এই ব্যথাটা অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত নয়, কারণ গেলির মৃত্যুর পর তার ঘরে ভিয়েনার শুরুর উদ্দেশ্যে তার লেখা একখানা অর্ধসমাপ্ত চিঠি পাওয়া যায়। সেটাতে সে গুরুকে জানাচ্ছে, সে আবার ভিয়েনায় এসে তার কাছে কণ্ঠসঙ্গীত শিখতে চায়।
ফ্রাই ভিনটার আরও বললেন যে, মিত্রসহ হিটলার চলে যাওয়ার পর গেলি তাঁকে বলে যে সে এক বন্ধুর (বা বান্ধবীর সঙ্গে সিনেমায় যাচ্ছে, এবং তার জন্য যেন রাত্রের কোনও খাবার তৈরি না করা হয়। সে রাত্রে তিনি তাই গেলিকে আবার দেখতে না পেয়ে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা করেননি। গেলি ব্রেকফাস্ট খেত ভোরেই, এবং সে যখন তার অভ্যাসমতো ওই সময়ে ব্রেকফাস্ট করতে এল না, তখন ফ্রাউ ভিনটার তার ঘরে গিয়ে টোকা দিলেন। কোনও উত্তর না পেয়ে তিনি চাবির ফুটো দিয়ে ভিতরের দিকে তাকাবার চেষ্টা দিলেন, কিন্তু চাবি ফুটোতে লাগানো এবং ঘর ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে তিনি স্বামীকে ডাকেন। তিনি দরজা ভেঙে যখন ভেতরে ঢুকলেন, তখন সম্মুখে ভয়ানক দৃশ্য। গেলি একডোবা রক্তে পড়ে শুয়ে আছে, আর পিস্তলটা সোফার এক কোণে। ফ্রাউ ভিনটার তৎক্ষণাৎ গেলির মাকে খবর দেন, এবং হেস পার্টির কোষাধ্যক্ষ শ্বাসকে জানান।
অনেকেই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু হফমানের আত্মচিন্তা এস্থলে বিশেষ মূল্য ধরে। তিনি বলছেন, হিটলার কি গেলির আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ জানতেন? তিনি যে শহর ছাড়ার সময় বলেছিলেন, কেন জানিনে, আমার মনটা যেন অস্বস্তিতে ভরে উঠেছে সেটা কি ইন্দ্রিয়াতীত কোনও অনুভূতিসঞ্জাত অস্বস্তিবোধ, অথবা কি গেলির কাছ থেকে শেষ বিদায় নেবার সময় এমন কিছু একটা ছিল যেটা তার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল?
তার চেয়ে যে জিনিস হফমানের কাছে একেবারেই দুর্বোধ্য ঠেকেছিল সেটা এই : ফ্রাউ ভিনটার বলেন, হিটলার এবং তিনি চলে যাওয়ার পর গেলি অত্যন্ত বিষণভাবে নুয়ে পড়ে। এ তথ্যটা বুঝতে তার কোনও অসুবিধা হল না, কিন্তু তার পর ফ্রাউ ভিনটার যা বললেন সেটা তার বিচার-বিবেচনাকে দিল একদম ঘুলিয়ে। ফ্রাই ভিনটার বার বার জোর দিয়ে বললেন, গেলি হিটলার একমাত্র হিটলারকেই ভালোবাসত; বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা, গেলির বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকিটাকি মন্তব্য ফ্রাউ ভিনটারকে দৃঢ়নিশ্চয় করেছিল, হিটলারকেই গেলি ভালোবাসে। হফমান বলছেন, কিন্তু আমার যতদূর জানা এবং ভালো করেই জানা, গেলি ভালোবাসত অন্য একজনকে।
এর সঙ্গে তা হলে আরেকটি তথ্য জুড়তে হয়, হফমানের ফোটো-কর্মশালায় তার কিছুদিন পূর্বে হিটলার শ্রীমতী এফা ব্রাউনের সঙ্গে পরিচিত হন(৫) যে এফাঁকে তিনি মৃত্যুর অল্প পূর্বে বিয়ে করেন, এবং হফমানের মতে তাঁদের বন্ধুত্ব নিবিড়তর হয় বেশ কিছুকাল পরে এবং গেলি মামাকে লেখা এফার একখানা চিঠি দৈবযোগে মামার কোটের পকেটে পেয়ে যায়। তা হলে বলতে হবে ফ্রাউ ভিটারের রহস্য সমাধান হয়তো সম্পূর্ণ ভুল না-ও হতে পারে।
একটা কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যদিও সেটা পরের এবং অনেক দিন ধরে চলেছিল। গেলির মা এমনিতেই এফা ব্রাউনকে পছন্দ করতেন না, এবং গেলির মৃত্যুর পর সে অপছন্দ পরিপূর্ণ ঘৃণায় গিয়ে পৌঁছল। হফমান এবং অন্যান্যরা তাঁকে যতই বোঝাবার চেষ্টা করতেন তিনি ততই অকুণ্ঠ ভাষায় জোর দিয়ে বলতেন, তাঁর মনে কণামাত্র দ্বিধা নেই যে, তাঁর মেয়ে হিটলারকেই ভালোবাসত এবং ওই এফা ব্রাউনের অস্তিত্ব ও হিটলারের ওপর তার প্রভাব গেলিকে গভীরতম নৈরাশ্যে নিমজ্জিত করে দেয়, এবং এইটেই গেলির অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধানতম কারণ।
***
এদেশে জোরালো গোটা দু-ত্তিন দল এবং তাদের বেপরোয়া আপন আপন দৈনিক নেই বলে বহু কেলেঙ্কারি-কেচ্ছা অনায়াসে চাপা পড়ে। ইয়োরোপের অধিকাংশ দেশে অবস্থাটা ভিন্ন প্রকারের। বিশেষত ভাইমার রিপাবলিক যুগে এই খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দশকে, হিটলার চ্যানসেলার না হওয়া পর্যন্ত (১৯৩৩) জর্মনির খবরের কাগজে কাগজে নরক ছিল গুলজার, বিশেষত জর্মনরা যখন ইংরেজি খবরওয়ালাদের চোরে চোরে মাসতুতো ভাই থিক্স এগ্রিমেন্টে আদৌ বিশ্বাস করে না। তাই মুনিকের খবরের কাগজগুলোর ওপর গেলির অস্বাভাবিক মৃত্যু যেন মৌচাকের উপর ঢিলের মতো হয়ে এসে পড়ল। আর কাফে কাফে বারেতে বারেতে গুজবগুঞ্জরণের তো কথাই নেই। এমনকি নাৎসি পার্টির ভেতরও নানা মুনি নানা মত দিতে লাগলেন। যারা সরাসরি দুশমন তাদের এক দল বেশ জোর গলায় বলল, নাৎসি পার্টি তার প্রভাব ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে অটপসি আদৌ করাতে দেয়নি, করোনারের সামনে যা-কিছু ঘটেছে তার সমস্তটাই আগাগোড়া থাচ্ছো কেলাসি থিয়েডারের ফার্স, এবং এক দল বলল, তাই হবে, কারণ এটা আত্মহত্যা নয়, আসলে খুন, এবং খুনি স্বয়ং হিটলার। তিনি হামবুর্গ পানে রওনা হয়েছিলেন সত্য কিন্তু সেটা ছিল ফাঁদ পাতার মতো। সন্ধ্যার সময় ফের বাড়ি ফিরে আসেন, এবং গেলিকে অন্য পুরুষের সঙ্গে এমন অবস্থায় পান যে, তখন হিটলারের মতো হিংস্র প্রাণীর মাথায় যে খুন চাপবে তাতে আর বিচিত্র কী? অন্য দলের বক্তব্য, না, পরপুরুষ ছিল না, শুধু গেলির ভিয়েনা যাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে কথা-কাটাকাটি এমনই চরমে পৌঁছয় যে হিটলার আত্মকর্তৃত্ব সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন এবং উন্মাদ অবস্থায় গেলিকে খুন করেন। আবার কেউ কেউ বললেন, না, খুন করেছেন হিমলার। পার্টির মুরুব্বিরা যখন দেখলেন যে হিটলারের খোলাখুলি বেলেল্লাপনার ঠেলায় পার্টির ইজ্জৎ যায়-যায় ( যদিও আমি যতদূর জানি জনসমাজে গেলির সঙ্গে হিটলারের আচরণ ছিল ভদ্র, সংযত, ইংরেজিতে যাকে বলে করেকটু; অন্যপক্ষের বক্তব্য আমরা যদি মিনিমাটাও নিই সেটাও যথেষ্ট খারাপ, কারণ এ-কথা তো আর মিথ্যে নয় যে তুমি মেয়েটাকে ভালোবাস এবং তাকে নিয়ে একই বাড়িতে বাস কর, আর তার মাকে রেখেছ দূরে গাঁয়ের বাড়িতে যখন তুমি তাকেও অনায়াসে এখানেই রাখতে পারতে–), ওদিকে হিটলার ছাড়া যে পার্টি দু দিনেই কাত হয়ে যাবে সেটাও অবিসংবাদিত সত্য, তখন তারা পার্টি বাঁচাবার জন্য হিমলারের ওপর গেলিকে সরাবার ভার দিলেন। কর্মটি করেছেন হয় স্বয়ং তিনি বা তার কোনও গুণ্ডাকে দিয়ে (পার্টিতে যে গুণ্ডার অভাব ছিল না সে তথ্যটি সবাই জানতেন, এবং না থাকলে নাৎসি পার্টি যে রাস্তায় কম্যুনিস্টদের ঠেলায় একদিনও টিকতে পারত না সেটা আরও সত্য)। ইত্যাকার নানাপ্রকারের গুজবে তখন জর্মনি ম-ম করছে, কারণ গেলির মৃত্যুর পূর্বেই নাৎসি পার্টি এমনই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে রাস্তার উপর কারণে-অকারণে যাকে-তাকে চ্যালেঞ্জ করে, এবং কমুনিস্টদের কাউকে একা পেলে তাকে পেটাতেও কসুর করে না; প্রতিদিন আবার কানে আসছে, এই বুঝি প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবুর্গ নাৎসি নেতা হিটলারকে ডেকে পাঠাবেন, হয় আপন মন্ত্রিসভা গড়ে প্রধানমন্ত্রী-চ্যানসেলর হতে, কিংবা কোয়ালিশন সরকার নির্মাণ করতে।
