সৃষ্টিকর্তার লীলা বোঝে কে? একদিন সত্য সত্যই খবর এল বাওরাদি অনেকেই মুক্তিলাভ করবেন। একদল বন্দি যাবেন মস্কো থেকে পশ্চিম জর্মনির মুনিক যেখানে বাওরের মা-বউ আছেন। এ মুক্তির যাত্রার বর্ণনা দিতে গিয়ে বার বলেছেন, The memory of that journey is like a film that keeps breaking off. fola 17010 Mars foose দিয়ে ট্রেন যাবার সময় উল্লাসে উত্তেজিত জনতা ছুটে আসছে ট্রেনের দিকে, বাচ্চাদের হাতে রঙিন ফানুসের ভেতর জ্বলন্ত মোমবাতি, গির্জায় গির্জায় চলেছে অবিরত হর্ষোল্লাসের ঘণ্টাধ্বনি। নার্সরা ছুটে আসছে খাবার নিয়ে
থাক। আমার কলমফ অতি সাধারণ; এসবের সার্থক বর্ণনা দিতে পারেন যাদের লেখনী অসাধারণ, কিংবা বাওরের মতো লোক যারা লেখক নন কিন্তু অভিজ্ঞতাটা আছে।
এবং এর করুণ দিকটা বাওর চেপে গেছেন। যেসব পিতা-মাতা-জায়া এসেছিল আপন আত্মজনের প্রত্যাশায়– যদিও তাদের বলা হয়েছে যে, সেসব আত্মজনের অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত, কিংবা মুক্তি পাবে কি না স্থির নেই– এবং যারা ফিরেছে তাদের নাম উচ্চকণ্ঠে পড়া শেষ হয়ে গেলে যখন বুঝল তাদের আত্মজন ফেরেনি, তখন—
***
আডেনাওয়ারের কীর্তিকলাপ একদিন হয়তো বিশ্বজন ভুলে যাবে, কিন্তু বহু বহু জর্মন পরিবার কি বংশপরম্পরায় স্মরণে আনবে না, কে তাদের পিতা, পিতামহ, বা প্রপিতামহকে একদা ফিরিয়ে এনেছিল তার বিস্মৃতপ্রায় সুখী নীড়ে, দারাপুত্র পিতামাতার মাঝখানে? যার অবশ্যম্ভাবী গোর ছিল সুদূর সাইবেরিয়ার অন্তহীন তুষারান্তরণের নিম্নে, সে কার দৈববলে হঠাৎ একদিন ফিরে এসে মুছে দিল জননীজায়ার আঁখিবারি!
[জুন, ১৯৬৭।]
———–
১. এখানে রোমান জাত একটা কলোনি স্থাপন করে ও নেরোর (যিনি রোম পুড়িয়েছিলেন) মা, মহারানি (Colonia) Claudia Ara Agrippinesis-এর (Colony) Colonia নাম দেয়। এই Colonia থেকে ফরাসি ইংরেজি Cologne, জর্মনে Koeln.
২. হিটলারের বিশ্বাস ছিল, ইহুদি ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত নির্বীর্য কাপুরুষের আশ্রয়স্থল খ্রিস্টধর্ম ইয়োরোপের সর্বনাশ করেছে, এবং এ ধর্ম ইয়োরোপে ছড়ানোর পিছনে রয়েছে ইহুদিদেরই (!) এক অভিনব কৌশল। আবার হিটলার মনে করতেন খ্রিস্টজন্মের পূর্বে যেসব রোমান সৈন্য প্যালেস্টাইনে মোতায়েন ছিল খ্রিস্ট তাদেরই কোনও একজনের জারজ সন্তান।
৩. ওই সময়ে আমি বন্ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করি ও আডেনাওয়ারের খ্যাতি-প্রতিপত্তি সম্বন্ধে সতীর্থদের কাছ থেকে বহু প্রশস্তি শুনতে পাই। তার সম্বন্ধে যেসব সংবাদ খবরের কাগজে ও লোকমুখে এসে পৌঁছত সেগুলো ১৯৩৩ পর্যন্ত যাচাই করে নেওয়া যেত। ওই বছরে হিটলার ক্ষমতা গ্রহণ করার ফলে প্রেসের স্বাধীনতা লোপ পায়। কাজেই যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হিটলার-বৈরীদের সম্বন্ধে কোনও পাকা খবর পাওয়া যেত না। যুদ্ধের পর শ্রীযুক্ত ভাইমার আডেনাওয়ার সম্বন্ধে একখানি প্রামাণিক গ্রন্থ লেখেন। সেখানা জোগাড় করতে পারিনি বলে আমার জানা তথ্য ও তত্ত্ব যাচাই করে নিতে পারছিনে। বিশেষ করে ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত আডেনাওয়ার গোপনে নাৎসিদের বিরুদ্ধে কী কী করেছিলেন সেসব খবর নিশ্চয়ই এই বইয়ে আছে। আডেনাওয়ারের মৃত্যুর পর থেকে কলন রেডিও মাঝে মাঝে ওই বই থেকে কিছু কিছু পড়ে শোনায়। এ প্রবন্ধে আমি তার সাহায্য নিয়েছি।
৪. বাত্তর, হিটলারজ পাইলট।
৫. Stephen Spender, European Witness; ১৯৪৬ মাসখানেক পূর্বে যখন কেলেঙ্কারি কেচ্ছা বেরুল যে মারকিন গুপ্তচর বিভাগ Encounter কাগজকে গোপনে অর্থ সাহায্য করে, তখন তিনি কাগজের সম্পাদকপদ ত্যাগ করেন।
৬. জর্মনগণ বৃদ্ধ আডেনাওয়ারকে ভক্তি ও ভালোবাসাসহ ডাকনাম দেয় ড্যার আলটে, (ওল্ড ম্যান), তার পরের চ্যানসেলারকে সহাস্যে ডাকনাম দেয়, ড্যার ডিকে (ফ্যাট ম্যান)।
৭. আডেনাওয়ার গত হন ভারতীয় সময় অনুযায়ী বিকেল ৫.৫১ মিনিটে। যে জর্মন বেতার ভারতের জন্য প্রোগ্রাম দেয় সেটি আডেনাওয়ারের প্রিয় কলনেই অবস্থিত সে ভারতের প্রোগ্রাম আরম্ভ করে বিকেল ৬.৫০ মিনিটে। আমি তখনই খবরটা শুনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এর পর, পরপর কয়েকদিন সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর দরুন হয় বিজলি বন্ধ হয়ে যায় বলে, নয় রিসেপশন খারাপ ছিল বলে বকে, গার্সটেনমায়ার তথা চ্যানসেলার কিজিংগারের বক্তৃতা ভালো করে বোঝা যায়নি। ২৫ এপ্রিল গোরের দিনও আবহাওয়া খারাপ ছিল।
গেলির আত্মহত্যায় হিটলারের শোক
হিটলারের চরিত্রবল ছিল অসাধারণ এবং তাঁর ভেঙে পড়াটাও ছিল অসাধারণ। তবে যে দুটো ভেঙে পড়ার কারণ ইতিহাসের জানা আছে তার শেষটা আত্মহত্যা করার কয়েক দিন আগে থেকে তার খাস-চাকর (ভ্যালে) লিঙে সেটির কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেন, এবং গেলির মৃত্যুর পর। দুটো প্রায় একই প্রকারের।
প্রথম দু দিনের খবর কেউ ভালো করে লেখেননি, তবে তখনকার দিনের অন্যতম প্রধান নাৎসি নেতা গ্রেগর স্ট্রাসার পরে বলেন যে, এ দু দিন তিনি এক মুহূর্ত হিটলারের সঙ্গ ত্যাগ করেননি, পাছে তিনিও আত্মহত্যা করেন।(১)
এর পর তাঁর সঙ্গে ছিলেন, একমাত্র সাক্ষীরূপে, আমাদের পূর্বপরিচিত হন। এবার তাকে অক্ষরে অক্ষরে অনুবাদ ভিন্ন গত্যন্তর নেই। এটা সত্যই ওয়ান ম্যান্স স্টোরি। তিনি বলছেন, মুনিকে ফেরার পর দু দিন পর্যন্ত হিটলারকে আমি আদৌ দেখতে পাইনি। তার স্বভাব আমি ভালো করেই জানতুম, এবং বর্তমান শোচনীয় পরিস্থিতিতে আমি উত্তমরূপেই হৃদয়ঙ্গম করেছিলুম যে, তিনি হয়তো নির্জনে একা একা থাকাটাই বেশি পছন্দ করবেন– আমিও তাই তাঁর পাশ ঘেঁষিনি। তার পর হঠাৎ মাঝরাতে টেলিফোনের ঘণ্টা বাজল। নিদ্রাজড়িত অবস্থায় আমি গেলুম উত্তর দিতে।
