গাড়ি ভালো করে থামতে না থামতেই হিটলার লাফ দিয়ে মোটর থেকে বেরিয়ে ছুটে ঢুকলেন হোটেলের ভেতর, এবং তার পর টেলিফোনের বাক্সে (বুথে বুথের দরজা পর্যন্ত তিনি বন্ধ করেননি। পিছনে পিছনে ছুটে এসেছেন হন এবং টেলিফোন বুথের দরজা খোলা বলে হিটলারের প্রত্যেকটি শব্দ শুনতে পেলেন।
এখানে হিটলার– কী হয়েছে? উত্তেজনায় হিটলারের গলা খসখসে কর্কশ হয়ে গিয়েছে। হে ভগবান! এ কী ভয়ঙ্কর! অপর প্রান্ত থেকে কী একটা খবর শুনে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, এবং তাঁর কণ্ঠস্বরে পরিপূর্ণ হতাশা। তার পর দৃঢ়তর কণ্ঠে বলতে লাগলেন, এবং সে কণ্ঠস্বর শেষটায় প্রায় চিৎকারের পর্যায়ে পৌঁছল, হেস! আমাকে উত্তর দাও–হ্যাঁ, কিংবা না মেয়েটা এখনও বেঁচে আছে তো?… হে, তুমি অফিসার, সেই অফিসারের নামে দিব্যি দিচ্ছি– আমাকে সত্য করে বল– মেয়েটা বেঁচে আছে, না মরে গেছে? হেস!…হেস! এবার হিটলার তীব্রতম কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন। মনে হল তিনি অপর প্রান্ত থেকে কোনও সাড়া পাচ্ছেন না। হয় লাইন কেটে গেছে, নয় হেস উত্তর দেবার দুর্বিপাক এড়াবার জন্য রিসিভার হুকে রেখে দিয়েছেন। হিটলার টেলিফোন বুথ থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলেন, তার চুল নেমে এসে কপাল ঢেকে ফেলেছে (এ কথাটা তার খাস চাকর লিঙে একাধিকবার বলেছে যে, হিটলার তার মাথার চুল কিছুতেই বাগে রাখতে পারতেন না– অল্পতেই সেটা কপাল ঢেকে ফেলত), তার চাউনি ছন্নের মতো, তাঁর চোখদুটো যে উজ্জ্বল হয়ে ঝকঝক করছে সেটা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক।
শ্ৰেকের দিকে মুখ করে বললেন, গেলির কী যেন একটা কি ঘটেছে। আমরা মুনিক ফিরে যাচ্ছি। গাড়ির যা জোর আছে তার শেষ আউনস্ পর্যন্ত কাজে লাগাও। গেলিকে জীবিত অবস্থায় আবার আমাকে দেখতেই হবে।
টেলিফোনে বুথ থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো টুকরো যেসব কথা ভেসে এসেছিল তার থেকে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলুম, গেলির কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু ঠিক ঠিক কী সেটা বুঝতে পারিনি, এবং হিটলারকে জিগ্যেস করার মতো সাহসও আমার ছিল না।– বলছেন স্বয়ং হফমান।
হিটলারের উন্মাদ উত্তেজনা যেন সংক্রামক। শ্ৰেক চেপে ধরেছে অ্যাকসিলিরেটর। মোটরের মেঝে পর্যন্ত তার গাড়ি তীব্র আর্তনাদ করে ছুটে চলেছে মুনিকের দিকে। হফমান মাঝে মাঝে মোটরের ছোট্ট আর্শিতে দেখছেন হিটলারের চেহারা– ঠোঁটদুটো চেপে তিনি উইন্ডস্ক্রিনের ভেতর দিয়ে সম্মুখ পানে তাকিয়েও যেন কিছু দেখছেন না। তাদের মধ্যে একটিমাত্র বাক্য বিনিময় হল না– যে যার বিমর্ষ চিন্তা নিয়ে ডুবে আছে আপন মনের গহনে।
অবশেষে আমরা তাঁর বাড়িতে পৌঁছলুম এবং সেই ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ জানতে পেলুম। চব্বিশ ঘন্টা আগে গেলি মারা গিয়েছে। সে তার মামার অস্ত্রভাণ্ডার থেকে একটি ৬,৩৫ পিস্তল নিয়ে হৃৎপিণ্ডের কাছাকাছি জায়গায় গুলি করেছে। ডাক্তারদের মতে যদি সঙ্গে সঙ্গে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা হত তবে হয়তো তাকে বাঁচানো অসম্ভব হত না। কিন্তু সে দরজা বন্ধ করে গুলি ছুঁড়েছিল, কেউ সে শব্দ শুনতে পায়নি এবং ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণে সে ইহলোক ত্যাগ করেছে।
ইতোমধ্যে পোস্টমর্টেম, করোনারের তদন্ত সবকিছু হয়ে গিয়েছে এবং পুলিশ মৃতদেহ ফেরত দিয়েছে। ডাক্তারের রিপোর্ট থেকে বোঝা গেল হিটলারের বিদায়ের অল্প পরেই গেলি আত্মহত্যা করে। সে দেহ তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সুসজ্জিত করে কবরস্থানে রাখা হয়েছে তিন দিন পর গোর হবে– এ সময় আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব মৃতকে শেষবারের মতো দেখে নেন এবং আত্মার সদগতির জন্য আপন আপন প্রার্থনা জানান।
গেলির মা ইতোমধ্যে বেৰ্ষটেসগাডেন থেকে এসে গেছেন। পার্টির মুরুব্বিদের একাধিকজন ও হিটলার-ভবনের বন্ধু প্রাচীন দিনের গৃহরক্ষিণী ফ্রাউ ভিনটারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। গেলির মা নির্বাক অশ্রুধারে সিক্ত হচ্ছিলেন।
***
গৃহরক্ষিণী ফ্রাউ ভিনটার যা বললেন তার সারমর্ম এই, হিটলার বাড়ি ছাড়ার পূর্বে সিঁড়ি দিয়ে আবার দোতলায় উঠেছিলেন– এর বর্ণনা আমরা হফমান মারফত আগেই দিয়েছি
গেলিকে আরেকটু আদর করার জন্য, কারণ তিনি সেদিনই মুনিক ফিরেছিলেন এবং সেদিনই আবার রবের্গ হয়ে হামবুর্গ চলে যাচ্ছিলেন বলে গেলির প্রতি যথেষ্ট যত্নবান হতে পারেননি। সেই অনিচ্ছাকৃত অবহেলাটা যেন খানিকটে দূর করার জন্য তিনি উপরে উঠে গেলির গালের উপর হাত দিয়ে আদর করতে করতে কানে কানে সোহাগের কথা কইছিলেন কিন্তু গেলি যেন কোনও সান্ত্বনা মানতে চায়নি, তার রাগও পড়েনি।
দু-জনার চলে যাওয়ার পর গেলি ফ্রাই ভিনটারকে বলে, সত্যি বলছি, আমার ও মামার মধ্যে কোনও জায়গায় মিল নেই (নাথিং ইন কন)।
ফ্রাই ভিনটার কিন্তু একথা বললেন না, হফমানও নীরব, যে সেদিনই হিটলারে গেলিতে তুমুল কথাকাটাকাটি হয়, এবং সেপ্টেম্বর মাসে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না হলে এবং সেদিন আদৌ হয়নি– অনেকেরই জানালা খোলা থাকে বলে একাধিক প্রতিবেশী সে কলহের উচ্চ কণ্ঠস্বর শুনতে পান। শাইরার প্রভৃতি ঐতিহাসিকেরা বলেন (Shirar A.; The Rise ও Fall of the Third Reich; Aufsting und Fall des dritten Reiches 1960/61) যে গেলি। ভিয়েনা গিয়ে গলা সাধবার জন্য আবার অনুমতি চাইছিল, এবং হিটলার পূর্বের ন্যায় দৃঢ় কণ্ঠে অসম্মতি জানাচ্ছিলেন।
