হিটলারের পার্টির সদস্যগণ যে যে কাজই করুন না কেন, সমাজে তাদের যে স্থানই হোক না কেন, পার্টির ভেতর একটা প্রশংসনীয় সাম্যবাদ ছিল। হিটলারের মোটর ড্রাইভার এমিল মরিস ছিল প্রাচীন দিনের পার্টি মেম্বার। সে একদিন কাঁপতে কাঁপতে হফমানের সামনে এসে বলল, সে গেলির সঙ্গে ঠাট্টাটুটি করছিল, এমন সময় হঠাৎ হিটলার ঘরে ঢুকে রেগে, জিঘাংসায় যেন সর্ব আত্মকতত্ত্ব হারিয়ে চিৎকারের পর চিৎকারে মরিসকে গালাগাল দিতে আরম্ভ করেন। মরিস তো রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে ভাবল, হিটলার যে কোনও মুহূর্তে পিস্তল বের করে গুলি চালাতে পারেন। ঘটনাটি হফমানকে বলার সময় সে তখনও ভয়ে কাঁপছে।
হফমানের মতে গেলি ছিল পূত, পবিত্র, পুষ্পটির মতো। তিনি বলেন, অপরাধ তার দিক দিয়ে নিশ্চয়ই কিছু ছিল না। কিন্তু মরিসটি ছিলেন ঈষৎ নটবর। কিন্তু সে-ও যে ফুরারের ভাগ্নির সঙ্গে বাড়াবাড়ি করবে সেটা অবিশ্বাস্য। করতে গেলে বহু পূর্বেই মরিসের বন্ধুবান্ধব তাকে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন করে দিত।
হিটলারের শত্রুর অভাব কোনওকালেই ছিল না। এমনকি তাঁর প্রধান শত্রু কম্যুনিস্ট দলের কিছু কিছু সদস্য পার্টির আদেশ অনুযায়ী নাৎসি মেম্বারশিপ নিয়ে হিটলারের কার্যকলাপ লক্ষ করে যথাস্থানে তাদের রিপোর্ট পাঠাত। এদের তো কথাই নেই, আরও কেউ কেউ বলেন, সমস্ত ব্যাপারটা এতখানি ধোয়া তুলসীপাতা ছিল না।(৩) তা সে যাই হোক, হিটলার আত্মকর্তৃত্ব ফিরে পেলেন বহু কাল পরে–ইতোমধ্যে মরিস গা-ঢাকা দিয়ে থাকত– হঠাৎ সামনে পড়ে গেলে তুলকালাম কাণ্ড লেগে যেত।
ইতোমধ্যে আরেকটা কাণ্ড ঘটে গেল। হিটলার প্রপাগান্ডা-সফরে বেরুলে গেলি মায়ের কাছে, হিটলারের গ্রামের বাড়িতে চলে যেত। বোধহয় তারই কোনও এক সময়ে হিটলার প্রিয়া গেলিকে একখানা চিঠি লেখেন– সেটাতে নাকি যৌনসম্পর্ক সম্বন্ধে হিটলার অতিশয় প্রাঞ্জল শত্রুপক্ষের অভিমতে– অশ্লীল ভাষায় আপন কাম্য আদর্শ যৌনসম্পর্ক সম্বন্ধে অভিমত প্রকাশ করেন। যৌনবিজ্ঞানীরা বলেন অত্যাচারী শাসকদের (টাইরেন্ট) অনেকেই নাকি মাজোকিস্ট হয়ে থাকেন–অর্থাৎ স্বাভাবিক যৌনসঙ্গমের পরিবর্তে উলঙ্গ রমণী সে স্থলে পুরুষকে তীব্র কশাঘাত করে, কিংবা তলায় সূক্ষ্ম লোহা লাগানো রাইডিং বুট পরে পুরুষের স্কন্ধোপরি ঘন ঘন বুটাঘাত করে, তবেই নাকি পুরুষ তার যৌনানন্দ পায়(৪) শত্রুপক্ষের মতে হিটলারের চিঠি মাজোকিস্ট দর্শন(!) বিবৃত করেছিল। সে চিঠি নাকি দুর্ভাগ্যক্রমে পড়ে যায় অন্য লোকের হাতে। অতি কষ্টে, বহু অর্থ নিয়ে (বলা হয় পার্টি ফান্ড থেকে) এক ক্যাথলিক পাদ্রি–ইনি তাঁর ইহুদি-বিদ্বেষ নাৎসি পার্টিতে যোগ দিলে কার্যে পরিণত করতে পারবেন এই আশায় পার্টিতে যোগ দেন- তারই বিনিময়ে চিঠিখানা কিনে নেন। (কথিত আছে, ৩০ জুন ১৯৩৪-এ হিটলার যখন বিনা বিচারে এক তথাকথিত বিদ্রোহী দলের নেতা র্যোম, হাইস্ ইত্যাদিকে গুলি করে মারবার আদেশ দেন তখন সেই মোকায় আরও জনা চারশোর সঙ্গে এই ফাদার স্টেমপফুলে-কেও খুন করা হয়। তার দোষ তিনি ওই চিঠির সারমর্ম স্বমস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ না রেখে দু-একজন অন্তরঙ্গ পার্টি মেম্বারকে বলে ফেলেন। হিটলার-সখা হফমান অবশ্য এ চিঠির উল্লেখ করেননি বরঞ্চ স্টেপলে ও অন্যান্য নাৎসি নেতা নিহত হওয়ার কয়েকদিন পর হিটলারের সঙ্গে যখন দেখা করতে যান তখন তাকে দেখামাত্রই নাকি হিটলার বলে ওঠেন, জানো হফমান, শুয়োরের বাচ্চারা আমার প্যারা ফাদারকেও খুন করেছে! অবশ্য এ কথা সত্য যে, জুন ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে হিটলারের আদেশে যে পাইকারি খুন জুন পাৰ্জ বা জুন মাসের জোলাপ হয়–এ লেখক তখন জর্মনিতে ও ধুন্ধুমারের যতখানি আর পাঁচটা রাস্তার নাগরিক দেখতে পেয়েছিল, সে-ও পেয়েছে, কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর হিটলার জাতির সম্মুখে যখন আপন সাফাই গেয়ে বক্তৃতা করলেন, তখন আর পাঁচজন নাগরিকের মতো সে সেটা বিশ্বাস না করে অবিশ্বাস করেছিল এবং পরবর্তী ইতিহাস-উদঘাটন লেখককেই সমর্থন করে তখন গ্যোরিং, হিমলার আদেশদাতা হিটলারকে না জানিয়ে, পরে মিথ্যে অভিযোগ এনে, আপন আপন ব্যক্তিগত শত্রুও খতম করেন। কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেন, ফুরারের গোপনীয় কেলেঙ্কারি বাবদে যখন ফাদার এতই অসতর্ক তখন এ মোকায় তাকে সরিয়ে ফেলাই ভালো– এই উদ্দেশ্য নিয়ে তাকেও খুন করা হয়। কিন্তু এই পার্জ বা জোলাপ গেলি-প্রেমের ছ বছর পরের কথা, আমরা ১৯২৮-এ ফিরে যাই)।
তা সে চিঠি আদৌ হিটলার লিখেছিলেন কি না সে তর্ক উত্থাপন না করলেও জানা যায়, ওই সময়ে পার্টিসদস্যদের ভেতর কানাঘুষা আরম্ভ হয়। কারণ ইতোমধ্যে হিটলার আরও ভালো রাস্তায় বৃহৎ ভবন কিনে সেখানে গেলির জন্য রাজরানির মতো আবাস নির্মাণ করে সেইটেকে আপন স্থায়ী আবাস-বাটি করেছেন, গেলিকে যত্রতত্র সর্বত্র সঙ্গে নিয়ে যান, এবং নিতান্ত সরল পার্টিসদস্যও দু-চারবার লক্ষ করলেই বলত, নিশ্চয়ই ফুরার এ মেয়েতে মজেছেন। তা তিনি মজুন, কিন্তু একে বিয়ে করলেই তো পারেন। নইলে শত্রুপক্ষ যে বলছে হিটলার রক্ষিতা পোষণ করেন, দু কান কাটার মতো স্বভবনে তার সঙ্গে বাস করেন, তিন কান কাটার মতো সগর্বে সদম্ভে তাকে নিয়ে সর্বত্র এমনকি পোলিটিক্যাল পার্টি মিটিঙেও যাতায়াত করেন, এবং আপন ভাগিনীর–তা হোক না কেন সৎবোনের মেয়ে– ভবিষ্যৎটি যে ঝরঝরে করে দিচ্ছেন সে বিষয়ে তাঁর কোনও বিবেকদংশন নেই; আর এতদিন ধরে প্রচার আর প্রচার যে, হিটলারের মতো সর্বত্যাগী, জিতেন্দ্রিয় পুরুষ আর হয় না, তিনি যে উনচল্লিশ বছর বয়সেও দারগ্রহণ করেননি তার একমাত্র কারণ, দারাপুত্ৰপরিবার দেশের জন্যে তার আত্মোৎসর্গে অন্তরায় হবে বলে। জিতেন্দ্রিয় না কচু!
