৩. মধ্য বা পশ্চিম ইয়োরোপে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বেরুলে একাধিক সজ্জন আপনার কানে কানে ফিসফিস করে বলবে, স্যার! শার্টটা খুঁজতে ভুলে গিয়েছেন। তার মনে হয়েছে, আপনি শৌচাগারে প্রয়োজনীয় কর্মটি করার পর দামনটি খুঁজতে ভুলে গেছেন– বুড়া অধ্যাপকরা যেরকম ক্ষুদ্রতর কর্মের পর পাতলুনের বোতাম লাগাতে ভুলে যান।
৪. অনেকের বিশ্বাস, কৃষ্ণের যদুবংশ ছিল কালো, কৌরবেরা ছিলেন গোরা, আর পাণ্ডবরা ছিলেন পাণ্ডু, অর্থাৎ পিলা, হলদে। পাণ্ডবরা নাকি আসলে তিব্বতের মঙ্গোলীয়ান। (Winternitz পশ্য। এ বাদ বা বিবাদে যোগ দেবার শাস্ত্রাধিকার আমার নেই।) মহাভারতের যুদ্ধ নাকি কৃষ্ণ-পাণ্ডু বনাম গোরা-কৌরব।
কনরাট আডেনাওয়ার
চার্চিল নাকি একদা বলেছিলেন, বিসমার্কের পরবর্তী যুগে জর্মনিতে মাত্র একটি রাষ্ট্রবিদ (স্টেটসম্যান, রাষ্ট্রনির্মাতা) জন্মেছেন– তিনি কটু আডেনাওয়ার।
এ প্রশস্তি আডেনাওয়ারের পক্ষে অবশ্যই আনন্দদায়িনী (এবং আমরাও চার্চিলের সঙ্গে একমত) যদ্যপি এ তথ্যটি সর্বজনবিদিত যে স্বয়ং আডেনাওয়ার ইংরেজ জাতটাকে আদৌ নেকনজরে দেখতেন না।
চার্চিলের মন্তব্যে একটি সুলাঙ্গুলির রূঢ় ইঙ্গিত রয়ে গিয়েছে।
তিনি বলতে চান, বিসমার্ক এবং আডেনাওয়ারের মাঝখানে রাজনীতির (স্টেটসম্যানশিপের) শস্যশ্যামল ভূখণ্ড নেই, আছে সাহারার মরুভূমি। অর্থাৎ বহু বহু বছর ধরে জর্মন দেশে রাষ্ট্রনির্মাতার বড়ই অভাব। বিসমার্কের জন্ম ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে, রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য হন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে, ও মৃত্যু ১৮৯৮। যদি ধরা হয়, তিনি রাজনীতি সংগ্রামে নামেন ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে তা হলে বলতে হয় প্রায় একশো বছর ধরে জর্মনিতে একমাত্র রাষ্ট্রপিতা ছিলেন বিসমার্কই। জর্মনির মতো চিন্তাশীল তথা শক্তিশালী দেশের পক্ষে এক শতাব্দীতে মাত্র একজন রাষ্ট্রস্রষ্টা– এ যেন অবিশ্বাস্য। জর্মনি না কান্ট, হেগেল, কার্ল মার্কসের দেশ! তাদের পরিকল্পনা কেউই বাস্তবে পরিণত করতে পারল না?
এবং হিটলার?
এর উত্তর সুদীর্ঘ, কিন্তু সংক্ষেপে সারি। যে ডিকটেটারের মৃত্যুকালে তাঁর দেশের অধিকাংশ ভস্মস্তূপে পরিণত, যার সংগ্রামনীতির ফলে লক্ষ লক্ষ সৈন্য দেশে-বিদেশে নিহত হয়েছে; যুদ্ধে বোমারু আক্রমণে আরও লক্ষ লক্ষ আহত রক্তাক্ত নরনারী চিৎকার করছে– তাঁকে নিশ্চয়ই অতিমানব, নরদানব সবই বলা যেতে পারে; শুধু বলা যায় না রাষ্ট্রনির্মাতা, পতন-অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থার যুগযুগ-ধাবিত যাত্রীর চিরসারথি তাঁকে কিছুতেই বলা যায় না।
বিনষ্ট রাষ্ট্রের ভস্মতূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে লোক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় তাকে রাষ্ট্রনায়ক, রাষ্ট্রনির্মাতা বলা চলে না।
এমনকি কোনও রাষ্ট্রাদশও তিনি রেখে যেতে পারেননি যেটা ভবিষ্যদ্বংশীয়রা মৃন্ময় করে তুলতে পারে। তার রাষ্ট্রাদর্শ : পররাজ্য জয় করে সে দেশের বর্বর (উটরমেনুষ) জনসাধারণকে দাসস্য দাস রূপে পরিণত করে যে সুপরিকল্পিত পৈশাচিক শোষণ-সংহার পদ্ধতি দর্শনে আন্কল টম পর্যন্ত গোরশয্যায় চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান হবেন- আপন দেশের বিলাসব্যসনের জন্য অধিকতর শূকরমাংস, সূক্ষ্মতর চীনাংক, অগণিত স্বতশ্চলশকট সগ্রহ– সাতিশয় বস্তুতান্ত্রিক জড়ত্বের চরম আরাধনা।
এ প্রসঙ্গে তাই বলে নিতে পারি যদিও এটা সর্বশেষের কথা, হিটলার বারো বছরে যে জর্মনিকে বিনাশ করেন, আডেনাওয়ার তার ১৯৪৯-১৯৬৩ ব্যাপী রাজত্ব কালে সেটি পুনর্নির্মাণ করেন। শুধু পুনর্নির্মাণ নয় এবং চৌদ্দ বছরও নয়, আডেনাওয়ার দশ বছরেই জর্মনিতে যে সুখসমৃদ্ধি গড়ে তুললেন সেটা হিটলারের ভস্মস্তূপে দাঁড়িয়ে ১৯৪৫ সালে বাতুলতম আশাবাদীও কল্পনা করতে পারেনি। এবং বলতে কি, এহ বাহ্য, তিনি দিলেন এমন ধন যার উল্লেখ করে খ্রিস্ট একদা বলেছিলেন, শুধু রুটি খেয়েই মানুষ জীবনধারণ করে না। সে কথা পরে হবে, আগেই বলেছি।
***
কলন(১) শহরের নাম বিশ্ববিখ্যাত। আর কিছু না হোক পৃথিবীর সর্বত্রই Eau de Cologne জিনিসটি পাওয়া যায়, এবং আজকের দিনেও দ্য কন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই নির্মিত হয়। কলন শহর যে কলন-জলের (Eau=Water, de= of, Cologne= Colojne=Koeln) আবিষ্কারক তা-ও নয়, কিন্তু কলনের ও দ্য কলনই এখন পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় কলন-জল।
কলন জর্মনির অন্যতম বৃহৎ নগর। এর গির্জাটি স্থাপত্যশিল্পের অত্যুকৃষ্ট নিদর্শন। গম্ভীর এবং মধুর উভয় রস এই বিরাট গির্জাতে সম্মিলিত হয়েছে। দূর-দূরান্ত হতে গির্জার শিখরদ্বয় পথিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এ নগরের সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি তার ওবারবুরগারমাইস্টার বা প্রধান লর্ড মেয়ার। কলন শহরের ওপর তার প্রভাব অসীম। বস্তুত তাঁকে কলনের রাজা বললে কিছুমাত্র বাড়িয়ে বলা হয় না। ভাইমারের পূর্ববর্তী যুগে কলনের লর্ড মেয়ার প্রতি পরবে কাইজার কর্তৃক নিমন্ত্রিত হতেন।
১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে আডেনাওয়ারের জন্ম এই কলন শহরে। আইন অধ্যয়ন করার পর তিনি এ শহরের লর্ড মেয়ারের দফতরে ঢোকেন এবং ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে স্বয়ং ওবারবুরগারমাইস্টার নিযুক্ত হন। ১৯৩৩ পর্যন্ত তিনি ওই পদে থেকে তার আপন শহরের সেবা করেন। এরকম একাগ্র সেবা তার পূর্বে বা পরে কোনও মেয়ারই করেননি। ১৯৩৩-এ হিটলার জর্মনির প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েই তাকে সরাসরি ডিসমিস করে দেন।
