হিটলারের গলা। হফমান, এখনও জেগে আছ কি? কয়েক মিনিটের তরে আমার এখানে আসতে পার কি? হিটলারের গলা বটে কিন্তু কেমন যেন অদ্ভুত অচেনা। সে কণ্ঠ ক্লান্ত আর সর্ব অনুভূতি গ্রহণে জড়ত্বে চরমে গিয়ে পৌচেছে। পনেরো মিনিট পরেই আমি তার কাছে পৌঁছলুম।
দরজা তিনি নিজেই খুলে দিলেন। অভ্যর্থনাসূচক কোনও কথা না বলে নীরবে তিনি আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন তাঁকে দেখাচ্ছে বিরস; যেন সর্ব আত্মজন বিবর্জিত। বললেন, হফমান, আমাকে তুমি সত্যিকার একটি মেহেরবানি করবে কি? আমি এ বাড়িতে আর টিকতে পারছিনে, যেখানে আমার গেলি মরে গেছে; মুলার টেগার্নজে হ্রদের উপর তার সেন্ট কুইরিনের বাড়ি আমাকে থাকতে দিতে চেয়েছে; তুমি আমার সঙ্গে আসবে? গেলির কবর না হওয়া পর্যন্ত সে কটা দিন আমি সেখানে থাকতে চাই। ম্যলার কথা দিয়েছে। সে ও-বাড়ির চাকর-বাকর সব কটাকে ছুটি দিয়ে ওখান থেকে সরিয়ে দেবে। একমাত্র তুমিই সেখানে থাকবে আমার সঙ্গে। আমাকে এ অনুগ্রহটা তুমি করবে কি? তাঁর কণ্ঠস্বরে ছিল সনির্বন্ধ মিনতির অনুনয়; বলা বাহুল্য আমি তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানালুম।
সেন্ট কুইরিন বাড়ির প্রধান ভূত্য বাড়ির চাবিটা আমার হাতে তুলে দিল। বিস্ময় এবং সহানুভূতির দৃষ্টি দিয়ে শোকাঘাতে ভেঙেপড়া হিটলারের দিকে একবার তাকিয়ে সে চলে গেল। শোফার শ্রে আমাদের সে বাড়িতে পৌঁছিয়ে দেওয়ার পর তাকেও ফেরত পাঠানো হল। চলে যাওয়ার আগে সে কোনও গতিকে সুযোগ করে আমাকে কানে কানে বলে গেল, সে হিটলারের রিভলবার সরিয়ে নিয়েছে, কারণ তার ভয় পাছে নৈরাশ্যের চরমে পৌঁছে তার আত্মহত্যা করার প্রলোভন হয়। এবারে রইলুম সুন্ধুমাত্র আমরা দুজন– আর একটিমাত্র জনপ্রাণী নেই। হিটলার উপরের ঘরে আর আমি ঠিক তার নিচের ঘরটায়।
সে-বাড়িতে হিটলার আর আমি মাত্র এই দুজন। আমি তাঁকে তাঁর ঘর দেখিয়ে বেরিয়ে যেতে না যেতেই তিনি দু হাত পিছনে নিয়ে এক হাতে আরেক হাত ধরে পায়চারি করতে আরম্ভ করে দিয়েছেন। আমি জিগ্যেস করলুম, তার খেতে ইচ্ছে করছে কি না, একটিমাত্র শব্দ না বলে তিনি শুধু মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালেন। আমি তবু এক গেলাস দুধ আর কিছু বিস্কুট উপরে নিয়ে তার ঘরে রেখে এলুম।
আমি আপন কামরার জানালার কাছে দাঁড়িয়ে শুনলাম উপরের পায়চারির তালে তালে ওঠা ভারি শব্দ। ঘন্টার পর ঘন্টা চলল সেই পায়চারি– একবারও ক্ষান্ত দিল না, একবারও জিরুল না। রাত্রির অন্ধকার ঘনিয়ে এল– আমি তখনও শুনছি তার একটানা পায়চারি ঘরের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত, ফের ওই প্রান্ত থেকে এ প্রান্ত। সেই একটানা শব্দের মোহে আমি অল্প কিছুক্ষণের জন্য তন্দ্রাচ্ছন্নই হয়ে গিয়েছিলুম। হঠাৎ কী যেন আচমকা ধাক্কা মেরে জাগিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ সচেতন করে দিলে। পায়চারি বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আর যেন মৃত্যুর নীরবতা চতুর্দিকে বিরাজ করছে। আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালুম। তবে কী করছেন হিটলার এখন…? অতি সন্তর্পণে এবং মৃদু পদক্ষেপে আমি যেন লুকিয়ে উপরের তলায় গেলুম। উঠবার সময় কাঠের সিঁড়ি অল্প অল্প কাঁচ ক্যাচ শব্দ করল। আমি দরজায় পৌঁছতেই– ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আবার পায়চারিটা আরম্ভ হল। বুকের বোঝা যেন অনেকটা হালকা হয়ে গেল; আমি চুপিসারে আপন ঘরে ফিরে এলুম।
এবং এইভাবে চলল সমস্ত দীর্ঘ রাত ধরে সেই পায়চারি– ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অন্তহীন দীর্ঘ ঘণ্টা। আমার মন চলে গেল আমাদের বিগত একাধিকবার এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-পরিপূর্ণ টেগার্নজে হ্রদের কোলে লালিত বাড়িতে আসার স্মরণে। তখন সবকিছু কতই-না সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
গেলির মৃত্যু আমার বন্ধুর গভীরতম সত্তাকে নাড়া দিয়ে কাঁপিয়ে তুলেছে। তবে কি তিনি নিজেকে তার জন্য দায়ী অনুভব করছিলেন। তিনি কি অনুতপ্ত আত্ম অভিযোগ দিয়ে আপন সত্তাকে কঠোরতম যন্ত্রণা দিচ্ছিলেন। তিনি এখন করবেনই-বা কী? এ ধরনের অনেক প্রশ্ন আমার মাথার ভেতরে ক্রমাগত হাতুড়ি পেটাচ্ছিল, আর আমি খুঁজে পাচ্ছিলুম না একটারও উত্তর।
উষার প্রথম আবির্ভাব অন্ধকার আকাশকে আলোকিত করে তুলছিল, এবং আমি আমার জীবনে উষাগমনে হৃদয়ের ভেতর কখনও এতখানি কৃতজ্ঞ অনুভব করিনি। আমি আবার উপরে গিয়ে তার দরজায় মৃদু করাঘাত করলুম। কোনও উত্তর এল না। আমি ভিতরে গেলুম কিন্তু হিটলার আমার উপস্থিতি সম্বন্ধে বিস্মৃতিতে নিমগ্ন হয়ে আমাকে লক্ষমাত্র করলেন না। দেহের পিছনে এক হাত দিয়ে অন্য হাত ধরে সুদূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে কিন্তু কোনও জিনিস না দেখে, তিনি তাঁর অন্তহীন পায়চারি চালিয়ে যেতে লাগলেন। যন্ত্রণায় তার মুখের রঙ পাশুটে, ক্লান্তিতে সেটা ঝুলে পড়েছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি চেহারাটাকে করে দিয়েছে বিষদৃশ, চোখদুটো ডুবে গিয়েছে কোটরের গভীরে, সেগুলোর নিচের অংশ কালো কৃষ্ণমসীলিপ্ত আর ঠোঁটদুটো একটা আরেকটাকে চেপে ধরে এঁকেছে যেন তিক্ত অভিশপ্ত একটি রেখা। দুধ আর বিস্কুট স্পর্শ করা হয়নি।
চেষ্টা করেও সামান্য একটা কিছু খাবেন না তিনি, প্লিজ? আমি শুধালুম। আবার কোনও উত্তর এল না, শুধু সামান্য একটু মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালেন। আমি মনে মনে ভাবলুম, অন্তত অল্প কিছু একটা ওঁকে খেতেই হবে, নইলে তিনি যে হুমড়ি খেয়ে ভিরমি যাবেন। আমি মুনিকে আমার বাড়িতে ফোন করে শুধালুম গেত্তি কী করে রাঁধতে হয়? হিটলারের অন্যতম প্রিয় খাদ্য এটি। সেখান থেকে পাক-প্রণালীর যে দিকনির্দেশ পেলুম বর্ণে বর্ণে সেই অনুযায়ী আমি রন্ধনকলায় আমার নৈপুণ্য আছে কি না সেই পরীক্ষাতে প্রবেশ করলুম। আমার নিজের মতে ফলটা ভালোই ওত্রালো। কিন্তু আবার আমার ভাগ্য বাম। যদিও এই ধরনের গেত্তি তাঁর প্রিয় খাদ্য, যদিও আমি আমার রন্ধন-নৈপুণ্য প্রশংসায় প্রশংসায় সপ্তম স্বর্গ অবধি তুলে দিয়ে তাঁকে অনুনয়-বিনয় করলুম, চেষ্টা দিয়েও অতি অল্প একটুখানি মুখে দিতে–আমার মনে হল আমি যা কিছু বলেছি, সে তার দু পাশ দিয়ে চলে গেছে, তিনি তার এক বর্ণও শোনেননি।
