কলন শহরে পোপের অন্যতম আর্চবিশপের বিরাট প্রতিষ্ঠান। আডেনাওয়ার সেখানে সুপ্রিম লর্ড মেয়ার। ক্যাথলিক রাজনৈতিক দলের ওপর তার প্রচুর প্রভাব– যদিও, পূর্বেই বলেছি, তিনি সে রাজনৈতিক দলের টিকিট নিয়ে ভোটমারে কখনও নামেননি। তাঁর জীবনের প্রথম পর্যায় কেটেছে মনিসিপাল বা করপোরেশন পলিটিসে। ক্যাথলিক সংগঠনের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তিনি নাৎসিদের প্রচারকর্মে বাধা দিলেন কলন তথা উত্তর রাইনের সর্বত্র। অথচ হিটলার তাঁকে ধরা-ছোওয়াতে পান না, কারণ তিনি রাজনৈতিক কোনও দলের নেতা, এমনকি চারআনি সক্রিয় নিষ্ক্রিয় কোনও মেম্বারও নন। তিনি যদি ভোটমারে নামতেন তবে তাকে ভোটে হারিয়ে বিপর্যস্ত করা যেত। নাৎসি ডন কুইন্সট্ তলওয়ার হানবার মতো ড্রাগন খুঁজে পায় না পায় উইড় মিল!
গ্যোবেলস্-এর প্রচারকমের একটা প্রধান উর্বরা জমি ছিল স্কুল-কলেজ-ইউনিভারসিটি। কলনের অধিকাংশ স্কুল ক্যাথলিকদের তাঁবেতে সেকুলার ভাইমার রিপাবলিক জর্মনির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সেকুলার করে তুলতে পারেনি কিংবা হয়তো সত্য সত্য তা করতে চায়নি সেখানে আডেনাওয়ারের ধর্মবল অর্থবল দুই-ই রয়েছে। আর ইউনিভারসিটির তো কথাই নেই।
সোয়াশো বছরের হারানো মানিক তার বিশ্ববিদ্যালয় ফের ফিরে পেয়েছে– আডেনাওয়ারের তপস্যায়, তখনও পুরো দশ বছর হয়নি। এটাকে কলনবাসী বাঁচিয়ে রাখবে সর্বপ্রকার কট্টরপন্থীর র্যাডিকাল ছোঁয়াচ থেকে। গ্যোবেলস্ কলনের কলেজে কল্কে পেতেন না।
ওদিকে বেকার সমস্যা দিন দিন তার চরম সঙ্কটের দিকে দ্রুতপদে এগিয়ে চলেছে– এবং সবচেয়ে বেশি মার খাচ্ছেন রুর কয়লাখনির শ্রমিকদল। তাই দেখা যায়– হিটলারের খাস পাইলট তার পুস্তকে এর বর্ণনা দিয়েছেন—(৪) হিটলার প্রচারকর্মের জন্য প্লেনে উড়ে যাচ্ছেন রুরের এসে শহরে। পাশেই বিরাট কলন। কিন্তু তিনি সেটি বাদ দিয়ে চলে যাচ্ছেন বন-এর কাছে তার প্রিয় গোডেসবের্গে নামক গগ্রামে (এখন শহর এবং এখানেই পরবর্তী যুগে হিটলার প্রাথমিক কথাবার্তা বলেন চেম্বারলেনের সঙ্গে চেকোস্লোভাকিয়ার সুডেটেন বাবদে)। নিশ্চয়ই হিটলারের এই কলন-বর্জনে প্রতিবারেই গ্যোবেলস লজ্জায় মাথা নিচু করেছেন। তাঁর সান্তনা এইটুকু– এসে তথা রুর তার প্রতিবেশী, সেখানে তিনি প্রতিবারেই হিটলারকে রাজাসনে বসাতেন।
হিটলার চ্যানসেলার হয়েই আডেনাওয়ারকে ডিসমিস করলেন। এটা হবে আমরা জানতুম। কারণ নাৎসিরা বহুদিন ধরে তাঁর নিন্দা-কুৎসা গেয়ে বেড়াচ্ছিল। তার একটা : আডেনাওয়ার তনখা টানেন বিরাট (রিজে)! তার মাইনে ঢের ঢের কম হওয়া উচিত। এবং সবচেয়ে মজার কথা, হিটলার যাঁকে লর্ড মেয়ার করলেন, তিনি তাঁর মাইনে এক পাই তক না কমিয়ে টানতে লাগলেন আডেনাওয়ার যে তনখা নিতেন সেইটেই। এই মহাশয়ের নাম ছিল রিজে (বাঙলায় আমরা বলব বিরাট বাবু)। তখন কলন-বন-এ একটা শিবরামীয় পান চালু হল :- আডেনাওয়ার নিতেন বিরাট তনখা; এখন (মিস্টার) বিরাট নিচ্ছেন আডেনাওয়ার-তনখা!
***
হিটলার কীভাবে জৰ্মনিকে বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তার অবশ্যম্ভাবী শেষ ফল যে দেশের সর্বনাশ, সে সত্য আডেনাওয়ার দিব্যদৃষ্টি দিয়েই দেখেছিলেন কিন্তু শান্ত-সমাহিত স্বভাব ও আচরণসম্পন্ন আডেনাওয়ার জানতেন, চীনা ঋষি লাওৎসের মতোই জানতেন, জর্মন-নিয়তি রহস্যাবৃত তারই কোনও এক মানববুদ্ধির অগম্য কারণে। জর্মনির উপর দিয়ে যে টরনাডো বন্ধামুক্ত করেছেন, সে যেন;
লক্ষ লক্ষ উন্মাদ পরান বহির্গত বন্দিশালা হতে
মহাবৃক্ষ সমূলে উপাড়ি ফুৎকারে উড়ায়ে চলে পথে
তার সামনে দাঁড়ালে সেটাকে বন্ধ করা তো দূরের কথা, তিনিও মহাশূন্যে বিলীন হবেন। এটা ফরাসি সম্রাটের আপ্রে মোয়া ল্য দেলুজ (আমি মরে যাওয়ার পর বন্যা) নয়, এটা দেলুজ পুর শাক আ ল্যাসতা (বন্যা এখনই, এবং সবাইকে নিয়ে যাবে ভাসিয়ে, কহাঁ কহা মুলুকে!)
বরঞ্চ বন্যার পর ফের ঘরবাড়ি তুলতে হবে, খেতখামার করতে হবে– শিবের তাণ্ডব শেষ হলে অন্নপূর্ণার আবাহন।
পরাজয় যতই ঘনিয়ে আসতে লাগল বুদ্ধিভ্রষ্টের ন্যায় হিটলার ততই অবিচারে, নির্বিচারে শক্ৰজন, নিরপেক্ষজন, এমনকি মিত্ৰজনকেও মরণ-থানায় (কন্সেট্রেশন ক্যাপে) পাঠাতে লাগলেন–হ্যাঁ, ইব্রাহিম তাঁর প্রিয় পুত্রকে, আগামেন তাঁর প্রিয় কন্যা এফিগেনিয়েকে দেবতার তুষ্টির জন্য বলি দিয়েছিলেন কিন্তু আডেনাওয়ারের অদৃষ্টে মরণ-থানার দুর্দৈব লেখা ছিল না। যুদ্ধের শেষের দিকে তাকে কিছুদিন কারাগারে, পরে তার আপন গৃহে নজরবন্দি করা হয়েছিল মাত্র। কিন্তু তিনি শক্ৰমিত্রনির্বিশেষে এতই অসংখ্য জনের উপকার করেছিলেন, যে তাঁরা কলাকৌশলে ছলে (হিটলারকে) বলে আডেনাওয়ারকে কারামুক্ত করেন।
সাঙ্গ হয়েছে রণ,
অনেক যুঝিয়া অনেক খুঁজিয়া শেষ হল আয়োজন
The fight is ended!
Cries of loss bewilder the sky
১৯৪৫ সালের মে মাসে প্রথম সপ্তাহে জর্মনি বে-এক্তেয়ার আত্মসমর্পণ করল। ওই বছরেই জুলাই মাসে প্রখ্যাত ইংরেজ লেখক স্টিভ স্পেন্ডারকে ব্রিটিশ সরকার পাঠাল জর্মনিতে, সেখানকার ঝড়তিপড়তি ইনটেলেছুঁয়েলদের চিন্তাধারা সম্বন্ধে খবর নিতে। সে-কর্ম সমাধান করে তারই বিবরণী তিনি প্রকাশ করেন ইয়োরোপিয়ান উইটনিস নামক পুস্তকে।(৫)
