ধীরে মন্থরে দিনটা তার সীমান্তের দিকে এগিয়ে চলল, তার পর এল আরেকটা রাত্রি, সেটা আগেরটার চেয়েও বিভীষিকাময়। আমি আমার সহ্যশক্তি, আত্মকর্তৃত্বের শেষ সীমানায় পৌঁছে গিয়েছি। জেগে থাকা আমার পক্ষে এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে; ওদিকে উপরে সেই পায়চারি চলেছে তো চলেছে অবিরাম, আর তার শব্দ যেন কেউ তুরপুন দিয়ে আমার খুলি ফুটো করে ভেতরে ঢোকাচ্ছে। যেন এক ভয়াবহ উত্তেজনা তাঁকে তার পায়ের উপর রেখে চলেছে এবং কিছুই তাঁকে ক্লান্ত করতে পারে না।
তার পর এল আরেকটা দিন। আমি নিজেই তখন যে কোনও মুহূর্তে আপন সম্পূর্ণ অনিচ্ছায় জড়ন্দ্রিায় অভিভূত হয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকতে পারি। আমার নড়াচড়া, আমার কাজকর্ম করা সবকিছু যন্ত্রচালিত বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা অনিয়ন্ত্রিত অন্ধশক্তির প্রকাশ মাত্র। কিন্তু মাথার উপরে পদধ্বনি কখনও থামেনি।
সন্ধ্যা ঘনানোর পর আমরা শুনলুম, গেলির গোর হয়ে গিয়েছে, এবং হিটলারের সে গোরের দিকে তীর্থযাত্রারম্ভ করতে কোনও অন্তরায় নেই। সেই রাত্রেই আমরা রওনা দিলুম। নিঃশব্দে হিটলার ড্রাইভার শ্রেকের পাশে বসলেন। আমার উপরে যে অসহ্য চাপ আমাকে ধরে রেখেছিল সেটা যেন হঠাৎ ছিঁড়ে দু-টুকরো হয়ে গেল আর আমি গাড়ির ভেতর সেই অবসাদজনিত অঘোর নিদ্রায় ঘণ্টাখানেক কিংবা দুই ঘুমিয়ে নিলুম। ভোরের দিকে আমরা ভিয়েনা পৌঁছলুম, কিন্তু এই সমস্ত দীর্ঘ চলার পথে হিটলার একটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করেননি।
আমরা সোজা নগরের ভেতর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে কেন্দ্রীয় গোরস্তানে পৌঁছলুম। এখানে এসে হিটলার একা গোরের দিকে গেলেন। সেখানে পেলেন তাঁর নিজস্ব দুই এডিকং শ্বাস এবং শাউব– তারা সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আধঘণ্টার ভেতরই তিনি ফিরে এলেন এবং গাড়ি ওবের-জালসূবের্গে চালিয়ে নিয়ে যেতে হুকুম দিলেন।
গাড়িতে উঠতে না উঠতেই তিনি কথা আরম্ভ করলেন। উইন্ডস্ক্রিনের ভেতর দিয়ে তিনি স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে যেন আত্মচিন্তা করছিলেন, কিন্তু স্পষ্ট কথা বলে বলে। আচ্ছা! তাই সই! বললেন তিনি। আরম্ভ হোক তবে সংগ্রাম– যে সগ্রাম শিরোপরি কৃতকার্যতার বিজয়মুকুট পরবেই পরবে, পরতে বাধ্য। আমরা সকলেই বিধির এক বিরাট আশীর্বাদ-প্রাপ্ত স্বস্তি অনুভব করলুম।…
এর পর হিটলার আঁপিয়ে পড়লেন তাঁর বক্তৃতাসফরে। আজ এখানে কাল সেখানে এমনকি একই দিনে দু-তিন ভিন্ন ভিন্ন নগরে বক্তৃতা দিয়ে যেতে লাগলেন। সেগুলো আগের চেয়ে যেন শ্রোতাদের করে দেয় অনেক বেশি আত্মহারা, যেন তাদের চিন্তাধারাকে তিনি হুকুম দিয়ে বাধ্য করছেন তারা যাবে কোন পথে। এবং শ্রোতাকেও বক্তৃতা দিয়ে আপন মতে টেনে আনার শক্তি যেন তার বেড়ে গেছে শতগুণে। হফমান বলছেন, এই শহর থেকে শহর ছুটোছুটি, প্রথমে জর্মনির সবচেয়ে শক্তিশালী মোটর মেসেডেজে করে, পরে আপন অ্যারোপ্লেনে (অনেকেই বলেন রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার জন্য ইওরো-আমেরিকায় হিটলারই সর্বপ্রথম নিজস্ব হাওয়াই জাহাজ ব্যবহার করেন এই ব্লিস্ প্রোপাগান্ডা যেন পরবর্তী যুগের ব্লিৎসক্ৰিগের পূর্বাভাস।); এখানে বিরাট বিরাট জনসভা, শ্রোতাদের চিৎকার করতালি, মিটিংশেষে উন্মত্ত জনতার প্ল্যাটফর্ম আক্রমণ– ফুরারকে কাছের থেকে দেখার জন্য এসব হট্টগোল ধুন্ধুমারের ভেতর হিটলার যেন গেলির শোক নিমজ্জিত করে দিতে চাইছিলেন।
এর তিন সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবুর্গ আলাপ-আলোচনার জন্য হিটলারকে ডেকে পাঠান, সে কথা পূর্বেই বলেছি; যারা বলেন, সে আলোচনা নিষ্ফল হওয়ার কারণ গেলির শোকে হিটলার এমনই মোহাচ্ছন্ন ছিলেন তাঁর দাবি তিনি যথোপযুক্ত ভাষা ও দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করতে পারেননি, ব্যক্তিগতভাবে আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। আমি বরঞ্চ হফমান যা বলেছেন তার সঙ্গে একমত। আমার মনে হয়, তখনও হিডেনবুর্গ তাঁর চিরপরিচিত প্রাচীনপন্থী আপন চক্রের ভেতরকার নেতাদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিরাশ হননি। তখনও হিটলারের সময় হয়নি।
***
গেলির জীবন, তার মৃত্যু, তার স্মৃতি সবকিছু ধর্মে উদাসীন হিটলারকে যেন এক নতুন অনুষ্ঠানবেষ্টিত সংস্কার-বিশ্বাসী করে তুলল। তিনি স্বহস্তে গেলির কামরা চাবি বন্ধ করে দিয়ে হুকুম দিলেন, একমাত্র গৃহরক্ষিণী ফ্রাই ভিন্টারেরই সেখানে প্রবেশাধিকার। বহু বছর ধরে তিনি প্রতিদিন গেলির প্রিয় ফুল তাজা ক্রিসেনথিমাম সে ঘরে রাখতেন। বেৰ্ষটেশগাডেনের বাড়িতে এবং পরবর্তী যুগে ফুরার যখন দেশের সর্বাধিকারী (তিনি প্রথমে চ্যানসেলর বা প্রাইম মিনিস্টাররূপে রাজ্যভার গ্রহণ করেন, এবং বছর দেড়েক পর প্রেসিডেন্ট গত হলে তিনি সে পদ পূর্ণ না করে নিজেই গ্রহণ করে পরিপূর্ণ ডিকটেটর নিরঙ্কুশ নেতা ফুরার হন) তখন রাজভবনে গেলির ছবি বিরাজ করত সর্বত্র। বছরে দুই দিন তার জন্মদিন আর মৃত্যুদিন রুচিসম্মত আড়ম্বরে উদযাপিত হত। সর্বোকৃষ্ট চিত্রকর ও ভাস্করদের দেওয়া হল গেলির নানা অবস্থায় তোলা নানাবিধ ফোটোগ্রাফ। সেগুলোর ওপর নির্ভর করে উত্তম ওয়েলপেন্টিং মূর্তি নির্মিত হল। জর্মনির অন্যতম উক্তৃষ্ট শিল্পী, তখনকার দিনের সর্বোকৃষ্টদের একজন– গেলির একটি অনবদ্য ব্রোঞ্জু মূর্তি নির্মাণ করেন। এদের একটা না একটা হিটলারের প্রতি বাসভবনে সর্বোচ্চ সম্মানের স্থানে রাখা হত।
