এদিন এর্না শুধু এইটুকু জানতে পেরেছিলেন যে, গেলি ভিয়েনার একজন আর্টিস্টকে ভালোবাসে, কিন্তু সে কে, তাদের দু-জনার মধ্যে কী আদান-প্রদান হয়েছে, গেলি যদি তার ভালোবাসার প্রতিদান পেয়ে থাকে তবে উভয়ের বিবাহের প্রতিবন্ধকই-বা কী– এসব হফমানরা জানতে পারেননি, পরে অন্য কেউও জানতে পারেনি।
এদিকে গেলির মুখ সদা প্রফুল্ল, মামার বুড়ো বুড়ো প্রাচীন দিনের পার্টিসদস্যরা তার ওপর বড়ই প্রসন্ন, মামার বানানো সেই কাটাজালের ভেতরও তার বিধিদত্ত সরসতা লোপ পায়নি। পুস এটাকেই ঘৃণা করে বলেছেন ককেটরি– এর বাংলা প্রতিশব্দ কী? ঢলাঢলিপনা? কী জানি। হফমান বলেন তার মনে সন্দেহ নেই যে এটা ছিল তার বাইরের মুখোশ। এই প্রাণবন্ত, প্রকৃতিদত্ত সদা চঞ্চলা, আনন্দে হাসিতে যে কোনও মুহূর্তে কারণে-অকারণে শতধা হয়ে ফেটে যাওয়া যার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য, তার চতুর্দিকে বিধিনিষেধের কাঁটার জাল! মুনিকের মতো স্বাধীন শহরে– যেখানে নর-নারী কীরকম অবাধে মেলামেশা করে সেটা এদেশে বসে কল্পনা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব– গেলি কারও সঙ্গে কথা কইতে পারবে না মামার অজান্তে, কারও সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করতে পারবে না মামার পরিষ্কার অনুমতি ভিন্ন, এমনকি ওই বয়সের আর পাঁচটা মেয়ে যে সামাজিকতা করে থাকে, যে লোকাচারসম্মত ভদ্রতা-সৌজন্য করে পাঁচজনের সাহচর্য সঙ্গসুখ পায়– এর কোনও একটা সে করতে পারে না, মামাকে না জানিয়ে, মামার অনুমতি ছাড়া।
সেই ডালকুত্তা শব্দটা হফমান তিক্ততার সঙ্গে নিজেই ব্যবহার করেছেন– দুটিকে নিয়ে ডাসে যাওয়ার ফার্সের পরের দিন হফমান আর সহ্য করতে না পেরে হিটলারকে বলেন, আপনি গেলির চতুর্দিকে যে পাঁচিল খাড়া করে তুলেছেন তার ভেতর মেয়েটার যে দম বন্ধ হয়ে আসছে! যে নাচে কাল রাত্রে তার ফুর্তি করার কথা ছিল সেটা শুধু তার অবরুদ্ধ জীবনের তিক্ততা তিক্ততর করে তুলেছিল।
হিটলার উত্তরে বললেন, আপনি জানেন, হফমান, গেলির ভবিষ্যৎ আমার কাছে এমনই প্রিয়, এমনই মূল্যবান যে তাকে সর্বক্ষণ চোখে চোখে রাখা আমি আমার কর্তব্য বলে মনে করি। একথা খুবই সত্য আমি গেলিকে ভালোবাসি এবং আমি তাকে বিয়েও করতে পারি, কিন্তু বিয়ে করা সম্বন্ধে আমার মতামত কী আপনি ভালো করে জানেন, এবং আমি যে কদাপি বিয়ে করব না বলে দৃঢ় সিদ্ধান্ত করেছি সেকথাও আপনি জানেন। তাই আমি এটাকে আপন ন্যায়সম্মত অধিকার বলে ধরে নিয়েছি যে, যতদিন না গেলির উপযুক্ত বর এসে উদয় হয় ততদিন পর্যন্ত সে যার সঙ্গে পরিচয় করতে চায় এবং যারা তার পরিচিত তাদের ওপর কড়া নজর রাখা। আজ গেলি যেটাকে বন্ধন বলে মনে করছে সেটা প্রকৃতপক্ষে বিচক্ষণ আত্মজনের সুচিন্তিত সতর্কতা। আমি মনে মনে দৃঢ়তম সংকল্প করেছি গেলি যেন জোচ্চোরের হাতে না পড়ে বা এমন লোকের পাল্লায় না পড়ে যে গেলিকে দিয়ে আপন ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নেবার অ্যাভেঞ্চারের তালে আছে।
হফমান এস্থলে যোগ দিচ্ছেন, হিটলার অবশ্য জানতেন না যে, গেলি গোপনে গোপনে ভিয়েনাবাসী এক তরুণকে মনপ্রাণ দিয়ে গভীর ভালোবাসে।
হিটলার গিয়েছিলেন মুনিকের বাইরে গেলিকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মায়ের কাছে আবার যাবেন দূর হামবুর্গে, মাঝপথে কয়েক ঘণ্টার জন্য মনিকে থামবেন এবং গেলিকে গ্রাম থেকে আনিয়েছেন। হামবুর্গের দীর্ঘ সফরে সহযাত্রী হওয়ার জন্য তিনি পূর্বেই হফমানকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এস্থলে হফমানের বিবরণী মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ১৭ সেপ্টেম্বর (অর্থাৎ মুনিক সমাজে হিটলার গেলিকে পরিচয় করিয়ে দেবার চার বছর পর কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি গেলিকে মুনিক সমাজে উপস্থিত করেন, তা হলে হবে সাত বছর পর, কিন্তু এ বাবদে আমি হফমানকেই বিশ্বাস করি, এবং এসব ঐতিহাসিকদের বই বেরিয়েছে হফমানের বই বেরুবার পূর্বেই) হফমান এলেন হিটলারের বাড়িতে। গেলি মায়েরই মতো ভালো ঘরকন্না করতে জানত, তাই সে তখন হিটলারের স্যুটকেস গুছিয়ে দিচ্ছে। হিটলার সখাসহ যখন সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নামছেন, তখন উপরের তলায় রেলিঙের উপর ভর করে, নিচের দিকে ঝুঁকে গেলি বলতে লাগল, ও রেভোয়া মামা অ্যাড়ল, ও রেভোয়া হার হফমান! হিটলার দাঁড়ালেন, তার পর উপরের দিকে তাকিয়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দিকে চললেন। হফমান বাইরে এসে পেভমেন্টে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
হিটলার এলে পর মোটরে উঠে দুজন চললেন উত্তর দিকে নরবের্গ পানে। শহর থেকে বেরুবার সময় হিটলার বন্ধু হফমানকে বললেন, কেন জানিনে আমার মনটা যেন অস্বস্তিতে ভরে উঠেছে।
হফমান বিবেচক লোক। তিনি নিজেই ঠাট্টা করে বলেছেন, অনেকেই আমাকে আড়ালে হিটলারের কোর্টজেস্টার (গোপালভাড়) বলত, এবং হয়তো সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, এ সময়কার দখিনা ফ্যোন বাতাসটা সক্কলেরই বুকের উপর চেপে বসে সবাইকে মনমরা করে দেয়। কিন্তু হিটলার চুপ করে রইলেন, এবং দীর্ঘ নরবের্গের রাস্তা ড্রাইভ করার পর সেখানকার পার্টি-মেম্বারদের প্যারা হোটেলে উঠলেন।
পরের দিন ন্যুরনবের্গ শহর ছেড়ে যখন তারা বায়রট শহরের দিকে এগুচ্ছেন তখন হিটলার ড্রাইভিং সিটের সামনের ছোট্ট আয়নাটিতে লক্ষ করলেন, আরেকখানা মোটর দ্রুততর বেগে ক্রমশই তাদের গাড়ির কাছে এগিয়ে আসছে। নিরাপত্তার জন্য হিটলারের হুকুম ছিল কোনও গাড়ি যেন তার গাড়ি ওভারটেক না করতে পায়, কারণ ওই সময় দুটো গাড়িই কিছুক্ষণ পাশাপাশি চলে বলে অন্য গাড়ি থেকে হিটলারের উপর গুলি চালানো কঠিন নয়। হিটলার শোফার শ্ৰেককে সেই আদেশ দিতে যাচ্ছেন সেই সময় তিনিই লক্ষ করলেন, যে গাড়ি পশ্চাদ্ধাবন করছে সেটা ট্যাক্সি এবং ড্রাইভারের পাশে হোটেলের উর্দিপরা একটি ছোকরা ক্ষিপ্তের ন্যায় দু হাত নাড়িয়ে তাদের থামবার জন্য সঙ্কেত করছে। শ্ৰেক্ গাড়ি দাঁড় করালে ছেলেটি উত্তেজনায় হাঁফাতে হাঁফাতে বললে, হ্যার হেস (ইনি তখন এবং ১৯৪১-এ যখন অ্যারোপ্লেনে করে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে লন্ডন যান তখনও হিটলারের পরেই তাঁর স্থান ছিল) মুনিক থেকে ট্রাঙ্ককল করে অত্যন্ত জরুরি বিষয় নিয়ে হিটলারের সঙ্গে কথা বলতে চান। তিনি ফোনে না পৌঁছানো পর্যন্ত হেস লাইন ছাড়বেন না। দুই বন্ধু মোটর ঘুরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে চললেন নরবের্গ পানে।
