সেই পত্রিকার একটি প্রশ্নোত্তর বিভাগ আছে। কেউ শুধাল, মাংস আলু তরকারিসহ নির্মিত ভোজনের মেন ডিশ (পিয়েস দ্য রেজিসাস) খাওয়ার পর যেটুকু তলানি সস (শুকনো শুকনো ঝোল, কলকাত্তাইয়ারা কাইও বলে থাকে) পড়ে থাকে তার উপর পাউরুটি টুকরো টুকরো করে ফেলে দিয়ে, কাঁটা দিয়ে সেগুলো নাড়িয়ে চাড়িয়ে চেটেপুটে খাওয়াটা কি প্ৰতোকোলসম্মত– এটিকেট মাফিক, বেয়াদবি অভদ্রস্থতা নয় তো?
উত্তর : পৃথিবীতে এখন এমনই নিদারুণ খাদ্যাভাব যে, ওই সসটুকু ফেলে দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই (অবশ্য তার সঙ্গে রুটির টুকরোগুলোও যে গেল সে বাবদে বিচক্ষণ উত্তরদাতা কোনও উচ্চবাচ্য করেননি। কারণ রুটিটি পরের ভোজনেও কাজে লাগত, কিংবা গরিব-দুঃখীকেও বিলিয়ে দেওয়া যেত– এটো প্লেটের তলানি সস্ তো পরবর্তী ভোজনের জন্য বাঁচিয়ে রাখা যায় না, কিংবা গরিব-দুঃখীকেও বিলোনো যায় না– লেখক)। তার পর তিনি বলেছেন, কিন্তু আপনি যদি নিমন্ত্রিত হয়ে কোথাও যান তবে এই কার্পণ্যটি করবেন না। তার মানে আপনার বাড়ির বাইরের এটিকেট যেন বাড়ির ভিতরের চেয়ে ভালো হয়। আমি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নমত ধরি। আমার মতে বাড়ির এটিকেট, আদব-কায়দা যেন বাইরের চাইতে ঢের ঢের ভালো হয়।
প্রশ্ন : কোহিনূর প্রস্তর কোন ভাষার শব্দ?
উত্তর : ফারসি।
(সম্পূর্ণ ভুল নয়। কোহ্ = পাহাড়–ফারসিতে। যেমন কাবুলের উত্তর দিকে কোহিস্তান রয়েছে (আমার সখা আব্দুর রহমান ওই কোহিস্তানের লোক)। কিন্তু কোহ-ই-নূরের নূর শব্দটি ন সিকে আরবি। খাঁটি ফারসিতে যদি বলতেই হয় তবে নূর-এর বদলে রওশন বা রোশনি বািঙলায় রোশনাই) ব্যবহার করে বলতে হয় কোহ-ই-রওশ। শুদ্ধ আরবিতে বলতে হলে জবলুন (পাহাড়) নূর।… কিন্তু এ রকম বর্ণসঙ্কর সমাস সর্বত্রই হয়ে থাকে। দিল্লীশ্বর ইত্যাদি।)
প্রশ্ন : আমার বয়স বত্রিশ; আমি বিধবা। আমার ষোলো বছরের ছেলের একটি সতেরো বছরের ভেরি ডিয়ার ক্লাসফ্রেন্ড প্রায়ই আমাদের এখানে আসে। কিন্তু কিছুদিন ধরে সে আমার সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা জমাবার চেষ্টা করছে। আমি করি কী?
উত্তর : আপনি ওকে সঙ্গোপনে নিয়ে গিয়ে বলুন, তুমি তোমার অল্পবয়সী মেয়েদের সঙ্গে প্রেমট্রেম কর। আমি তোমার মায়ের বয়সী। তোমার বয়সী মেয়ের তো কোনও অভাব নেই। কিন্তু আমার মনে হয়, ছেলেটার বোধহয় মাদার কমপ্লে আছে– অতি অল্প বয়সেই তার মা গত হন। কাজেই সে একটি মায়ের সন্ধানে আছে। তার পর আরও নানা প্রকারের হাবিজাবি ছিল।
এ উত্তর যে কোনও গোগর্দভ দিতে পারত।
কিন্তু এই প্রশ্নোত্তরমালা নিতান্তই অবতরণিকা মাত্র।
কয়েক মাস পূর্বে–মনে হল– একটি প্রাচীনপন্থি মহিলা–প্রশ্ন শুধালেন : আজকালকার ছেলে-ছোকরারা এমনকি মেয়েরাও বড় বেশি মশলাদার খানা খাচ্ছে। আমি গ্রামাঞ্চলে থাকি। সেদিন বাধ্য হয়ে আমাকে শহরে যেতে হয়। যদি জানতুম, শহরের মাই লর্ড রেস্তোরাঁওয়ালারা কী জঘন্য ঝাল, মাস্টার্ড (আমাদের কাসুন্দো– লেখক), আর মা মেরিই জানেন কী সব বিদকুটে বিকুটে বিজাতীয় মশলা দিয়ে যাবতীয় রান্না করেন, তবে কি আমি সে রেস্তোরাঁয় যেতুম। এক চামচ সুপ মুখে ঢালা মাত্রই আমার সর্বাঙ্গ শিহরিত হতে লাগল। আমার কপালে, সেই শীতকালে, ঘাম জমতে লাগল। মনে হল, আমার জিভে যেন কেউ আগুন ঢেলে দিয়েছে। আমার চোখ থেকে যা জল বেরুতে আরম্ভ করল সেটা দেখে আমার কাছেরই একটি সহৃদয় প্রাইভিট শুধাল– মাদাম, আমি বহু দেশ-বিদেশ দেখেছি- যেখানে টিয়ার গ্যাস ছাড়া হয়; কিন্তু আমাদের এই সুইটজারল্যান্ডে তো কখনও দেখিনি। শোকাতুরা হয়ে কান্না করলে রমণীর চোখে যে অশ্রুজল বেরোয় এটা তো তা নয়।
.
২০.
একদা সুইস কাগজে প্রশ্ন বেরুল : এই যে আমরা প্রতিদিন আমাদের রান্নাতে মশলার পর মশলা বাড়িয়েই চলেছি এটা কি আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো?
সেই সবজান্তা উত্তরিলা :
মাত্রা মেনে খেলে কোনও আপত্তি নেই, কোনও বস্তুরই বাড়াবাড়ি করতে নেই। (মরে যাই! এই ধরনের মহামূল্যবান উপদেশ পাড়ার পদি পিসি, স্কুলবয় সবাই দিতে পারে! লেখক) তার পর সবজান্তা বলছেন– ডাক্তারদেরও আধুনিক অভিমত, মেকদার-মাফিক মশলাদার খাদ্য ভোজনস্পৃহা আহার-রুচি বৃদ্ধি করে। তদুপরি আরেকটা গুরুত্বব্যঞ্জক তত্ত্ব আছে। আপনি যদি আপনার ভোজন ব্যাপারে সর্বক্ষণ এটা খাব না ওটা ছোঁব না এরকম পুতুপুতু করে আপনার ভোজনযন্ত্রটিকে নসিকে মোলায়েম করে তোলেন, (ইংরেজিতে একেই বলে মলিকড়ল করেন। তবে কী হবে? আপনি যতই চেষ্টা দিন না কেন, আপন বাড়িতে তৈরি মশলা বিবর্জিত রান্নামাত্রই খাব তথাপি ইহসংসারে বহুবিধ ফাড়া গর্দিশ আছে যার কারণে আপনাকে হয়তো কোনও রেস্তোরাঁতে একবেলা খেতে হল। কিংবা মনে করুন, আপনি নিমন্ত্রিত হলেন। শক্তসমত্ত জোয়ান আপনি। কী করে বলবেন আপনি ডায়েটে আছেন? ওদিকে রেস্তোরাঁ বলুন, ইয়ার-বখশির বাড়িই বলুন সর্বত্রই সর্বজন শনৈঃ শনৈঃ গরমমশলার মাত্রা বাড়িয়ে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই। পরের দিন আপনি কাত। অতএব–আমাদের সবজান্তা বলছেন, কিছু কিছু মশলা খেয়ে নেওয়ার অভ্যাসটা করে ফেলাই ভালো।
কিন্তু মশলা পুরাণ এখানেই সমাপ্ত নয়। সেটা পরে হবে। ইতোমধ্যে আমি দুম করে প্রেমে পড়ে গেলুম।
