মেয়েটি যে অসাধারণ সুন্দরী ছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এর সম্বন্ধে এবং মামা অ্যাডফের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক ছিল সে সম্বন্ধে একাধিক লেখক আপন আপন মতামত দিয়েছেন। এর ভেতর দুজন দুই মত পোষণ করেন, এবং পঁয়ত্রিশ বছর পর আজ সত্য নিরূপণ করা অসম্ভব। তবে দু-জনাই একমত যে, ওই গেলি-ই হিটলারের ওয়ান গ্রেট লাভ! এঁদের একজন হিটলারের ফোটোগ্রাফার বন্ধু হাইনরিষ হন। হিটলারের মৃত্যুর দশ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ইনি হিটলার সম্বন্ধে একখানা বই লেখেন। বইখানার নাম হিটলার উয়োজ মাই ফ্রেন্ড ইংরেজি অনুবাদে। বলা বাহুল্য যে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দেও তিনি সব কথা প্রাণ খুলে বলতে পারেননি। তবে একথা সত্য, সব তত্ত্ব গ্যাস-চেম্বারে ইহুদি পোড়ানো ইত্যাদি জেনে-শুনেও তিনি হিটলারের নিন্দার চেয়ে প্রশংসাই করেছেন বেশি– তবে এ কথাও বলে রাখা ভালো, রাজনৈতিক ব্যাপারে হফমানের কোনও চিত্তাকর্ষণ ছিল না, ওই বিষয়, যুদ্ধবিগ্রহ, কনসেট্রেশন ক্যাম্প ইত্যাদি নিয়ে দুই বন্ধুতে আলোচনা হত খুবই কম। ফটোগ্রাফার হলেও হফমান উত্তম উত্তম ছবির কদর ও সন্ধান জানতেন, এবং হিটলারেরও রুচি ছিল স্থাপত্যে, চিত্রে ও ভাস্কর্যে। দু-জনার আলাপ-আলোচনা হত আর্ট নিয়ে।
অন্যজনের নাম পুৎসি হানফস্টেঙেল। এঁর বইয়ের নাম আনহার্ড উইটনেস্। হিটলার যখন মুনিকে তার দল গড়ে তুলতে আরম্ভ করেন তখন উভয়ের পরিচয় হয়। পুৎসি বিত্তশালী খানদানি ঘরের ছেলে বলে তিনি হিটলারকে নানাভাবে সাহায্য করতে সক্ষম হন। হিটলার ফুরার হওয়ার পরও বেশ কিছুকাল তিনি দরবারে আসা-যাওয়া করতেন এবং প্রায়ই নিভৃতে হিটলারকে পিয়ানো বাজিয়ে শোনাতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দরবারের কূটনৈতিক মারপ্যাঁচে হেরে যান এবং সুইটজারল্যান্ডে পালিয়ে গিয়ে সেখানেই ঘর বাঁধেন। ইনি তাঁর পুস্তকে হিটলার এবং গেলি উভয়েরই বিরুদ্ধে প্রচুর বিষোদগার করেছেন। তাঁর মতে গেলি অতিশয় সাধারণ আর পাঁচটা মেয়ের মতো ফ্লার্ট করার জন্য আকুল, ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রসিদ্ধ ইংরেজ ঐতিহাসিকরা হিটলার সম্বন্ধে আপন আপন বই লেখার পর, এই দু-জনার বই বেরিয়েছে এবং ইংরেজ ঐতিহাসিকদের ধারণা হফমানের কাছাকাছি। তা সে যা-ই হোক, এ কথা সত্য হিটলার তার ভাগ্নিকে নিয়ে ক্যাফেতে যেতেন এবং আগে কাজের চাপে সিনেমা, থিয়েটার, অপেরায় অল্প যেতেন– এখন গেলির চাপে সেগুলো বেড়ে গেল। কিন্তু আসলে হিটলার সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন গেলিকে মোটরে করে নিয়ে পিকনিক করতে–মুনিকের চতুর্দিকে পিকনিকের জন্য অত্যুৎকৃষ্ট স্থল বিস্তর। পাহাড়, উপত্যকা, হ্রদ, নদী, বনফুলে ভর্তি মোলায়েম ঘাসের ঢালু মাঠ, মহান বনস্পতি–কোনও বস্তুরই অভাব নেই। হফমান পরিবার প্রায়ই সঙ্গে যেতেন।
সোজা বাংলায় বলতে গেলে হিটলার এই কুমারীকে যেন দেবতার আসনে বসিয়ে পুজো করতেন। এবং তাই লোকজনসমক্ষে তিনি কখনও বে-এক্তেয়ার হয় এমন কোনও আচরণ করেননি যা মুগ্ধ প্রণয়ী ইয়োরোপে মাঝে মাঝে করে থাকে। গেলির কণ্ঠস্বর মিষ্ট ছিল, হিটলার সে স্বর তালিম দিয়ে অপেরার জন্য গেলিকে তৈরি করতে চাইলেন এবং উপযুক্ত গুরু নিয়োগ করলেন। পুৎসি বলেন অন্য কাহিনী। তিনি বলেন, মেয়েটা ছিল অত্যন্ত বাজে ফ্লার্ট টাইপের। অপেরায় উপযুক্ত কণ্ঠস্বর প্রস্তুত করতে হলে যে রেওয়াজ এবং বিশেষ করে যে কঠোর অধ্যবসায়ের প্রয়োজন ছিল, গেলির চরিত্রে তার কণামাত্র উপাদান ছিল না। প্রায়ই গুরুকে ফোন করে রেওয়াজ নাকচ করে দিত এবং এই ফাঁকে ফ্লার্ট করার তালে লেগে যেত। পুৎসির মতে শেষ পর্যন্ত গানের ক্লাস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
তবে এ-কথা সর্বদীসম্মত যে, ভিয়েনায় যে গুরুর কাছে গেলি সর্বপ্রথম গান গাইতে শেখা আরম্ভ করে সে তার কাছে ফিরে যেতে চাইত। জনশ্রুতি এ-কথাও বলে, সেখানে নাকি গেলির দয়িত বাস করত।
এবং ঠিক এইখানেই ছিল হিটলারের ঘোরতর আপত্তি। শুধু তাই নয়, যদিও গেলিকে খুশি করার জন্যে হিটলার সবকিছুই করতে রাজি ছিলেন– যেমন গেলির সঙ্গে টুপিজুতো কিনতে যাওয়ার মতো মারাত্মক একঘেয়ে ঘষ্টানিও তিনি বরদাস্ত করে নিতেন (হিটলার নিজেই বলেছেন, গেলির সঙ্গে হ্যাট টুপি কাপড় কিনতে যাওয়ার চেয়ে কঠিনতর অগ্নিপরীক্ষা ত্রিসংসারে আর নেই। আধঘণ্টা একঘণ্টা ধরে দোকানের মেয়েকে দিয়ে বস্তার পর বস্তা কাপড় নামাবে, তার সঙ্গে সে-সব নিয়ে প্রাণ ঢেলে দিয়ে আলোচনা করবে। এবং শেষ পর্যন্ত কিছুটি না কিনে গট গট করে বেরিয়ে চলে যাবে অন্য দোকানে। হিটলার ততক্ষণ বোধহয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে বসে আঙুলের নখ কামড়াতেন, কিন্তু যাই করুন আর নাই করুন, তার পরের বারও বাছুরছানাটির মতো গেলির সঙ্গে কেনা-কাটা করতে যেতেন ঠিকই) কিন্তু একটা বিষয়ে তিনি অচল অটল। তার অনুমতি ভিন্ন গেলি যার-তার সঙ্গে আলাপচারী করতে পারবে না। এমনকি পরিচিতজনের সঙ্গে ঠাট্টা-ইয়ার্কিও চলবে না। এবং এই ফরমান যে কত সুদূরপ্রসারী সেটা স্বয়ং গেলিও জানত না।
গেলি অবশ্যই জানত হিটলার তাকে ভালোবাসেন, তার প্রেমমুগ্ধ, সে প্রেম যে কত অতল গভীর সে সম্বন্ধে বেচারীর কোনও ধারণাই ছিল না। একদিন সেটা সে বুঝতে পারল রীতিমতো ভীতশঙ্কিত হয়ে।
