যাত্রারম্ভেই বলে রাখা কর্তব্য, আমি কট্টর মোল্লাকুলজাত পাতি মোল্লা। আমার পূর্ব-পুরুষ ছিলেন রাজহাঁস, আমি ভাগ্যবিপর্যয়ে পাতিহাঁস। প্যাটার্ন হরেদরে একই। আমার পক্ষে মোল্লাদের নিন্দাকীর্তন, যে-শাখায় বসে আছি তারই মূল কর্তন। আমি অত পাড় কালিদাস বা শেখ চিলি নই। তা সে যাই হোক, মূল কথা এই, আফগানিস্তানের ইতিহাস মোল্লা-মৌলবী ভিন্ন কল্পনা করা যায় না।
আমির হবীবউল্লা মোটের ওপর সুখেই রাজত্ব করছিলেন কিন্তু কেন জানিনে, শেষের দিকে হঠাৎ তার শখ গেল বিলিতি কায়দা-কানুন অনুকরণ করতে। খুবসম্ভব তার এবং রাজপরিবারের দু একজন রোগীকে বিলিতি ডাক্তার সারিয়ে দিয়েছিল বলে তাঁর বিশ্বেস জন্মে, বিলিতি আর পাঁচটা রীতিনীতি আমদানি করলে গোটা দেশটার ধন-দৌলত বেড়ে যাবে। সাধারণ জন ভাবে, আমান উল্লাহই বুঝি সর্বপ্রথম বিলেত-পাগলা রোগে আক্রান্ত হয়ে রাতারাতি দেশটাকে গোরা-সায়েব বানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বস্তৃত দু একটা ব্যাপারে তিনি আমান উল্লাহরও একতলা উপরে বসে বসে বিলিতি খুশবাই-বিলাস উপভোগ করতেন। হবীবউল্লার হারেমটি ছিল বাছাই বাছাই সুন্দরীতে ভর্তি। কুল্লে আফগানিস্তানের তাবৎ কওমের তরো-বেতরো পরী হুরী দিয়ে তিনি হারেমটিকে করে তুলেছিলেন বহু বৈচিত্র্যময় গুল-ই-বাকাওলির গুলিস্তান। জানিনে, কী করে তার নজরে পড়ে, রাশান ব্যালে নর্তকীদের কিছু ফটোগ্রাফ এবং রঙিন ছবি। বড়ই পছন্দ হল তার হাঁটুর ইঞ্চি ছয় উপরে হঠাৎ যেন হেঁটে দেওয়া সাতিশয় শর্ট স্কার্ট। হারেমের অপেক্ষাকৃত তরুণীর পালকে তিনি সেই বেশে সাজিয়ে দিয়ে এক অজানা-অচেনা ভিনদেশি আনন্দদায়ী চিত্তচাঞ্চল্য অনুভব করলেন।
হারেমের ভিতর কী হয় না হয় সে নিয়ে মোল্লা সম্প্রদায়ের মাথা ঘামাবার কথা নয়। কিন্তু তবু এই বিজাতীয় বেশ– বেশাভাবও বলা চলে উকট পল্লবিত বর্ণনাসহ তাদের কানে পৌঁছল। মোল্লাদের ভিতর রাজদ্রোহী মনোভাব দেখা দিল। সেইটেকে প্রথম উস্কিয়ে দিয়ে নসর উল্লা হয়ে গেলেন তাদের প্রিয়পাত্র। বহু বিচিত্র কৌশলে আমান উল্লাহর মাতা নরকে হটিয়ে করে দিলেন আমান উল্লাকে তাদের প্যারা। আখেরে হবীবউল্লা আততায়ীর হাতে প্রাণ হারান।
আমান উল্লাহও ওই একইরূপে রাজ্য হারালেন। তাঁর মাতা অসাধারণ বুদ্ধিমতী রমণী গোড়ার থেকেই বাবাজিকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন, আর যা করবার করিস, বিলিতি সং সাজিসনি। হবীবউল্লাকে তাতিয়েছিল ছবি, ফটো; আমান উল্লাহকে খেপিয়ে দিল বিলিতি সিনেমা। কাবুলের সিনেমাহলে আমি যেসব রদ্দি ছবি দেখেছি সেগুলোর অনেকগুলি, সে আমলে তো নয়ই, এ আমলেও বোধহয় উভয় বঙ্গের সদাশয় সেন্সর দেখবারই সুযোগ পান না। মঞ্জুর না-মঞ্জুরির কথাই ওঠে না।… প্যারিসের বুলভার, লন্ডনের পিকাডেলি সার্কাসের স্বপ্ন দেখছিলেন আমান বিলেত যাবার পূর্বেই। আচম্বিতে বাস্তবে নেবে মালুম হল, সিংহাসন নেই, তিনি পিতৃনগর কান্দাহারের পথমধ্যে দাঁড়িয়ে।
যুবরাজ ইনায়েৎ রাজা হলেন। একে তো তখৃৎ তার ন্যায্য সম্পত্তি, তদুপরি তিনি শরিয়তের এমন কোনও বিধান ভঙ্গ করেন নি যে তার বাদশাহ হতে কারও কোনও আপত্তি থাকার কথা। কিন্তু শোর বাজারের হজরত রাজি হলেন না। ইনায়েৎ উল্লাকে কিন্তু তখৎ-মুলক ত্যাগ করে বিদেশে চলে যাবার অনুমতি দেওয়া হল। তিনি প্লেনে চড়ার সময় স্বয়ং শোর বাজার অ্যারপোর্টে হাজির ছিলেন। সে প্লেন আকাশে অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হজরত রানওয়ের উপর দাঁড়িয়ে উচ্চ কণ্ঠে আজান দিলেন। সময়টা কোনও নামাজের আসন্নকাল নয়। আজানটা প্রতীক; আফগানিস্তান থেকে কুফরের শেষ চিহ্ন ঝেটিয়ে বের করা হল। আমার ভালো লাগেনি।
সেই প্যাটার্নের পুনরাভিনয় হল চুয়াল্লিশ বৎসর পর। সদ্র দাউদ সিংহাসনচ্যুত জহির পরিবারের অধিকাংশ জনকে প্লেনে করে বিদেশ চলে যেতে দিয়েছেন। বিবেচনা করি, এবারে কোনও আজানধ্বনি উচ্চারিত হয়নি। এই যা তফাৎ। এই তফাৎটুকু থাকাতেই পরিবর্তনটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে অপরিবর্তনীয়ের দিকে নির্দেশ দিল। প্ল্যু সা শাঁজ–ইত্যাদি।
.
রিপাবলিক!
বাংলাদেশ-ভারত উভয়ই দাউদি সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আপনার-আমার বলবার আর কী থাকতে পারে, কিন্তু ওই রিপাবলিকের চেঁকিটা গিলতে আমি অক্ষম এবং অনিচ্ছুক। বলা নেই, কওয়া নেই, কাবুলির সেই কাঁঠাল-খাওয়ার কাহিনী থেকে কাঁঠাল বের করে অকস্মাৎ আমার মাথায় ফাটানো! কবেকার সেই ১৯৩০-৩১ থেকে অদ্যাবধি কেউ তো কখনও রিপাবলিকের কথা পাড়েনি। সরদারদের সবাইকে জিরোতে দিয়ে রাজা জহির যখন খানদানি ফিউডেল ঐতিহ্য ভঙ্গ করে গেরস্তঘরের ছেলে ডক্টর ইউসুফকে প্রধানমন্ত্রী করলেন তখন তো রাজা দেশটাকে গণতন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন– কই, তখনও তো কেউ রিপাবলিকের কথা তোলেনি। দাউদও ইউসুফকে মদ দেবার তরে হিন্দুকুশ উত্তোলন করেননি। তিনি উষ্মভরে গোসসা ঘরে ঢুকে খিল দিলেন– গোড়াতে। পরে কী কী করলেন সেইটেই তো বিশ্ববাসী জানতে চায়। জানবে নিশ্চয়ই, একদিন।
রিপাবলিক, জহুরিয়া যে নামে খুশি ডাকুন, পুরনো সেই হুঁকোটা এখন অবধি সেই ডাবা-হুঁকোটাই রইল।
