, তারা দ্রষ্টব্য বইকি।
***
সে আমলে প্যালেস্টাইনে চলত তিন রকমের বাস্। আরব বাস্, ইহুদি বাস্ আর স্টেট বাস্। কাটা ফালাইলেও ইহুদি চড়ত না আরবের বাস্ এবং ভাই ভাসা। দু দলেই চড়ত স্টেট বাস।
আত্মচিন্তায় নিমগ্ন আমার সামনে এসে হঠাৎ দাঁড়াল একখানি করকরে নতুন ট্যাকসি। আরব ড্রাইভারের পাশে দেখি গোটা পাঁচেক মেল-ব্যাগ। পিছনের সিটে জাব্বাজোব্বা পরা ইয়া মানমনোহর গলকম্বল দাড়িওলা দুই রাববি। এক রাববি পিছনের দরজা খুলে বার বার বলে যাচ্ছেন, উঠে পড়, উঠে পড়।
আমি ক্ষণে সালাম জানিয়ে, ক্ষণে জোড়-হাতে নমস্কার করে (এটা ভারতীয়দের পেটেন্ট মাল বিদেশি মাত্রই চেনে!), ক্ষণে ডান হাত বুকের বাঁ দিকের উপর রেখে ঝুঁকে ঝুঁকে ক্ষীণ কণ্ঠে বললাম, ট্যাকসিতে যাবার মতো কড়ি আমার গ্যাঁটে নেই। আমি যাব বাস-এ।
দুই রাববি যা বলেছিলেন– আহা কী সুন্দর অত্যুকৃষ্ট বিদগ্ধ নাগরিক আরবি ভাষাতে– তার তাৎপর্য কী উৎপাত, কী জ্বালাতন! উঠে পড়, উঠে পড়। আমরা কি কানা! দেখতে পাচ্ছিনে, তুমি ভিনদিশি? আমরা তো ট্যাসিটার সাকুল্যে পিছন দিকটা ভাড়া নিয়েছি। উঠে পড় উঠে পড়। কী মুশকিল! আড্ডা বাপু, তুমি বাস্-এ যে ভাড়া দিতে সে-ই না হয় আমাদের দেবে। (এই বেলা বলে নিই, পরে, বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সেটা তারা নেননি।
কিন্তু ইয়া আল্লা, বসি কোথায়! গোটা তিনেক মোরগামুরগি কাক-মাক করছে, দু-তিন ঝুড়ি আলু-টমাটো-মটরশুটি কপি, দুখালুই ডিম, আর কী কী ছিল খোদায় খবর।
রাববিরা বরাব্বর বলে যাচ্ছেন, হয়ে যাবে, হয়ে যাবে।
এক রাববি কুণ্ঠিত কণ্ঠে বললেন, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। তাই এতসব।
আমি চোখের তারা কপালে তুলে বললুম, বলেন কী মশাই! এই তিনটে আণ্ডা, গোটাকয়েক মুরগিতেই আপনাদের দেশে কন্যাপক্ষ খুশি হয়ে যায়! তাজ্জব! তাজ্জব!! আমাদের মোশয়, সিনাই পর্বত প্রমাণ মাল নিয়ে গেলেও হালাদের মুখে হাসি ফোটে না।
আমার জেবে একটা হাতির দাঁতের ডিম্বাকার নস্যির কৌটো ছিল। নস্যাভাবে সেটাতে রাখতুম মিশরীয় সুগন্ধি। সেইটা তুলে ধরলুম তাদের সামনে।
দুই রাববি আমাকে জাবড়ে ধরে চুমো খেতে লাগলেন।
বিস্তর কথাবার্তা হল। নাবলুস, ন্যাজরিথ গল্পের তোড়ে পেরিয়ে গিয়ে তখন পৌঁছে গিয়েছি গেলিলিয়ান লেক-এ।
দুই রাববি আমার মাথার উপর হাত রেখে বিস্তর মন্ত্র পড়ে গেলেন। তাদের আশীর্বাদের এক কণাও যদি সফল হয় তবে আমি ভারতবর্ষের রাজা হব।
————
১. পুণ্যনগরী জেরুস্লম যে ইহুদিদের একদিন ত্যাগ করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে হবে সেকথা এর প্রায় ৮০০ বছর পূর্বে ইহুদি প্রফেটরা বার বার ভবিষ্যদ্বাণী করে ইহুদিদের সাবধান করেছেন। তারা কান দেয়নি; আচার-আচরণ বদলায়নি। এই বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার নামই ডিসপারসেল, গ্রিক দিয়াসপরা।
২. ইংরেজ অ্যালেবি যখন জেরুসলমে প্রবেশ করেন তখন সে খবর একজন অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যকে দিলে পর সে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে বলে, তাই তো! প্রভু খ্রিস্টের জন্মকালে যেসব মেষপালককে দেবদূত সে সুসমাচার জানান, তাদের বংশধরদের একটু হুশিয়ার করে দিলে হয় না যে– ইংরেজ ভেড়ার পালে ঢুকেছে– মতলবটা ভালো নয়। শপ-লিফটার ইংরেজ শি-লিফটিঙেও যে কিছু কম যান না সে তত্ত্ব আউসি বিলক্ষণ জানত। তার হুশিয়ারি কিন্তু পরবর্তী যুগে টায় টায় ফলেনি। ইংরেজ যখন দেখল যে সে নেটিভদের সঙ্গে পেরে উঠবে না, তখন তাদের পিছনে ইহুদিদের লেলিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেল। আর ইহুদি যে শুধু ভেড়াগুলো মেরে দিল তাই নয়, নেটিভদের জর্ডনের হে-পারে (আমরা যেরকম বলি পদ্মার হে-পারে) খেদিয়ে দিল। ৩. এ জায়গাটা ছিল জরডন এলাকায়। হালে ইজরাএল বাহিনী সেখানে পৌঁছে গেরিজিম মন্দিরের ভগ্নাবশেষের উপর ইজরাএলের জাতীয় পতাকা তুলতে গেলে স্যামারিটানদের সঙ্গে হাতাহাতির উপক্রম হয়। পরধর্ম বাবদে ইহুদিরা ঈষৎ অসহিষ্ণু এ তত্ত্বটি ইংরেজ জানত বলেই ইজরাএল রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় (১৯৪৮) তারা খ্রিস্ট-মুসলিম গির্জা মসজিদে ভর্তি প্রাচীন জেরুস্লম (ইহুদিদের বিশেষ কোনও স্থাপত্য এ শহরে আজ আর নেই, কারণ রাজা হাদরিয়ান শব্দার্থে এ নগরের উপর হাল চালিয়েছিলেন এবং ওই সময়ই ইহুদিকুল শেষবারের মতো জেরুস্লম পরিত্যাগ করে বলে পরবর্তী যুগে কিছু নির্মাণ করার সুযোগ পায়নি)। ইজরাএলের শত মিনতিভরা কাতর রোদনে কর্ণপাত না করে মুসলমান জর্ডনরাজকে দিয়ে দেন। হালের যুদ্ধের ফলস্বরূপ ইজরাএল যখন প্রাচীন জেরুস্লম অধিকার করে তখন এ যুগের ইংরেজ লেবার (অর্থাৎ ঐতিহ্যহীন অনভিজ্ঞ) সরকার কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। কিন্তু স্যামারিটানদের মন্দিরে ইজরাএলের ব্যভিচারের খবর ইংল্যন্ডে পৌঁছনো মাত্রই লেবার-বাবুদের কানে জল গেছে। নিরাপত্তা পরিষদে চিৎকার করে ইংরেজের ফরিনমন্ত্রী ব্রাউন একাধিকবার বলেছেন, ইহুদিকে প্রাচীন জেরুস্লম ছেড়ে দিতেই হবে। এই প্রাচীন নগরীর ভিতরে রয়েছে খ্রিস্টের বিরাট সত্যই অতি বিরাট সমাধি। সৌধ (হোলি সেপালকর), গেৎসিমেনের বাগান যেখানে প্রভু যিশুর দেহ থেকে স্বেদের পরিবর্তে রক্ত বেরোয়, মাউন্ট অলিভ এবং ভিয়া দলরসা যে পথ দিয়ে প্রভু ক্রুশ বহন করে বধ্যভূমিতে পৌঁছন। (মুসলমানদের হরমশরিফ, মসজিদ-উল-আকসা বাদ দিচ্ছি– এগুলোর জন্য ইংরেজের কোনও দরদ না থাকাই স্বাভাবিক)। ইজরাএলের সাতিশয় বিবেচক করুণ করে এগুলো সঁপে দিতে ব্রাউন হিম্মত পাচ্ছেন না। কিসের হাতে যেন কী সমর্পণ!
দুঃখ তব যন্ত্রণায়
আমাদের কৈশোরে রমা রলাঁ ছিলেন অতিশয় জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। বস্তুত এমনও একটা সময় গিয়েছে, যখন বাঙলা দেশে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় উপন্যাস বলতে রল্যার জ্যা ক্রিতই বোঝাত।
