এর প্রায় তেরো বছর পর এই আর্টিস্টদের অন্যতম, সিলার যখন যুদ্ধে পরাজয় মনোবৃত্তি প্রকাশের ফলে নাৎসি গেস্তাপো পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দীর্ঘ কারাবাসের পর মুক্তির আশা সম্বন্ধে নিরাশ হয়ে গিয়েছেন তখন তিনি যে একদা গেলির ছবি এঁকেছিলেন (যদিও কারও কারও মতে তিনি আর্টিস্ট হিসেবে ছিলেন অতিশয় মামুলি) সে কথা হিটলারকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি তাঁকে তদ্দশ্যেই মুক্তি দেন।
হফমানের বিশ্বাস, গেলির সঙ্গে হিটলারের যদি পরিণয় হত তবে হিটলারের জীবন এরূপ শোচনীয় পরিসমাপ্তি পেত না। তাঁর মতে, শতধাবিভক্ত জৰ্মনিকে একাঙ্গ করে তাকে নব জীবনরস দিয়ে তিনি পুনরুজ্জীবিত করতেন নিশ্চয়ই, কিন্তু জর্মনির বাইরে যেসব বিবেচনাহীন অভিযানে বেরুলেন, সেখানে পারিবারিক শান্তি এবং তৃপ্তি– হিটলার যেটাকে অসীম মূল্য দিতেন– তথা গেলির তীক্ষ্ণবুদ্ধি, হিটলারের ওপর তার অসীম প্রভাব তাঁকে সংযত করে নিরস্ত করত– তাঁর অন্তিম নিশ্বাস বীভৎসতাময় পরিবেশে ত্যাগ না করে শান্তিতেই ফেলতে পারতেন।
হফমান বলেন, তার পরে যখনই গেলির কথা উঠেছে, হিটলারের চোখ জলে ভরে যেত। এবং একাধিক পরিচিতজনকে হিটলার স্বয়ং বলেছেন, জীবনে ওই মাত্র একবারই তিনি ভালোবেসেছিলেন।
***
গেলির মৃত্যুর চৌদ্দ বছর পর, হিটলার, আত্মহত্যা করার প্রায় দেড় দিন পূর্বে, এফা ব্রাউনকে বিয়ে করেন এবং তাঁর সম্বন্ধে কৌতূহল পৃথিবীবাসীর এখনও যায়নি। কিন্তু তার বর্ণনা এর সঙ্গে যায় না।
আমি হিসাব করে দেখেছি, হিটলারের জীবনে তিনটি দুর্দৈব দেখা দেয়। প্রথম দুটিতে তিনি প্রায় ভেঙে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যেতেন পাঠক আদৌ ভাববেন না, গ্যাস-চেম্বার নির্মাতার অন্য কোনও দিকে কোনও প্রকারের স্পর্শকাতরতা থাকে না, (তা হলে কসাইয়ের ছেলে মরলে সে কাঁদত না) এবং এঁরা অসাধারণ জীব বলে সে-সব স্থলে তাঁদের স্পর্শকাতরতা হয় অসাধারণ সূক্ষ্ম, তাঁদের বেদনানুভূতি প্রায় অনৈসর্গিক তীব্র–তৃতীয়বারের ঘটনা সকলেই জানেন। সেবার তিনি নিষ্কৃতি পাননি। আত্মহত্যা ছাড়া তখন তার আর অন্য কোনও গতি ছিল না। প্রথম দুর্দৈব তাঁর মাতার মৃত্যু। হিটলার তখন বালক, কিন্তু সেই বালকই তার মাকে যা সেবা করেছে সেটা অবর্ণনীয়, অবিশ্বাস্য– শুধু বলা যেতে পারে, স্বর্গজাত ভক্তি-প্রেমরস যেন ওই মাত্র একবার পৃথিবীতে হিটলার-জননীর মৃত্যুশয্যাপাশ্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাঁর বাল্যবন্ধু তখনকার দিনের হিটলার ও মাতার মৃত্যুর পর তাঁর অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। এরকম বর্ণনা আমি আর কোথাও পড়িনি। সেবারে তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িতা মাতার শয্যাপার্শ্বে টুলের উপর বসে বসে কাটিয়েছিলেন দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি, সেবা করেছেন সমস্ত হৃদয় ঢেলে দিয়ে।
দ্বিতীয় দুর্দৈব– গেলির আত্মহত্যা।
তৃতীয়বারে– এবং শেষবারের মতো তিনি সুযোগ পেলেন সেই পায়চারি করার।
তার খাস চাকর লিঙে তার বর্ণনা দিয়েছেন। শুধু লিঙে দেখেছিলেন কাছের থেকে বলে তন্ন। তন্ন করে বর্ণনা দিতে পেরেছেন, আর হফমান নিচের তলা থেকে শুনতে পেয়েছিলেন শুধু!
কিন্তু হায়, তাঁর শেষ পদচারণার পূর্বেই তার স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তার শরীরের সম্পূর্ণ বাঁ দিকটা সমস্তক্ষণ কাপে (পার্কিনসন ব্যাধি কিংবা সেন্ট ভাইরাসের নৃত্য রোগ) বা হাতটা এত বেশি স্বেচ্ছায় স্বাধীনভাবে ঘন ঘন ওঠে নামে যে পায়চারি না করার সময়ও সেটাকে প্রায়ই তিনি ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা দিতেন। বাঁ পা-টাকে ঘষ্টে ঘষ্টে টেনে টেনে তাঁকে চলাফেরা করতে হয়, আর দু চোখের উপর কখনও-বা ফিমের মতো বাম্পাভাস, আর কখনও-বা অস্বাভাবিক তীব্র, উজ্জ্বল জ্যোতির মতো।
এই বেদনাদায়ক অবস্থায় যখন সাধারণ জন শুয়ে-বসেও শান্তি পায় না, তখন হিটলার দু হাত পিছনে নিয়ে সজোরে ডান হাত দিয়ে বা হাত চেপে ধরে বাঁ পা টেনে টেনে– যেন কোনও জড়পদার্থ, তিনি আপন দেহ দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন– আরম্ভ করলেন সেই প্রাচীন দিনের পায়চারি। মাঝে মাঝে দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে তার উপর মুষ্ট্যাঘাত করেন– কারাবাসী-জন যে-রকম করে থাকে; তবে কি তিনি শহরের চতুর্দিকে শত্রুসৈন্য বেষ্টিত হয়ে কারাবন্দির অনুভূতিই অনুভব করেছিলেন? কিন্তু হায়, এখন তিনি শক্তিহীন জরাজীর্ণ। প্রহরের পর প্রহর, দিনের পর দিন পদচারণা করার দৈহিক শক্তি আর নেই। তাই মাঝে মাঝে বসেন চেয়ারের উপর আর শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকেন দেওয়ালের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
কিন্তু এখন আর কী প্রয়োজন পদচারণের?
সেদিন গেলির মৃত্যুর পর উত্তেজিত হয়ে তুমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়চারি করে সে উত্তেজনা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলে। এবার যে ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার! শত্রুর হাতে অসীম যন্ত্রণা, অশেষ অপমানের পর হয়তো ফাঁসি। এবার তোমার আত্মহত্যার পালা।
তবু পদচারণ করো, হিটলার।
একদা গেলি চলে যাওয়ার পর করেছিলে অস্থির পদক্ষেপ, এবার গেলির সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রাক্কালে অবশ্য দেহ টেনে টেনে।
———–
১. বোধহয়, তারই কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ স্ট্রাসারকে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন জোলাপের (এটার উল্লেখ আমরা একাধিকবার করেছি) সময় মেরে ফেলা হয়।
