এর পরের ঘটনাবলি হালে কাগজে কাগজে বেরিয়েছে। সেগুলো সংক্ষেপে সারি।
যুদ্ধশেষের পরই মার্কিন সেনাপতি আডেনাওয়ারকে কলনের লর্ড মেয়ার করে দিল। কিছুদিনের মধ্যেই পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী মার্কিনরা কলন ইংরেজের হাতে দিয়ে সরে পড়ল। যে ইংরেজ সেনাপতির হাতে কলনের ভার পড়ল তিনি ছিলেন একটি আস্ত গণ্ডমূর্খ গাড়োল। আডেনাওয়ারকে নগর পুনর্নির্মাণ বাবদে এমন সব সর্বনেশে অবাস্তব জঙ্গিলাটী অর্ডার দিতে লাগলেন যে, পরাজিত জর্মনির নগণ্য সরদার আডেনাওয়ার বিজয়মদেমত্ত প্রভুর আদেশ পালন করতে কিছুতেই সম্মত হলেন না। এই নয়া হিটলার তখন তাকে স্রেফ ডিসমিস করে দিলেন। বিবেচনা করি সিপাহিবিদ্রোহের আমল হলে তাকে বাহাদুর শার মতো বাকি জীবন জেলে কাটাতে হত!
অনেকের বিশ্বাস, এই যে আডেনাওয়ার ইংরেজের ওপর চটে গেলেন তার পর তিনি জর্মনির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গড়তে লাগলেন মার্কিন ও ফরাসির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে– ইংরেজিতে যাকে বলে কাট হিম ডেড, ইংরেজকে তিনি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেলেন।
জর্মনির নব সংবিধান নির্মাণের জন্য যে বৈঠক বসল বছর তিন পরে ১৯৪৮ সালে, তিনি হলেন তার প্রেসিডেন্ট। ১৯৪৯-এ যে নবীন রাষ্ট্র নির্মিত হল তার প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন আডেনাওয়ার। কিন্তু তখন বিশ্ববাসীর মনে প্রশ্ন, জর্মনির জন্মবৈরী ফ্রান্স কি এ রাষ্ট্রকে স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্যরূপে স্বীকার করবে?
আডেনাওয়ার আজীবন ফ্রান্সের প্রতি ভ্ৰাতৃভাব পোষণ করতেন। তিনি হাত এগিয়ে দিলেন ফ্রান্সের দিকে। যে-ফ্রান্স চিরকাল জর্মনিকে অবিশ্বাস করেছে সে পর্যন্ত বুঝে গেল যুগের পরিবর্তন হয়েছে। দম্ভী দ্য গল আলিঙ্গন করলেন বৃদ্ধ আডেনাওয়ারকে। ইংরেজ মর্মাহত হল। জর্মনি-ফরাসিকে বিভক্ত রেখে অস্ত্রসগ্রহার্থে দু দলকে লড়িয়ে দিয়ে, সে দাবড়াত ইয়োরোপময়।
জর্মনি ইয়োরোপ-আমেরিকার জাতিসমাজে আসন পেল।
যে জর্মন জনসাধারণকে বিশ্বজন নরাধম দানব বলে ধরে নিয়েছিল তারা দ্রজনরূপে স্বীকৃত হল।
পশ্চিম ইয়োরোপ তথা আমেরিকা যে-সব অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক সন্ধিচুক্তি তৈরি করছিল তার সর্বোচ্চ স্তরের সবকটিতেই জর্মনি আসন পেল।
এবং আমরা যারা এ-দেশে বাস্তুহারা সমস্যা নিয়ে উদভ্রান্ত– অবিশ্বাস্য বলে মনে করি যে, আডেনাওয়ারের নেতৃত্বে পশ্চিম জর্মনি স্থান করে দিল তার আপন শহরে শহরে গ্রামে গ্রামে, পূর্ব জর্মনি থেকে আগত এক কোটি বিশ লক্ষ বাস্তুহারাকে তাদের জীবনমানে ও পশ্চিম জর্মনির জীবনমানে আজ আর এতটুকু পার্থক্য নেই, আমি স্বচক্ষে ১৯৫৮ এবং পুনরায় ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে দেখে এসেছি। কোনও লক্ষ্মীছাড়া দণ্ডকারণ্যে গিয়ে বাস্তুহারাদের বাস্তুভিটে-ঘুঘু-রূপ ধারণ করতে হয়নি।
এবং বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়, এই আপাতদৃষ্টিতে নৈরাশ্যপূর্ণ গুরুভার আডেনাওয়ার এগিয়ে গিয়ে আপন স্কন্ধে তুলে নিলেন তাঁর জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়ে, রাষ্ট্রজনকরূপে, তেয়াত্তর বছর বয়সে।
এ যুগকে সমসাময়িক জর্মন ইতিহাসে বলা হয়, আডেনাওয়ার অ্যারা আডেনাওয়ার যুগ।
এবং এ যুগের এখনও শেষ হয়নি। বিসমার্ককে বিতাড়িত করার পর কাইজার তার রাজনীতি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিলেন, ৮৭ বছর বয়সে বৃদ্ধ(?) অবসর গ্রহণ করার পর যে দুজন চ্যানসেলার পর পর নিযুক্ত হলেন তারাও বৃদ্ধের কর্মাদর্শ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে চলেছেন।(৬)
অবসর গ্রহণের পর তিনি বৃহৎ তিন খণ্ডে লেখেন তাঁর জীবনস্মৃতি। তৃতীয় খণ্ড প্রেসে পাঠানোর কয়েক সপ্তাহ পর তিনি গত হন।
মৃত্যুর আট দিন পূর্ব পর্যন্ত তাঁর কর্মক্ষমতা অটুট ছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিজিংগার আডেনাওয়ারের শোকসভাতে বলেন, কয়েক দিন পূর্বেও তিনি র্যোনডর গ্রামে যান, বৃদ্ধের কাছ থেকে পথনির্দেশ গ্রহণ করতে। এই শেষ দর্শনের সময় তিনি কিজিংগারকে বিভক্ত জৰ্মনি সম্বন্ধে দুঃখ প্রকাশ করেন। শেষ কথা বলেন, আজ যে ধুলো আর কুয়াশাতে পৃথিবী ঢাকা সেটা যখন পরিষ্কার হবে তখন যেন কেউ না বলে, আমি আমার কর্তব্য করিনি।
***
বিশ্বজন সম্পূর্ণ একমত যে :
১. আনোওয়ার পদদলিত জৰ্মনিকে লুপ্ত-আত্মসম্মানবোধ এনে দেন ও ইউরোমেরিকার রাষ্ট্রসমাজে তার জন্য গৌরবের আসন নির্মাণ করেন,
২. চিরবৈরী ফ্রান্সের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন,
৩. এক কোটি বিশ লক্ষ বাস্তুহারাকে পরিপূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনি মাত্র একটি আশা সফল করতে পারেননিঃ
দ্বিখণ্ডিত জৰ্মনিকে একত্র করতে পারেননি।
***
এস্থলে আমি শুধু দুটি বিষয় উল্লেখ করব :
হ্যার ভাইমার স্বৰ্গত আডেনাওয়ারের উত্তম জীবনী লিখেছেন। আর পাঁচখানা বিদেশি বইয়ের মতো এটিও আমার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হয়নি বিদেশি মুদ্রা ও বিদেশি পুস্তক-বিক্রেতাদের কৃপায়।
জর্মন বেতার এই উৎকৃষ্ট পুস্তক থেকে একাধিক অনুচ্ছেদ পড়ে শোনায়।
তারই একটিতে আছে, আডেনাওয়ারের পুত্র উক্ত লেখককে বলেন, আমার পিতার মাথার ওপর যখন সমস্ত জৰ্মনির দায়িত্ব তখন আমার মা গত হন। সঙ্গে সঙ্গে পিতা তাঁর দৈনন্দিন রুটিন আমূল পরিবর্তন করে দিলেন, যাতে করে আমরা আরও বেশি সময় ধরে তাঁর সঙ্গলাভ করতে পারি। এর পর থেকে কোথাও সফরে গেলে আমাদের জন্য প্রতিটিবার সওগাৎ আনতে কখনও তার ভুল হত না।
