আমি তখন মুনিকে বাস না করলেও জর্মনিতে, এবং প্রতিদিন লাঞ্চ টেবিলে বন্ধুদের আলোচনা, কথা-কাটাকাটি শ্রবণই ছিল আমার পক্ষে যথেষ্ট। আমাদের রিডিং রুম স্যুনিক তথা জর্মনের সব বড় বড় শহরের প্রধান প্রধান খবরের কাগজ রাখত, তদুপরি আমাদের কেউ না কেউ মুনিক আসা-যাওয়া করছে, আর একজন তো খাস মনিকবাসী– সে শহরের বিরাট ম্যাপ খুলে হিটলারের বাড়ি, তিনি যে যে কাফেতে যান, সবগুলো পিন্ ডাউন করতে পারত, কাজেই আমাদের লাঞ্চ টেবিলে গুজবেরও অনটন ছিল না। কিন্তু এটাও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক যে এতদিন পরে আজ আমি তার অধিকাংশই ভুলে গিয়েছি। তবে, ঘটনার প্রায় কুড়ি বছর পর থেকে যখন হিটলার সম্বন্ধে নানাপ্রকারের পুস্তক বেরুতে আরম্ভ করল (গেলি আত্মহত্যা করে ১৯৩১-এ; হিন্ডেনবুর্গ হিটলারকে ডেকে পাঠান তার তিন সপ্তাহ পরে এবং আলাপচারী যে নিষ্ফল হয় তার একমাত্র কারণস্বরূপ নাৎসিরা বলেন, হিটলার গেলির মৃত্যুশোক তখনও সম্পূর্ণ সামলে উঠতে পারেননি বলে সমস্ত চিন্তাশক্তি একাগ্রচিত্তে ব্যবহার করতে পারেননি– ঘন ঘন আনমনা হচ্ছিলেন; ১৯৩৩-এর জানুয়ারি মাসে হিটলার চ্যানসেলর হন, ১৯৩৯-এ তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ করেন, ৩০ এপ্রিল ১৯৪৫-এ তিনি আত্মহত্যা করেন, ইংরেজিতে প্রচলিত অ্যালন বুলক লিখিত ওই ভাষায় হিটলারের স্ট্যান্ডার্ড জীবনী বেরোয় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে, হানের ১৯৫৪-৫৫ খ্রিস্টাব্দে, এবং অধুনা– ১৯৬১–প্রকাশিত শাইরারের ১১৭৪ পৃষ্ঠার যে বিরাট বই বাজারে নাম করেছে তাতে কোনও মৌলিকতা নেই এবং আমার মনে হয় তিনি হফমানের বইখানা হয় পড়েননি, নয় একপেশে বলে খারিজ করেছেন। বলা বাহুল্য বুলক, শাইরার এবং শতকরা ৯০ খানা বই রাজনৈতিক তথা যুদ্ধবিদ হিটলারকে নিয়ে আলোচনা করে বলে তার মধ্যে প্রেম অল্পই স্থান পায়, এবং তারও অধিকাংশ পান এফা ব্রাউন, গেলি সত্যিই এখনও কাব্যের উপেক্ষিতা!) তখন দেখে বড় আশ্চর্য বোধ হল যে তখনকার দিনে যেসব গুজব আমরা সে গাঁজা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলুম তার অনেকগুলোই এসব পুস্তকে রীতিমতো সম্মানের আসন পেয়েছে, এবং যেগুলোকে আমরা সত্য বা সত্যের নিকটতম বলে স্বীকার করে নিয়েছিলুম সেগুলোর উল্লেখ পর্যন্ত নেই!
অবশ্য এ-কথা উঠতে পারে যে, হফমানের মতে হিটলার গেলির আত্মহত্যার জন্য নিতান্ত পরোক্ষভাবে দায়ী, আদৌ যদি তাঁকে দায়ী করা হয়, তিনি গেলিকে কড়া শাসনে রাখতেন (হিটলারের সাফাই আজ গেলি যেটাকে বন্ধন বলে মনে করছে সেটা বিচক্ষণ আত্মজনের সুচিন্তিত সতর্কতা) আবার ওদিকে বলেছেন, গেলি ছিল হিস্টিরিয়াগ্রস্ত, সদাই আত্মহত্যার জন্য মুখিয়ে থাকা টাইপের একদম খাঁটি উল্টোটি। তার প্রকৃতি ছিল বেপরোয়া, জীবনের মুখোমুখি হত সে প্রতিদিন নিত্যনতুন সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসব ভাবলে তো কিছুতেই বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হয় না যে সে আপন জীবন আপন হাতে নিতে নিজেকে বাধ্য অনুভব করল।
হফমানকৃত তাঁর সখা হিটলারের জীবনী হয়তো অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখবেন, ভাববেন, রাজনৈতিক এবং গ্যাস-চেম্বারের প্রবর্তন ও সফলীকরণ কর্তা হিটলারকে তিনি সমর্থন করতে না পেরে অবশ্য এটা সবাই স্বীকার করেছেন যে আর্ট ভিন্ন অন্য কোনও বিষয় নিয়ে তিনি অতি দৈবেসৈবে হিটলারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং আরও সত্য যে হিটলার, বিশেষ করে গ্যোবেলুসের শত চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি ডাঙরতম সরকারি চাকরি বা পার্টিতে কোনও গণ্যমান্য আসন নিতে নারাজের চেয়ে নারাজ সম্পূর্ণ নারাজ ছিলেন, অতএব রাজনৈতিক হিটলারকে দোষী বা নির্দোষী প্রমাণ করার হাত থেকে তিনি (সানন্দে) অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি মানুষ হিটলারকে অযথা অপবাদ থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এ নেমকহালালি প্রশংসনীয়, কিন্তু সে কর্ম করতে গিয়ে তিনি কতখানি সত্যবাচন করেছেন সেটা অনেকের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করবে।
আমি তাকে মোটামুটি বিশ্বাস করেছি, এবং দৈনন্দিন জীবনে হিটলার যেখানে ছোট লোক সেখানে পুৎসি হানস্টেঙেলের হিটলারের বিরুদ্ধে ভার বহুস্থলে অহেতুক বিষোদ্গার সত্ত্বেও অনেক কথা মেনে নিয়েছি।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে আমার মনে হয়েছিল এখনও মনে হয়, হিটলার জানতেন এবং ভালো করেই জানতেন যে গেলি ভিয়েনার এক আর্টিস্টকে গভীরভাবে ভালোবাসত (আমার মনে হয়, হান যে বলেছেন, হিটলার সে-খবরটি জানতেন না, এটা তার ভুল এবং গেলির ভিয়েনা যাবার জন্য উৎসাহ এবং মামাকে পীড়াপীড়ি সেখানে যাবার অনুমতির জন্য)–এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই যে গেলি বরাবরই মনিকের রাজসিক বাসভবন, অতি সাধারণ মেয়ের সমাজে সর্বোচ্চ আসন, মুনিকের সর্বজন সম্মানিত মামার গরবে গরবিনী হওয়া, সেই গ্রেট মামার প্রেমনিবেদন তারই পদপ্রান্তে, সে মামা আবার তার কথায় উঠ-বস করেন, সর্বোত্তম থিয়েটার-অপেরায় সর্বশ্রেষ্ঠ আসনাধিকার, এক কথায় বলতে গেলে মুনিকের মতো সুখৈশ্বর্য, সর্বপ্রকারের বিলাস, চিত্তহারিণী আমোদ-প্রমোদ দিতে সক্ষম এসব ছেড়ে ভিয়েনাতে তাকে থাকতে হত সাধারণ অবশ্য অপেক্ষাকৃত বিত্তশালিনী– ছাত্রীর মতো। এ দুয়ের আসমান-জমিন ফারাক। শুধু সঙ্গীতে পারদর্শিনী হওয়ার জন্য এত বড় সুখসম্মান বিসর্জন? আমার বিশ্বাস হয় না। পুৎসি যখন কটুবাক্য ব্যবহার করে বলেন, মেয়েটা পয়লা নম্বরের ফুর্তিবাজ ফ্লার্ট, কণ্ঠসঙ্গীত উচ্চতম পদ্ধতিতে আয়ত্ত করতে হলে যে অধ্যবসায় ও ফুর্তিফার্তি বিসর্জন অবশ্য প্রয়োজনীয় সে-দুটো গেলির ছিল কোথায়? তখন আমার মনে হয় গেলির মন পড়ে থাকত ভিয়েনায় যেখানে সে অধ্যবসায়ের সঙ্গে রেওয়াজ করবে, ও সন্ধ্যায় পাবে তার আর্টিস্ট দয়িতের কাছে অনুপ্রেরণা, যদি সেখানে দৈন্যেও বাস করতে হয়, সেটা সে ভাগাভাগি করবে তারই সঙ্গে; তার তুলনায় মুনিকে মামার সঙ্গে বাস করে, মনে মনে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ থেকে উৎকৃষ্টতম বিলাসভোগ শতগুণে নিকৃষ্ট। ভিয়েনার ছাত্রজীবনের স্বাধীনতা, তরুণ-তরুণীর সঙ্গে সম্মিলিত আনন্দোল্লাস নিশ্চয়ই মুনিকের বন্দিশালা এবং প্রতি সন্ধ্যায় কাফেতে মামা এবং তার বুড়োহাবড়া ভারিক্কি-ভারিক্কি রাজনৈতিক পার্টিমেম্বারদের সঙ্গে প্রসন্নতা এমনকি উল্লাসের ভান করার চেয়ে শতগুণে শ্রেয়, কিন্তু সেইটেই তত্ত্বকথা নয়–তত্ত্বকথা ওই দয়িতের সঙ্গসুখ। সঙ্গীতই যদি বড় কথা হবে তবে অ্যানিক অজপাড়াগা? মুনিকে ঠিক সে সময়ে হয়তো কোনও মেস্ত্রো ওস্তাদের ওস্তাদ ছিলেন না, কিন্তু গেলি যে ভিয়েনাতে কোনও মেস্ত্রোর কাছে সঙ্গীতাধ্যয়ন করেছিল এ কথা তো কেউ বলেনি। না, সঙ্গীত তার শেষ বচসার এবং সর্বশেষে নিরুপায় হয়ে আত্মহত্যার কারণ নয়।
