আডেনাওয়ার আপন দেশকে বঞ্চিত করেননি, পরিবারের প্রিয়জনকেও বঞ্চিত করেননি।
যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্বার্থপরতা তথা আত্মম্ভরিতার বিকৃত রূপ ধারণ করে সে কখনওই কোনও প্রকারের ত্যাগ বরণ করতে পারে না, কিন্তু যে উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আদর্শবাদ অঙ্গাঙ্গী বিজড়িত সেখানে প্রকৃত মহাপুরুষ সামান্য শিশুটির দাবির মূল্যও দিতে জানেন। রাজকার্য, সমাজসেবা, রাষ্ট্রের আহ্বান– এসব গালভরা কথার দোহাই দিয়ে যারা শিশু, বৃদ্ধ, আতুর-অকর্মণ্য জনকে অবহেলা করে তাদের আদর্শবাদ-এর অস্থিমজ্জা তাদের আপন স্বার্থপরতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে গঠিত।
শিষ্যসমাবৃত হয়ে প্রভু যিশু ইহজীবনের উচ্চতর আদর্শ, পরজীবনের চরম কাম্য নিয়ে যখন আলোচনা করছেন, উপদেশ দিচ্ছেন, তখনও তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি যে, শিশুরা তাঁর কাছে আসতে চায়। আদেশ দিলেন– শিশুদের আসতে দাও আমার কাছে।
শিষ্যেরা যিশুকে জিগ্যেস করলেন, Who is the greatest in the Kingdom of heaven?
And Jesus called a little child unto him, and set him in the midst of them.
***
হিটলারের আত্মহত্যার কাহিনী আমি অন্যত্র লিখেছি। তার আত্মহত্যার পর কী হয়েছিল সেটা তার চেয়ে কিছুমাত্র কম বিস্ময়জনক ও কৌতূহলোদ্দীপক নয়, বিশেষত নরদানব মারটিন বরমান তার সঙ্গে বিজড়িত আছেন বলে। কিন্তু সে কাহিনী ভিন্ন এবং এখানেও আমি মাত্র সেইটুকুরই সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করব, যেটুকু আডেনাওয়ারের ব্যক্তিত্ব হৃদয়ঙ্গম করার জন্য নিতান্তই প্রয়োজন।
হিটলার যে সময়ে আত্মহত্যা করেন (বেলা ১৫.৩০/৪৫, ৩০ এপ্রিল ১৯৪৫), সে সময়ে রুশবাহিনী মাত্র কয়েকশো গজ দূরে তার বাসভবনের চতুর্দিকে বৃহ নির্মাণ করেছে। এ ব্যুহ ভেদ করে মার্কিন অধিকৃত অঞ্চলে পৌঁছাবার চেষ্টা করেন তার নিতান্ত অন্তরঙ্গ সাঙ্গোপাঙ্গ এবং কর্মচারীবৃন্দ যাঁরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেননি। এঁদের ভেতর ছিলেন। সেক্রেটারি বরমান, দুই মহিলা স্টেনো, পাচিকা, খাসচাকর লিঙে, দেহরক্ষী-দল, সার্সন, শোফার ইত্যাদি ইত্যাদি। এঁদের অন্যতম হিটলারের খাস পাইলট বাওর-সৈন্যবাহিনীতে তার র্যাঙ্ক ছিল জেনারেলের। ইনি পালাবার সময় শুধু যে ধরা পড়েন তাই নয়, মেশিনগানের গুলিতে একখানা পা এমনই জখম হয় যে পরে সেটা কেটে ফেলতে হয়।
দীর্ঘ দশটি বছর রাশার খ্যাত-কুখ্যাত বহু প্রকারের জেল, সেল, বন্দি-শিবিরে অবর্ণনীয় কষ্টযন্ত্রণা ভোগ করার পর ইনি মুক্তি পান। পূর্বেই বলেছি দেশে ফিরে একখানা বই লেখেন যার নাম, হিটলারজ পাইলট। পূর্ণ দশটি বছর বাওর এবং অন্যান্য জর্মন বন্দিরা কী নিদারুণ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে সক্ষম হন তার বর্ণনা দেবার মতো কল্পনাশক্তি, স্পর্শকাতরতা, কলমের জোর আমার কিছুই নেই। যে নিপীড়নে মানুষ হাঙ্গার স্ট্রাইক করে, ছুটে গিয়ে দেয়ালে মাথা ঠুকে আত্মহত্যার চেষ্টা দেয় তার বর্ণনা দিয়েছেন বাওর। আমার কাছে যেটা নিদারুণতম বলে মনে হয় সেটা পরিপূর্ণ নৈরাশ্যের তমিস্র অন্তহীন রজনী– এ বন্দিদশা থেকে ইহজন্মে আমার মুক্তি নেই।
এবং আমার মনে হয়, তার চেয়েও কষ্টের বিকৃত ভান ত্রাসের বিকট ভঙ্গি যদি কিছু থাকে তবে সেটাও ওই অন্ধকারে ছলনার ভূমিকা! কী সে ছলনা? মাঝে মাঝে খবর গুজব রটে বন্দিদের হয়তো-বা মুক্তি দেওয়া হবে। আলেয়ার আলো দপ করে জ্বলে ওঠে ক্ষণতরে– আবার আবার সেই সুদীর্ঘ নিরস্ত্র অমানিশা।
জর্মনিতে চিরকালই দুটি দল। একদল পূর্বপন্থী রাশার সঙ্গে মৈত্রী কামনা করে। আডেনাওয়ার পশ্চিমপন্থী, রুশবৈরী। বিশেষত যে রুশ হাজার হাজার যুদ্ধবন্দি জর্মনদের দশ বছর পরেও কিছুতেই মুক্তি দেবে না।
রুশ ঘোড়া-বিককিরির ব্যবসা করতে চায়। যুদ্ধবন্দি বাওর ইত্যাদি ঘোড়ার বদলে সে চায় আডেনাওয়ার কর্তৃক রুশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিদান, এবং পূর্ব জর্মনিকেও সে পশ্চিম জর্মনির সঙ্গে সম্মিলিত হতে দেবে না। হয়তো এটা অন্যায় নয়। হিটলার রুশ দেশে যা করে গেছেন তার বদলে এ তো সামান্যই। কিন্তু আডেনাওয়ার তো আর হিটলারের প্রিয় পুত্র যুবরাজ প্রিন্স অব্ ওয়েলস্ রূপে পিতার সিংহাসনে বসেননি যে, হিটলারের সর্ব অপকর্মের জন্য তার মূল্য দেবেন। বরং হিটলার তাঁকে করেছিলেন লাঞ্ছিত, অপমানিত, কারারুদ্ধ।
এবং তার চেয়েও বক্র পরিহাস- যে নাৎসি পার্টির মারফত তিনি আডেনাওয়ারকে কারারুদ্ধ করেছিলেন সেই পার্টিরই বহু গণ্যমান্য সদস্য, জাঁদরেল, অ্যাডমিরাল, হিটলারের আপন বয়স্যসখা রয়েছে এই যুদ্ধবন্দিদের ভেতর! আডেনাওয়ারকে নতিস্বীকার করতে হবে এদেরও মুক্তির জন্য। এবারে শুনুন বাওর কী বলেছেন :
But the-then the much-abused (অর্থাৎ নাৎসি কর্তৃক অপমানিত– লেখক) : Adenauer came to Moscow, and our camp was wild with rumours. Our hopes rocketed from zero to feverpoint-and then fell back again. This latter was when Bulganin publicly proclaimed that we were the scum of the earth, and that our crimes had robbed us of all human semblance. We cautiously but closely followed the course of Adenaures hard-fought negotiations, and we could sense that even the Russians respected the determination and integrity of the old man. (বৃদ্ধ সাদরে বলা হল- লেখক)
