এই কেলেঙ্কারিতে পার্টির কতখানি ক্ষতি হচ্ছিল বলা কঠিন, কিন্তু এ-কথা সত্য যে নাৎসি পার্টির ভরটেমূবের্গ অঞ্চলাধিপতি মুরুব্বি, পার্টির এক অতি প্রাচীন সদস্য যখন হিটলারের দৃষ্টি এদিকে আকর্ষণ করলেন তখন তিনি রাগে ক্রোধে চিৎকার করে তাকে পার্টি থেকে স্রেফ খেদিয়ে দিলেন।
এদিকে হিটলারের কড়া পাহারা গেলির ওপর। হফমানের মতে তিনি আদৌ জানেন না যে গেলি অন্যজনকে অতি গভীরভাবে ভালোবাসে– ভিয়েনায় নাকি দয়িতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এবং এ কথাও সত্য, গেলি বার বার সঙ্গীতচর্চা করার জন্য তার প্রাচীন গুরুর কাছে ভিয়েনায় যেতে চায় এবং হিটলারের কবুল জবাব, নাই অর্থাৎ নো! যে মুনিকের সহস্র সহস্র নরনারী হিটলারের উচ্ছ্বসিত ভক্ত, সেই হিটলার যখন গেলির পদপ্রান্তে তাঁর প্রণয় রাখলেন তখন আর কিছু না হোক, এত বড় সর্বজনপ্রশংসিত একটি গ্রেটম্যানের বশ্যতা গেলিকে নিশ্চয়ই মুগ্ধবিহ্বল করেছিল। (প্রেমের প্রতিদান দিক আর না-ই দিক) এবং হয়তো হিটলার সেই বিহ্বলতাকেই প্রণয়ের প্রতিদান হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। হফমানের মতে, হিটলারের গ্রেট লভ ছিল স্বার্থপর প্রেম অনেক মুনিঋষিরাও বলেন, গ্রেট ল কখনও নিঃস্বার্থ হতে পারে না, সে লাভার অন্য সকলের প্রতি হয়ে যায় হিংসাপরায়ণ, তার বুভুক্ষা অসীম। বার্নার্ড শ-ও বলেছেন, গ্রেট লড় সামলে-সুমলে অল্প মেকদারে ধীরে ধীরে প্রকাশ করতে হয়। নইলে দয়িতার দম বন্ধ হয়ে আসে। যেন কোনও ম্যানিয়াক প্রেমোন্মাদ তাকে অষ্টপ্রহর আলিঙ্গনাবদ্ধ করে নিরুদ্ধনিশ্বাস করে তুলেছে।
মুনিকের বছরের সবচেয়ে বড় নাচের পরব এগিয়ে আসছে। প্রাণচঞ্চলা গেলি কেন, নিতান্ত অর্থাভাব না হলে, কিংবা প্রেমিকও দরিদ্র হলে, মুনিকের কোন তরুণী সে নাচ বর্জন করে? প্রথমটায় হিটলার তো কানই দেন না। আর গেলিও ছাড়বেন না। শেষটায় বাধ্য হয়ে হিটলার রাজি হলেন, কিন্তু শর্ত রইল দুটি। সঙ্গে যাবেন দুই গার্জেন এবং দুই গার্জেনদের প্রতিজ্ঞা করতে হল যে রাত এগারোটার ভেতর গেলিকে ফের বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে।
সেই ডানসের জন্য যে পারে সে-ই নতুন হালফেশানের ফ্রক তৈরি করায়। মুনিকের সর্বশ্রেষ্ঠ ডিজাইনার-দর্জি ডাই ভঁই অতি অরিজিন্যাল ডিজাইন রেখে গেল। হিটলার এক নজর বুলিয়েই সব কটা নামঞ্জুর করে দিলেন। এগুলো বড্ড বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বড় বেশি সালঙ্কার– যদ্যপি ফ্রক হিসেবে অত্যুকৃষ্ট। গেলি যাবে সাধারণ ইভনিং ড্রেস পরে।
তাই হল। স্বয়ং হফমান ও তার চেয়ে বুড়ো পার্টির প্রাচীন সদস্য আমান গেলির চরিত্ররক্ষকস্বরূপ তাকে মধ্যিখানে নিয়ে গেলেন নাচের মজলিশে। এক্ষেত্রে তরুণীরা প্রায় সর্বদাই আপন আপন লভারের সঙ্গে এ নাচে কেন– সব নাচেই যায়।
এবং ফিরতে হবে রাত ১১টায়। বলে কী? মাথা খারাপ।
হফমান বলেছেন এবং এ লেখকও আপন একাধিক অভিজ্ঞতা থেকে অসংকোচে সায় দেবে– এ-সব নাচে ফুর্তি ফষ্টি-নষ্টি এমনকি কিঞ্চিৎ বেলেল্লাপনা আসলে আরম্ভ হয় রাত বারোটার পর। আমার মতে জমে প্রায় দুটোয় এবং নাচ ভাঙে ছটায়।
অনুমান করা কঠিন নয় যে, গেলি অত্যধিক আপ্যায়িত বা সন্তুষ্ট হয়নি। নাচের মাঝে মাঝে ফাঁকে ফাঁকে কপোত-কপোতীরা জোড়ায় জোড়ায় ফটোগ্রাফ তোলায়। গেলির যথেষ্ট কাষ্ঠরস ছিল। সে-ও ছবি তোলাল ওই দুই প্রহরী ডালকুত্তার মাঝখানে। কপোত-কপোতীর এক হাতে থাকে সফেন শ্যাম্পেন গ্লাস, অন্য হাতে গোটাপাঁচেক বেলুনের সুতো, মাথায় ওই বলডাসেই কেনা রঙবেরঙের ফুস ক্যাপ, গাধার টুপি ইত্যাদি। গেলি ছবি তোলাল এমন কায়দায় যেন মনে হয় ফাঁসির আসামিকে তার দুই জল্লাদ তাকে ফাঁসিকাঠে নিয়ে যাবার সময় প্রেস ফটোগ্রাফার যেভাবে ছবি তোলে।
হফমান বিরক্তির সঙ্গে কাঁটায় কাঁটায় এগারোটার সময় হিটলারের গচ্ছিত মহামূল্যবান গেলিকে মালিকের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন।
পরদিন সকালবেলা সাড়ম্বরে সরকারি কায়দায় গেলি ফটোগ্রাফখানা মামাকে উপহার দিলেন। হিটলার এসব নাচ এককালে বিস্তর না হোক অল্প-বিস্তর নিশ্চয়ই দেখেছিলেন। তাঁর মতো তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি যে ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরেছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহ না করাই ভালো।
বৈমাত্রেয় মামা হলেও গেলি পেয়েছিল হিটলারের একটি মহৎ গুণ; সে তার পেটের কথা কাউকে বলত না। যে-পুৎসি হাস্টেলে তাঁর পুস্তকে হিটলার ও গেলির বিরুদ্ধে প্রচুরতম বিষোদগার করেছেন তিনি সে সময়ে নিত্য নিত্য হিটলারের বাড়িতে আসতেন, এবং গেলির সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতা ছিল। তৎসত্ত্বেও তিনি তাঁর পুস্তকে গেলিকে দিয়ে রামগঙ্গা কিছুই বলাতে পারেননি। শুধু একবার নাকি তিনজন যখন একসঙ্গে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন হিটলার কী একটি রূঢ় মন্তব্য করলে, পুৎসি শুনতে পেলেন, গেলি দাঁতে দাঁত চেপে অস্ফুট কণ্ঠে বলল, ব্রুট–পশু!
গেলির ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল হফমান পরিবারের প্রতি এবং সমস্ত মুন্যিক শহরে ওই পরিবারের কর্তী এনা হফমানের সঙ্গে তার ছিল অন্তরঙ্গতা। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত আগাপাশতলা কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি, স্বামীকেও বোঝাতে পারেননি। পুৎসি তার বিষোদ্গারের সময় গেলির যত নিন্দাই করে থাকুন না কেন, এনা পাঁচজনকে যা বলেছেন। তার থেকে বোঝা যায়, তিনি, এনা নিজে আর্টিস্ট ছিলেন বলে শুধু যে গেলির অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে মজেছিলেন তাই নয়, তার মানসিক ও চারিত্রিক একাধিক বিরল সৎগুণ তাঁকে সত্যই মুগ্ধ করেছিল। এমন যে বয়স্কা বান্ধবী যার কাছ থেকে সান্ত্বনা পাওয়া যায়, বিপদে-আপদে উপদেশ পথনির্দেশ চাওয়া যায় পাওয়া যায় তার কাছেও গেলি তার সুখ-দুঃখের কথা বলত না। শুধু একদিন মাত্র, কেমন যেন আত্মহারা হয়ে স্বীকার করে যে, সে যখন ভিয়েনায় ছিল তখন কোনও একজনকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিল। সামান্য এই, এইটুকু বলার পর সে হঠাৎ থেমে গেল, যেন সংবিতে ফিরে এসে বুঝতে পারল, বড় বেশি বলা হয়ে গিয়েছে, তাই সঙ্গে সঙ্গে বলল, আর যা আছে, সেটা আছেই। আপনিও কিছু করতে পারবেন না, আমিও কিছু করতে পারব না। অতএব অন্য কথা পাড়ি। এর্না দুঃখিনী গেলিকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন, সর্বপ্রকারে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতি দিলেন এনা বাস্তবিকই দৃঢ় চরিত্রের রমণী ছিলেন, অনেকের জন্য অনেক কিছু করেছিলেন, নাৎসি পার্টিতে যোগ দেননি, এবং যদিও হিটলারকে সমীহ করে চলতেন তবুও অন্যান্য বাবদে দু-একবার তাঁকেও খাঁটি অপ্রিয় সত্যকথা শোনাতে কসুর করেননি কিন্তু গেলি আর শামুকের খোল থেকে বেরুতে রাজি হল না। পরবর্তী ঘটনা থেকে মনে হয়, সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, সে যা চায় হিটলার তার ঘোরতর বিরোধী এবং এই নিরীহ হফমান দম্পতি এখনও হিটলারের স্বরূপ চেনেন না, হিটলার তার মর্জিমাফিক যেসব সম্ভব-অসম্ভব কার্য করতে ও করাতে পারেন সে সম্বন্ধে এদের কণামাত্র ধারণা নেই– হিটলারের যে-স্বরূপ সে তার প্রতিদিনের সান্নিধ্যে সম্যক হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হয়েছিল।
