আডেনাওয়ারের দীর্ঘ একানব্বই বছরের জীবনকে যদি দুই পর্যায়ে ভাগ করা যায় তবে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে তার প্রথম পর্যায় সমাপ্ত। দ্বিতীয় পর্যায়ের আরম্ভ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে এবং সমাপ্তি ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে।
জর্মনি, হিটলার তথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্বন্ধে যাঁদের কৌতূহল আছে তাদের সকলের মনেই প্রশ্ন জাগবে, হিটলার এঁকে ডিসমিস করলেন কেন? নাৎসি আন্দোলন যখন ১৯২৯-৩০ খ্রিস্টাব্দে সর্বসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তখন আডেনাওয়ার তার ওপর কি কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।
জীবনের প্রথম পর্যায়ে, অর্থাৎ ১৯৩৩ অবধি আডেনাওয়ার প্রকৃত পলিটিশিয়ান বলতে যা বোঝায় তা ছিলেন না। লর্ড মেয়রের পদ ছাড়াও তিনি কাইজারের রাজত্বে ও পরবর্তী ভাইমার রিপাবলিকে একাধিক সর্বোচ্চ আসন গ্রহণ করেন বটে কিন্তু কখনও রাইসটাগ বা জর্মন পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার জন্য জনসমাজের সম্মুখে প্রার্থী হয়ে দাঁড়াননি। তিনি ক্যাথলিক সেন্টার পার্টির সদস্য ছিলেন বটে এবং সে দলের ওপর তার প্রভাব ছিল প্রচুর কিন্তু সেটা প্রধানত তার অসাধারণ ব্যক্তিত্বের বলে ও প্রখ্যাত কলন শহরের লর্ড মেয়ারের পদমহিমায়। এবং ক্যাথলিক সেন্টার পার্টির প্রতি হিটলারের ছিল ক্রোধ ও ঘৃণা।
কিন্তু ১৯২৯-৩০ থেকে ১৯৩৩ অবধি ক্ষমতালাভের জন্য যখন নাৎসি পার্টি শহরে গ্রামে, রাস্তায় রাস্তায়, মদের দোকানে লড়াই চালাচ্ছে তখন যেসব নাসিবিরোধী রাজনৈতিকদের নাম শোনা যায়, যেমন ফন পাপেন, হুগেনবুর্গ, স্লাইষার, ক্রনিঙ, ট্যালমান, টলার, শ্রোডার– এদের ভেতর আডেনাওয়ারের নাম নেই। ১১৭৪ পৃষ্ঠা জুড়ে শ্রীযুক্ত শাইরার নাৎসি আন্দোলনের উদয়াস্ত সম্বন্ধে যে বিরাট গ্রন্থ লিখেছেন তাতে আডেনাওয়ারের নাম নেই।
অথচ আডেনাওয়ার ছিলেন ধর্মভীরু লোক– হিটলার যে ধর্ম মাত্রকেই এবং বিশেষ করে খ্রিস্টধর্মকে জর্মন টিউটন চরিত্রের সর্বনাশা শত্রুরূপে ঘৃণা করতেন সে তত্ত্ব তিনি কখনও গোপন রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি।২ হিটলারের করাল ছায়া যে ক্যাথলিক গির্জা ক্রমেই ছেয়ে ফেলেছে সেটা আডেনাওয়ারের দৃষ্টি এড়ায়নি।
কিন্তু আডেনাওয়ার ছিলেন ধর্মভীরু, শিক্ষিত, বিদগ্ধ নাগরিক।
একটি উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট হবে। কলন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে; নেপোলিয়নের নেতৃত্বে যখন ফরাসি সেনা জর্মনিতে ঢুকল তখন সারা জর্মনির শিক্ষাদীক্ষার ওপর নামল দুর্দিনের অন্ধকার। বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গে কলন বিশ্ববিদ্যালয়েরও দরজা বন্ধ হয়ে গেল ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে।
আপ্রাণ চেষ্টা করে, লর্ড মেয়ারের সর্ব প্রভাব সর্ব কর্তৃত্ব বিস্তার করে কাট আডেনাওয়ার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে কলনে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেন। ১২৩ বছর পরে।
বন্ শহর কলনের অতি কাছে। বন্-এর বিশ্ববিদ্যালয় বিখ্যাত। আডেনাওয়ার বন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং পরবর্তীকালে তিনি বন্-কলনের পথে র্যোনডরফে তাঁর আবাস নির্মাণ করেন। এখান থেকেই তারও পরবর্তীকালে হিটলারের পতনের পর তিনি মোটরে করে রাজধানী বন্-এ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর কর্তব্য সমাধা করতে যেতেন।
সেই ১৯২৯-৩০ খ্রিস্টাব্দে, বস্তুত প্রায় ষাট বছর ধরে বন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন সুপরিচিত।(৩) বন্-এর এত কাছে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খোলাতে বন্-এর কিছুমাত্র দুশ্চিন্তা হয়নি, কারণ বন্ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আড়েনাওয়ারের সখ্য ছিল অবিচল। বস্তুত উত্তর রাইন অঞ্চলের (বন্-কলন-ডুসেড) প্রায় সব রকমের কৃষ্টি আন্দোলন তথা ক্যাথলিক ধর্মজীবন এবং তার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আডেনাওয়ার তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
হিটলারের জন্মভূমি যদিও অস্ট্রিয়ায় তবু তিনি বেভেরিয়ার মুনিক শহর বেছে নিয়েছিলেন তার রাজনৈতিক কর্মকেন্দ্ররূপে। সেখানে বিরাট বিরাট মিটিঙে হিটলার লম্বা লম্বা লেকচার ঝাড়তেন, রাস্তায় রাস্তায় কমুনিস্টদের ঠ্যাঙাবার ব্যবস্থা করাতেন, এমনকি গুমখুন করতেও তাঁর বাধত না– এসব পাঠকমাত্রই জানেন।
বেভেরিয়া প্রদেশের পরেই হিটলারের জনপ্রিয়তা ছিল রাইনের কয়লা ও লোহা ব্যবসার জায়গা রুর অঞ্চলে এবং কলনের পাশে এই উত্তর রাইনের ডুসেলডর্ফ শহরে বিশ্বপ্রপাগান্ডা সরদার ডক্টর গ্যোবেলসের জন্ম। রুরের গা-ঘেঁষে কলন শহর এবং এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নগর। গ্যোবে স্বভাবতই চাইতেন তার বাড়ির পাশের কলন শহরে যেন প্রভু হিটলারকে উৎকৃষ্ট আসন তৈরি করে দিতে পারেন– হিটলারের কাশী যদি হয় মুনিক তবে কলন হবে বৃন্দাবন।
কিন্তু বাদ সাধতেন আডেনাওয়ার। পূর্বেই বলেছি, ওবারবুরগারুমাইস্টারের ক্ষমতা অসীম। তাই নামমাত্র আইন বাঁচিয়ে তিনি কলন অঞ্চলে এমন সব কলাকৌশল করে রাখতেন যে, হিটলার এমনকি রাইনের ছেলে স্বয়ং গ্যোবেলসও সেখানে সুবিধে করে উঠতে পারতেন না।
নাৎসি পার্টির ক্ষমতা সঞ্চয় করে উদ্দেশ্য সফল করাতে বাধা দিয়েছিল প্রধানত দুইটি সঙ্ : ক্যাথলিক এবং দ্বিতীয়ত প্রটেস্টান যাজক সম্প্রদায়। কিন্তু ক্যাথলিক সম্প্রদায় প্রটেস্টানদের তুলনায় শতগুণে সবদ্ধ এবং পোপকে কেন্দ্র করে তাদের বিশ্বজোড়া প্রতিষ্ঠান। হিটলারও বার বার তার সাঙ্গোপাঙ্গকে বলেছেন, ওই ক্যাথলিকদের সমঝে চল– প্রটেস্টানরা এমনিতেই টুকরো টুকরো হয়ে আছে, তাদের খানখান করা এমন কিছু কঠিন কর্ম নয়।
