হফমান বুঝতে পারেননি, কিংবা বলতে ভুলে গেছেন– সেটা পরবর্তী যুগের সহচরগণ বার বার উল্লেখ করেছেন– হিটলার ঝাণ্ডু ঝাণ্ড সুপকুতম রাজনৈতিকদের পেটের কথা টেনে বের করার কৌশলটিতে সুপটু ছিলেন। আর এ তো চিংড়ি ভাগনি! হয়তো মামা তার প্রেম নিবেদন করার পূর্বেই আবেগ-বিহ্বল তরুণী মামার সহানুভূতি এবং আনুকূল্য পাবার আশায় পূর্বাহেই সবকিছু বলে বসে আছে। কিংবা হয়তো হিটলার যখন লক্ষ করলেন, গেলি তার প্রেমের উপযুক্ত প্রতিদান দিচ্ছে না তখন সেটা চেপে দিয়ে আঁকশি চালিয়ে বের করলেন গেলির পেটের কথা– বরঞ্চ বলা উচিত হৃদয়ের ব্যথা। এবং তারই-বা কী প্রয়োজন? সেই ১৯৩১ সালেই তাঁর পার্টির অসংখ্য স্পাই ছিল ভিয়েনায়– যে নগরে তিনি নিজে যৌবনের একাংশ রাস্তায় রাস্তায় স্বহস্তে অঙ্কিত পিকচার পোস্টকার্ড ফেরি করেছেন– নইলে ১৯৩৪-এ, এ ঘটনার মাত্র আড়াই বছর পরে তিনি তাঁর পার্টির লোকের দ্বারা ভিয়েনা শহরের জনসমাগমে পরিপূর্ণ দফতরে অস্ট্রিয়ান প্রধানমন্ত্রী ডলফুসকে খুন করলেন কী প্রকারে? এবং তার চার বছর পরে একটিমাত্র গুলি না চালিয়ে ভিয়েনা দখল করলেন কী কৌশলে? তার তুলনায় একটি সাদামাটা ছাত্রী ভিয়েনাতে কীভাবে জীবন-যাপন করেছিল সেটা বের করা তো অতি সহজ। ভিয়েনাতে সে-যুগে বিস্তর প্রাইভেট ডিটেকটিভও ছিল।
আমার মনে হয় বিশ্বাস করুন আর নাই করুন–বুদ্ধিমতী গেলি তার মামার চরিত্রের একটি দিক আবিষ্কার করতে পেরেছিল তখনই, যেটি বিশ্বমানব আবিষ্কার করে স্তম্ভিত হল পুরো পনেরোটি বছর পরে, এবং তা-ও সম্ভব হত না, যদি যুদ্ধে হিটলার পরাজিত না হতেন এবং ফলে গ্যাসচেম্বার ইত্যাদি আবিষ্কৃত না হত। সে তত্ত্বটি হিটলার কী অবর্ণনীয়, নিষ্ঠুর দানব!– এই তত্ত্বটি গেলি আবিষ্কার করে এক বিভীষিকার সম্মুখীন হল। হিটলার যে কোনও মুহূর্তে, কারও সুখদুঃখের কথা মুহূর্তমাত্র চিন্তা না করে তার দয়িতকে নিষ্ঠুরতম পদ্ধতিতে খুন করাতে পারেন। আজ যদি কেউ বলে, এই ভয় দেখিয়েই ব্ল্যাকমেল করে হিটলার গেলিকে ১৯২৭ থেকে ১৯৩১ পর্যন্ত তার মুনিকের বাড়িতে— আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন কিন্তু বস্তুত পরাধীনের চেয়েও পরাধীনভাবে আটকে রেখেছিলেন তবে সেটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য মনে হবে কেন? এবং হয়তো ওই চার বছর ধরে তাকে বাধ্য হয়ে রক্ষিতার লীলাখেলাও খেলতে হয়েছিল। হফমান বলেছেন, গেলির চরিত্রবল ছিল দৃঢ় এবং সে ছিল স্পিরিটেড গার্ল। মুনিক থেকে অস্ট্রিয়ার পথ কতখানি? আর বেৰ্ষটেশগাডেনের বাড়ি থেকে তো অস্ট্রিয়ান সীমান্ত আরও কাছে। পায়ে হেঁটে ওপারে যাওয়া যায়। বস্তুত হিটলার সেই কারণেই বেছে বেছে ওই জায়গাটিতেই বাড়ি কিনেছিলেন। এ-পারে, অর্থাৎ জর্মনিতে রাজনৈতিক বাতাবরণ বড় বেশি উষ্ণ হয়ে পড়লে, কাউকে না জানিয়ে, বনের ভেতর দিয়ে অক্লেশে ওপারে যেতে পারবেন বলে– অঞ্চলটাও অস্বাভাবিক নির্জন এবং ওই যুগে পাসপোর্টের কড়াকড়ি তো ছিলই না, এ-সব জায়গায় যারা নিত্য নিত্য ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে এপার-ওপার করত তাদের তো পাসপোর্ট আদৌ থাকত না।
এমন অবস্থায়ও স্পিরিটেড গেলি গ্রামে থাকাকালীন ওপারে চলে গিয়ে ভিয়েনা যেতে পারল না?– সেখান থেকেও ভিয়েনা তো রেলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ। না, তা নয়! অমতে যাওয়ার মানেই হত, দয়িতের অবশ্যমৃত্যু। এবং পরে সে নিজেও হয়তো কিডন্যাপড় হতে পারত। তাই সে আপন কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে বলেছিল, হফমানের স্ত্রীকে : Well thats that! And theres nothing you or I can do about it. So lets talk about something else এ কথোপকথনের উল্লেখ আমি পূর্বেই করেছি।
হয়তো আমার নিছক কল্পনা! কিন্তু আমার মনে হয় গেলি দিনের পর দিন অভিনয় করে গেছে (যেটা হন ঠিক ধরতে পেরেছিলেন, কিন্তু পুৎসি বুঝতে না পেরে ঢলাঢলি বলেছেন) যদি শেষ পর্যন্ত মামার মন গলানো যায়, যখন দেখল কোনও ভরসাই নেই তখন করেছিল শ্মশান-চিকিৎসা পুরোপুরি ঝগড়া, যেটা একাধিক প্রতিবেশী শুনতে পেয়েছিল, এবং হয়তো-বা হয়তো-বা আত্মহত্যার ভয়ও দেখিয়েছিল, এবং হয়তো তার চোখে-মুখে তখন এমন ভাব ফুটে উঠেছিল যে চতুর–শঠ– হিটলার বুঝেছিলেন, এ ভয় দেখানোটা নিতান্ত শূন্যগর্ভ নয়, এটা আর পাঁচটা হিস্টেরিক (এবং হফমান বলেছেন, গেলি আদপেই হিস্টেরিক ছিল না) মেয়ের মতো নিতান্ত অর্থহীন প্রলাপ নয়। তাই বোধহয় মনিক শহর থেকে বেরোবার সময় সখাকে বলেছিলেন, কেন জানিনে আমার মনটা যেন অস্বস্তিতে ভরে উঠেছে, I dont know why, but I have a most uneasy feeling তাই তার পরবর্তী বিষণ্ণতা। পথিমধ্যে টেলিফোনের কথা শুনেই যেন বুঝতে পেরেছিলেন, এ টেলিফোনে থাকবে গেলি সম্বন্ধে দুঃসংবাদ।
এ অনুমান যদি সত্য হয় তবে বলতে হবে গেলি যে ভয় দেখিয়েছিল সেটা শূন্যগর্ভ, ফাঁকা আওয়াজ ছিল না। সে সেটা কাজে পরিণত করেছিল প্রথমতম সুযোগেই।
————
১. এই ভারতের অন্ধ্র অঞ্চলে হিন্দু সমাজে আপন সহোদরা ভগ্নীর মেয়েকে বিয়ে করা খুবই স্বাভাবিক ও নিত্য নিত্য হয়। বস্তুত প্রথমেই মামাকে কন্যাদানের প্রস্তাব করতে হয়– যেন ন্যায্য হক তারই। সে রাজি না হলে অন্যত্র তার বিয়ে হয়।
