২. ইতালীয়দের স্টেপলফুড– আমাদের ভারতের মতো নিত্য খাদ্য। মাক্কারনি, মাগেত্তি, ভেরমিচেল্পি ইত্যাদি। সবই ময়দার তৈরি, অনেকটা মুসলমানদের সেঁওইয়ের মতো। রান্না করা হয় নানা পদ্ধতিতে, তার শত শত রেসিপি (পাক-প্রণালী) আছে।
গেলির প্রবেশ
সম্পূর্ণ অচিন্তনীয়, অবিশ্বাস্য অতিপ্রাকৃত বা মিরাই বলা যেতে পারে।
নিতান্ত একটি চিংড়ি (চ্যাংড়ার স্ত্রীলিঙ্গ) মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এলেন হিটলার তাঁর অন্যতম ক্যাফেতে। অতি দ্রভাবে সে সবাইকে নমস্কারাদি করল। সে তো স্বাভাবিক। কিন্তু তাজ্জব। কি বাৎ। পাঁচ মিনিট যেতে না যেতে তাবৎ কথাবার্তা সে-ই বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছে ওদিকে এতই বিবেচনা ধরে যে একে কথা বলতে দেয়, ওকেও কথা বলতে দেয়, কাউকে অস্বাভাবিক আড়ষ্ট হতে দেয় না– সবাই, ইংরেজিতে যাকে বলে ভেরি মাচ্ অ্যাট ইজ– কিন্তু সব মন্তব্য, সব আলোচনা ঘুরেফিরে যায় ওই মেয়েটিরই কাছে।
আর অতিপ্রাকৃত, মিরা হল এই যে, স্বয়ং হিটলার চেয়ারে আরামসে হেলান দিয়ে সুমধুর পরিতৃপ্তির মৃদুহাস্য বদনমণ্ডলে ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছেন।
হিটলারকে যখনই তার চেয়ে বয়সে বড় মুরুব্বিস্থানীয় পার্টি মেম্বরেরা শুধোতেন, বয়েস তো হল, বিয়ে-শাদির কথা–
হিটলার বাধা দিয়ে বলতেন, জর্মনি আমার বধূ!
ঠাট্টাছলে বললেও এর ভেতর যে অনেকখানি সত্য লুক্কায়িত আছে সে তত্ত্বের কিছুটা সে-সব মুরুব্বিরা জানতেন। নইলে এ-জাতীয় প্রশ্ন ব্যক্তিগত জীবনে দ্বিরদরদ-নির্মিত শিখরবাসী হিটলারকে জিগ্যেস করবে কে? কারণ তারা এবং পার্টির অন্য সবাই জানতেন, হিটলার জাত-ব্যাচেলার। তা সে ভিয়েনিজ কেতায় সুন্দরীদের সামনে যতই গ্যালানট্রি, শিভালরি দেখান না কেন, রমণীদের কথা উঠলে টেবিলে দু হাত রেখে, সুমুখের দিকে ঝুঁকে যতই সিরিয়াসলি তিনি কোথায় কোন সুন্দরী রমণী দেখেছেন, যে বেভারিয়াকে তিনি এত ভালোবাসেন যে আপন মাতৃভূমি ত্যাগ করে এখানে এসে স্থায়ী আবাস নির্মাণ করেছেন সেই বেভারিয়া মায় তার মুনিক সুন্দরীর ব্যাপারে যে ভিয়েনার কাছেই আসতে পারে না– এসব নিয়ে যত ধানাইপানাই তিনি করুন না কেন, পার্টির উঁচু মহলের প্রায় সবাই জানতেন যে হিটলারের পক্ষে কোনও সুন্দরীকে নিয়ে পার্টির অতি সঙ্কীর্ণ গণ্ডির ভেতর কিছুটা ঢলাঢলি বরঞ্চ সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়, কিন্তু বিয়ে করে বউ কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে ঘর বাঁধবার মতো মানুষ হের হিটলার নন। মাঝে মাঝে তাকে এ মন্তব্যও করতে শোনা গেছে : সুন্দরীদের ভালোবাসব না– সে কী? আমি কি এতই রসকষ বর্জিত আকাট! যা বলুন, যা কন্ আপনারা তো জানেন, আমার সত্তার অন্তস্তলে যে পুরুষ লুকানো আছে তিনি আর্টিস্ট! এবং আমি ফুলও ভালোবাসি কিন্তু তাই বলে কি আমাকে বাগানের মালী হতে হবে? প্রায় এ সত্যটিই চার্লস ল্যাম্ বলেছেন, আমার ঘরে ফুল নেই কেন, শুধদচ্ছেন? আমি কি ফুল ভালোবাসিনে? নিশ্চয় বাসি। আমি শিশুদেরও ভালোবাসি তাই বলে তাদের মুণ্ডুগুলো কেটে ঘরের ভেতর ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখিনে। আর এ বিষয়ে পরিপূর্ণ সত্যের শেষ শব্দটি বলতে হলে বাংলা প্রবাদেরই শরণাপন্ন হতে হয়;– বাজারে যখন দুধ সস্তা তখন গাই পোর কি প্রয়োজন?
পূর্বেই বলেছি, সত্যকার অন্তরঙ্গ বন্ধু হিটলারের কেউ ছিল না। তবু মোটামুটি যাকে বন্ধু বলা যেতে পারে তিনি তার ফোটোগ্রাফার হফমান। একে তিনি এই প্রসঙ্গে খাঁটি বৈষয়িক তত্ত্বকথাটি বলেন, জর্মনিকে গড়ে তোলা আমার জীবনের একমাত্র কাম্য, আদর্শ! একবার আমার জেল হয়েছে, আবার যে কোনও মুহূর্তে আমার ছ বছরের জেল হতে পারে। তখন বউ-বাচ্চা বাইরে, আমি গরাদের ভেতর। এটা কি খুব বাঞ্ছনীয় পরিস্থিতি?
তবু বেশিরভাগই এই নবাগতা সুন্দরী, ব্লন্ডিনী, মধুরভাষিণী, আত্মসচেতন, অথচ বিনয়ী মেয়েটিকে দেখে, (এবং বিশেষ করে লক্ষ করে যে হিটলার কফি-চক্রের চক্রবর্তীর সম্মানিত আসন সানন্দে তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। ভাবলেন, তবে কি হিটলারের জর্মনি আমার বধূ নীতিটি পরিবর্তন করার সময় এসেছে?
মেয়েটির নাম আঙেলিকা রাউবাল। হিটলারের সৎবোনের মেয়ে ভাগ্নি। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে কিঞ্চিৎ অসুবিধা আছে সত্য কিন্তু তেমন কোনও অলঙ্ঘ্য আপ্তবাক্যপ্রসূত নিষেধ নেই।(১) মেয়েটির মা বিধবা, সামান্য যে পেনশন পায় তাতে দুই কন্যাসহ জীবনযাপন সহজ নয়; এদিকে যে ছোট বৈমাত্রেয় ভাই অ্যাডলকে তার বহু দোষ– তার মারাত্মক গোটা তিনেক পূর্বেই নিবেদন করেছি– থাকা সত্ত্বেও তাকে ছেলেবেলা থেকেই গভীরভাবে স্নেহ করেছে, সেই অ্যাডলফ এখন সচ্ছল হওয়ার দরুন আপন জন্মভূমি অস্ট্রিয়ার কাছেই সীমান্তের লাগোয়া অঞ্চলে মুনিক থেকে একশো মাইল দূরে বেৰ্ষটেশগাডেনে বাড়ি কিনে তাঁকে অনুরোধ করেছে সীমান্তের এপারে এসে সে বাড়ির জিম্মা নিতে। বেচারা অ্যাডলফুকে বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয় মুনিক শহরে রাজনীতি নিয়ে, সময় পেলে ওই গ্রামের নতুন বাড়িতে গিয়ে যেন একটুখানি আরাম পায়। তদুপরি এ তথ্য সর্বজনবিদিত যে, আঙেলিকা রাউবালের মা, হিটলারের এই সৎবোনটি যেমন বাড়ি চালাতে জানে, অতিথিসজ্জনের সেবা করাতে নিপুণা, তেমনি পাচিকারূপে সমস্ত নগরীতে অতুলনীয়া।(২) স্বভাবতই সঙ্গে নিয়ে এলেন দুই মেয়েকে। এদের বড়টিই আঙেলিকা বা গেলি।
